সারা বাংলা

তিন বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ, অনিশ্চিত রাজুর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন

তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েও অর্থের অভাবে অনিশ্চয়তায় পড়েছে মেধাবী শিক্ষার্থী ওমর ওসমান রাজুর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার সদকী ইউনিয়নের মহিষাখোলা গ্রামের এই শিক্ষার্থী এখন ভর্তির ফি জোগাতে দিনমজুরের কাজ করছেন। তার আশা, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি বা সরকারের কাছ থেকে সহযোগিতা পেলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষে পরিবার ও নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবেন।

বুধবার (১ এপ্রিল) বিকেলে মহিষাখোলা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের মেঠো পথের পাশে রাজুর টিনশেডের দুই কক্ষ বিশিষ্ট ঘর। ঘরটিতে ভাঙা কাঠের দরজা থাকলেও জানালায় রয়েছে কয়েক টুকরো কাঠ ও ছেঁড়া কাপড়ের অংশ। বাড়ির পাশের একটি মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে রাজুকে পেঁয়াজ তোলার শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে দেখা যায়।

রাজু এই গ্রামের মৃত খবির উদ্দিন এবং ফাতেমা খাতুন দম্পতির ছেলে। তার রাফিউল নামে এক ভাই রয়েছে। 

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় রাজুর বাবা কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এরপর থেকে রাজুর মা ফাতেমা খাতুন অন্যের বাড়িতে কাজ করে দুই সন্তানসহ তিনজনের সংসার চালিয়ে নিচ্ছেন। রাজু উপজেলার জিডি শামছুদ্দিন আহমেদ কলেজিয়েট স্কুল থেকে ২০২৩ সালে বাণিজ্য বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি এবং ২০২৫ সালে জিপিএ ৪.৯২ পেয়ে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

কুষ্টিয়ার একটি কোচিং সেন্টারে এক শিক্ষককের সহযোগিতায় বিনামূল্যে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্ততি নেন রাজু। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে রাজু গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় ৯০তম, জাহাঙ্গীরনগরে ২৫১তম এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৪৩তম মেধাস্থান অর্জন করেন।

ফাতেমা খাতুন বলেন, “আমার স্বামী কিডনি নষ্ট হয়া ১৪ বছর আগে মারা গেছে। ইনকামের (আয়) লোক নাই। ছেলে পড়ালেখা করতে চাই, কিন্তু আমি পারতিছি নে। ঘরটুক মানুষ সাহায্য মাহায্য করে তুলে দিছে। এহন ছেলে চাচ্ছে পড়ালেখা করতি। আমি মানা (নিষেধ) করছি, সে শোনতেছে না। আমি টাকা পাবো কোনে?”

তিনি বলেন, “রাজু পড়ালেখায় ভালো। সেজন্য বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক এবং এলাকাবাসীর সাহায্যে বিনা খরচে এইচএসসি পর্যন্ত পড়ালেখা করছে। এখন সরকারি পেলে ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করতে পারবে।” 

ওমর ওসমান রাজু বলেন, ‘ক্লাশ টুতে পড়ার সময় বাবা মারা যান। স্কুল, কলেজ ও কোচিংয়ে শিক্ষকদের সহযোগিতায় আমার পড়ালেখা চলেছে আজ পর্যন্ত। পরিবারের সামর্থ্য নাই আমাকে একটা বইখাতা কিনে দেবে।” 

তিনি বলেন, ‘২০২৫- ২৬ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির গুচ্ছ পরীক্ষায় সারাদেশের মধ্যে ৯০তম স্থান অর্জন করি।  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫১তম এবং রাজশাহীতে ৭৪৩তম স্থান পেয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছি। টাকার অভাবে ভর্তি ও পড়ালেখা এখন অনিশ্চিত। ভর্তির টাকার জন্য মাঠ জন (শ্রমিক) দিচ্ছি ৫০০ টাকা চুক্তিতে।” 

সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি বা সরকারিভাবে সহযোগিতা পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে পরিবার ও নিজের স্বপ্ন পূরণ করে দেশের কল্যাণে কাজ করতে চান এই শিক্ষার্থী। তাকে সহযোগিতার জন্য ০১৬০৮৫০৯৭৪৩ (রাজুর বিকাশ নম্বর)। 

রাজুর বন্ধু ইমরান হোসেন বলেন, “রাজু মেধাবী হলেও আর্থিকভাবে অত্যন্ত গরিব। সেজন্য তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েও ভর্তি হতে পারছে না। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও প্রশাসনকে তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।” 

জিডি শামছুদ্দিন আহমেদ কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক সরোয়ার হোসেন বলেন, “রাজুর বাবা নেই। আর্থিক অবস্থাও নাজুক। বিনা খরচে আমার প্রতিষ্ঠান থেকে  এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। আমরা সাধ্যমতো তাকে সহযোগিতা করব।” 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার বলেন, “রাজুর বিষয়টি ইতোমধ্যে জানতে পেরেছি। তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য সহযোগিতা করা হবে।” সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে রাজুর সহযোগিতায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।