ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বাড়া ও সরবরাহ সংকটের প্রভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। এরইমধ্যে জ্বালানি তেলের সংকটে বন্ধ হয়েছে অনেক পেট্রোল পাম্প।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সকালে ঢাকার শাহবাগ, তেজগাঁও, আসাদগেটসহ গুরুত্বপূর্ণ পাম্পগুলো ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই শত শত মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি লাইনে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তেল সংকটে অনেক পাম্প সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হচ্ছে, আবার কোথাও দেওয়া হচ্ছে নামমাত্র জ্বালানি।
রাজধানীর শাহবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার ফিলিং স্টেশনে রাইড শেয়ারিং চালক মো. নুরুল ইসলাম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “অকটেনের জন্য সকাল সকাল ৭টা থেকে লাইনে আছি, এখন ১০টা বাজে। আমি অ্যাপে বাইক চালিয়ে সংসার চালাই। তিন থেকে চার ঘণ্টা লাইনে বসে থাকলে আমার ৫০০ টাকার ট্রিপ নষ্ট হয়। পাম্প থেকে বলছে ৫০০ টাকার বেশি তেল দেবে না। এইটুকু তেলে কয়টা খেপ মারব আর নিজের পেট চালাব কীভাবে? আমাদের আয় তো এখন তেলের লাইনেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
আসাদগেটের তালুকদার পাম্পে তেলের জন্য অপেক্ষা করা ডেলিভারি ম্যান আবু বকর রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “অফিস থেকে পার্সেল ডেলিভারির চাপ দিচ্ছে, কিন্তু বাইকে তেল নাই। দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর পাম্পওয়ালা বলছে তেল শেষ। এখন অন্য পাম্পে গিয়ে আবার লাইনে দাঁড়াতে হবে। এভাবে চললে আমাদের মতো ছোট চাকরিজীবীরা বিপদে পড়ে যাবে। তেলের পেছনেই যদি অর্ধেক দিন চলে যায়, তবে কাজ করব কখন?”
তেজগাঁও ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন নিজের মোটরসাইকেলের জ্বালানির জন্য অপেক্ষা করছিলেন বেসরকারি চাকুরিজীবী নিহাদ কবির। তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “বাসে অনেক ভিড়, তাই কষ্ট করে বাইক কিনেছিলাম অফিসে যাওয়ার জন্য। এখন দেখছি বাইকই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন তেলের জন্য যে যুদ্ধ করতে হয়, তাতে শরীর আর মন দুই-ই ক্লান্ত হয়ে যায়। সরকার যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তবে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামতে পারবে না।”
একই পাম্পে ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানি জন্য অপেক্ষারত বেসরকারি চাকরিজীবী মো. নুরুজ্জামান খাঁন রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমি গত ১০ বছর ধরে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করি। গাড়িতে এসিতে বসে থাকলেও তো তেল পোড়ে। দেড় ঘণ্টা ধরে লাইনে ইঞ্জিন চালু রেখে বসে আছি, অথচ পাম্প থেকে বলছে ১০০০ বা ১৫০০ টাকার বেশি তেল দেবে না। বড় গাড়ির জন্য এই তেল কিছুই না। তেলের অভাবে পরিবার নিয়ে কোথাও বের হওয়া তো দূরের কথা, অফিস যাওয়া আসা করাই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
শাহবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার ফিলিং স্টেশনের হিসাবরক্ষক এম এ মান্নান মজুমদার রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “ডিপো থেকে আমাদের চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। আমাদের কোনো হাত নেই। প্রতিদিন শত শত গাড়ি আসছে, কিন্তু আমরা রেশনিং করতে বাধ্য হচ্ছি যাতে সবাই অন্তত একটু করে পায়। অনেক সময় তেল শেষ হয়ে গেলে পাম্প বন্ধ রাখতে হয়, তখন চালকদের রাগের মুখে পড়তে হয় আমাদের। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই ভোগান্তি কমানো সম্ভব হচ্ছে না।”
এদিকে, জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঠিক রাখতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ম্যাজিস্ট্রেটরা।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সকালে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে থেকে জানানো হয় গতকাল ৬৪ জেলায় ৩৯১টি অভিযানে ১৯১টি মামলা দেওয়া হয়েছে এবং ৯ লক্ষ ৩৫ হাজার ৭০ টাকার অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এরমধ্যে সাতক্ষীরা জেলায় ১ জনকে ২ মাসের, চাঁদপুর জেলায় ১ জনকে ১ বছর, গাজীপুর জেলায় ১জনকে ১ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
৬৪ জেলা থেকে ৩০ মার্চ অবৈধভাবে মজুদ করা ৮৭ হাজার ৭০০ লিটার জ্বালানি তের জব্দ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের বার্তায় বলা হয়, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ম্যাজিস্ট্রেটরা তাদের অভিযান অব্যাহত রেখেছেন।