সারা বাংলা

সিরাজগঞ্জে মোটরসাইকেল বিক্রি কমেছে, কাগজপত্র করতে ভিড়

লাইসেন্স ও বৈধ কাগজ ছাড়া মোটরসাইকেলে জ্বালানি না দেওয়ার কঠোর নির্দেশনার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সিরাজগঞ্জে। ফলে একদিকে বাড়ছে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশনের আবেদন, অন্যদিকে নতুন ও পুরাতন মোটরসাইকেলের বাজার স্থবির হয়ে পড়েছে।

সোমবার (৩০ মার্চ) জেলা শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, জ্বালানি সংকট ও প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে বৈধ কাগজপত্র তৈরির আগ্রহ বেড়েছে। 

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশের জ্বালানি খাতে প্রভাব ফেলেছে। কয়েকদিন থেকেই জেলার বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। এতে অনেক চালকই পড়ছেন বিপাকে। বৈধ কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকায় অনেককে ফিরে যেতে দেখা গেছে। এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে বৈধ কাগজপত্র তৈরির আগ্রহ। ফলে বিআরটিএ অফিসে আবেদনকারীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ জেলা বিআরটিএ অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ৬৭৩, ফেব্রুয়ারি মাসে ৪৫৭ ও মার্চ মাসে ৬৬৪টি ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন পড়েছে। গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের জন্য জানুয়ারিতে ২৭৩, ফেব্রুয়ারিতে ২২০ ও মার্চ মাসে ১৪১টি আবেদন জমা পড়েছে।

নতুন ও পুরাতন মোটরসাইকেল বিক্রেতারা বলছেন, এমনিতেই বাজারে দীর্ঘদিন ধরে মন্দাভাব চলছিল। এর ওপর সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। ক্রেতাদের আগ্রহ কমে গেছে। তারা নতুন ও পুরাতন মোটরসাইকেল কেনা থেকে বিরত থাকছেন। 

এস.বি ফজলুল হক রোডের আলতাফ কমপ্লেক্সের তাসনীম তাসফিয়া মটরস-এর সত্ত্বাধিকারী বেলাল হোসেন বলেন, ‘‘এমনিতেই বেচাকেনা কম। তার উপরে জ্বালানি তেলের সংকট চলছে। কোনো মাসে বিক্রি না হলে, পরের মাসে একটু বিক্রি দিয়ে ব্যবসা চালানো যেতো। যুদ্ধ চলাকালীন একটিও মোটরসাইকেল বিক্রি করতে পারিনি।’’ 

একই রোডে মটো এক্সপ্লোর স্বত্বাধিকারী মো. রাসেল শেখ বলেন, ‘‘জুলাই-আগস্টে সরকার পতন থেকেই বিক্রি কম।  এখন তো জ্বালানি তেলের সংকট, বেচাকেনা বন্ধের মতোই হয়ে পড়েছে।’’

আরেক বিক্রেতা ঐশী মটরসের স্বত্বাধিকারী মো. সাইফুল শেখও একইভাবে হতাশা প্রকাশ করেন। ‘গাড়ির আমদানিও নেই, ক্রেতাও নেই,’ বলেন তিনি।

পুরাতন মোটরসাইকেল বিক্রেতা চাচা ভাতিজা মটরর্সের প্রোপ্রাইটর কবির আহমেদ বলেন, ‘‘গাড়ি ক্রয় করতেও পারছি না, বিক্রিও করতে পারছি না। শোরুমগুলোর অবস্থা ভয়াবহ। রোজার মাসে ৩টা গাড়ি বিক্রি হয়েছিল। জানুয়ারিতে ২৫টি, ফেব্রুয়ারিতে ৭টি ছিল। এরপর একটা গাড়িও বিক্রি করতে পারি নাই। ঈদের আগে ও পরে যেখানে মোটরসাইকেল বিক্রির ধুম পড়ে। বর্তমানে বিক্রি নাই। ফলে কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছি না।’’

সিরাজগঞ্জের বিআরটিএ’র মোটরযান পরিদর্শক তাজুল ইসলাম বলেন, ‘‘বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি তেলের সংকটের প্রভাব দেশেও পড়েছে। এ কারণে মোটরসাইকেলের বৈধ কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স করার চাহিদা বেড়েছে। তবে ঈদের ছুটির কারণে প্রত্যাশিত হারে আবেদন জমা পড়েনি।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং কড়াকড়ি অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে আবেদন আরও বাড়তে পারে বলে তিনি জানান। 

সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘‘যেসব মোটরসাইকেল চালকের বৈধ লাইসেন্স নেই বা নিয়ম না মেনে চলাচল করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। লাইসেন্স ছাড়া মোটরসাইকেল চালালে তাদের জ্বালানি না দিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় ‘ফুয়েল কার্ড’ চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আলোচনা করে দ্রুত ফুয়েল কার্ড চালু করা হবে।’’

এদিকে, সচেতন মহল মনে করছেন, প্রশাসনের এই কড়াকড়ি একদিকে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। লাইসেন্স ও বৈধ কাগজপত্র নিশ্চিত হলে দুর্ঘটনা কমার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে স্বল্পমেয়াদি প্রভাব হিসেবে মোটরসাইকেল বাজারে নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিক্রি কমে যাওয়া ও জ্বালানি সংকটের কারণে ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চাপের মুখে। তাদের মতে, সব মিলিয়ে কাগজপত্রহীন মোটরসাইকেল চালকদের জন্য এখন কঠিন সময় শুরু হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।