পুঁজিবাজারে এসএমই প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত কোম্পানি মামুন এগ্রো প্রোডাক্টস লিমিটেডের সার্বিক কার্যক্রম পরিদর্শন করার জন্য ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) অনুমোদন দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা ও সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। এরই ধরাবাহিকতায় ডিএসইর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দিয়েছে বিএসইসি।
সম্প্রতি বিএসইসির মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিএসইসির চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) পিএলসি থেকে মামুন অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস লিমিটেডের ওপর পরিচালিত পরিদর্শন সংক্রান্ত বিষয়ে গত ১১ জানুয়ারি চিঠি পাঠানো হয়েছে। এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে জানানো যাচ্ছে যে, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বিধিমালা, ২০২০ এর বিধি ১৭(১) মোতাবেক ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসি থেকে মামুন অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস লিমিটেডের ওপর পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে কমিশন অনুমোদন প্রদান করেছে।
বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন, উৎপাদন কার্যক্রম এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সর্বশেষ হিসাব বছরের আর্থিক হিসাব বিবরণীর ফলাফল এবং বাস্তব কার্যক্রমের মধ্যে মিল না থাকার বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব কারণে বিনিয়োগকারীদের একাংশ মনে করছেন, কোম্পানিটির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঙ্গে প্রকাশিত তথ্যের পার্থক্য থাকতে পারে। ফলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি।
পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের পরিদর্শন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কোম্পানির আর্থিক তথ্য নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে তা দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা না হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিএসইসির এই পদক্ষেপ সেই আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। যদি পরিদর্শনে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এতে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়মের প্রবণতা কমবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, ডিএসইর পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত পরিদর্শনে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, লেনদেন, উৎপাদন কার্যক্রম এবং সম্পদের বাস্তবতা যাচাই করা হতে পারে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে কোম্পানিটি তালিকাভুক্তি-পরবর্তী সময়ে প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করেছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হবে।
জানা গেছে, এদিকে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ডিএসইর এসএমই প্ল্যাটফর্ম থেকে মূল বোর্ডে স্থানান্তরের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে মামুন অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। কোম্পানিটি সম্প্রতি ডিএসইর কাছে এ সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিয়েছে। কোম্পানিটি মূল বোর্ডে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেয় ২০২৫ সালের এপ্রিলে, যখন কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ প্রথম এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। পরে ওই বছরের জুনে আয়োজিত একটি বিশেষ সাধারণ সভায় (ইজিএম) এ বিষয়ে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন নেওয়া হয়।
এদিকে, এসএমই প্ল্যাটফর্মের যোগ্য বিনিয়োগকারী অফার (কিউআইও) নীতিমালা অনুযায়ী, মূল বোর্ডে যেতে হলে কোনো কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকা হওয়া বাধ্যতামূলক। মামুন অ্যাগ্রোর বর্তমান পরিশোধিত মূলধন ৫২ কোটি ৫০ লাখ টাকা হওয়ায় তারা এই শর্তটি পূরণ করেছে। এছাড়া, অন্তত তিন বছর এসএমই বোর্ডে তালিকাভুক্ত থাকার শর্তটিও তাদের অনুকূলে রয়েছে। ২০২২ সালে ১০ কোটি টাকা সংগ্রহের মাধ্যমে কোম্পানিটি পুঁজিবাজারের এসএমই প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত হয়।
ডিএসইর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোম্পানির জমা দেওয়া নথিপত্র এবং বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা নিবিড়ভাবে যাচাই করার পর বোর্ড সভার মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
সর্বশেষ আর্থিক অবস্থা ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ শেয়ারহোল্ডারদের ৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ ঘোষণা করে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে ১.২১ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস ছিল ১.২০ টাকা। সর্বশেষ বছরে শেয়ারপ্রতি ক্যাশ ফ্লো দাঁড়িয়েছে ১.৫০ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল শেয়ারপ্রতি ক্যাশ ফ্লো ছিল ১.০৪ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ১৬.৬৯ টাকা।
শেয়ার ধারণ পরিস্থিতি
ওষুধ ও রসায়ন খাতের মামুন অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ২০২২ সালে। কোম্পানিটি মূলত আমদানিনির্ভর হয়ে কিটনাশক, ছত্রাকনাশক এবং উন্নত মানের বীজ উৎপাদনের কাজ করে। এ কোম্পানিটির মোট পরিশোধিত মূলধন ৫২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সে হিসাবে কোম্পানিটির মোট শেয়ার সংখ্যা ৫ কোটি ২৫ লাখ। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোম্পানির উদ্যোক্তাদের হাতে ৩০.০৬ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৯.৬৯ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৫০.২৫ শতাংশ শেয়ার আছে। বুধবার (১ এপ্রিল) মামুন অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার সর্বশেষ ১৮.৮০ টাকায় লেনদেন হয়েছে।