সাতসতেরো

বিশ্বজুড়ে সাইকেলের রাজত্ব

বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি সংকট, যানজট এবং পরিবেশ দূষণের মতো সমস্যার মুখে সাইকেল আবারও গুরুত্ব ফিরে পেয়েছে। শুধু ব্যায়াম বা শখ নয়, অনেক দেশে এটি এখন দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। উন্নত অবকাঠামোর দেশগুলোতেও বাইসাইকেলের রাজত্ব চোখে পড়ার মতো। 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাইকেলের ব্যবহার শুধু একটি পরিবহন মাধ্যম নয়, বরং একটি জীবনধারা। এ ক্ষেত্রে সবার আগে যে দেশের নাম আসে, তা হলো চীন। প্রযুক্তিতে অগ্রগামী এই দেশটিতে সাইকেলের সংখ্যাও বিস্ময়কর—প্রায় ৫০০ মিলিয়ন। সাংহাই শহরের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন সাইকেল ব্যবহার করেন। হাংঝো এবং চেংদু শহরে চালু হয়েছে আধুনিক রাইড-শেয়ারিং ব্যবস্থা, যা বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যেও সাইকেলের প্রতি ভালোবাসা চোখে পড়ার মতো। জার্মানিতে জনসংখ্যার প্রায় সমান সংখ্যক সাইকেল রয়েছে। ‘সাইকেল আরোহীদের দেশ’ হিসেবে পরিচিত এই দেশে প্রতিবছর ডয়েচল্যান্ড ট্যুর অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সাইকেলপ্রেমীরা রোমান্টিক রোড কিংবা বার্লিন ওয়াল ট্রেইলের মতো ঐতিহাসিক পথে ভ্রমণে বের হন।

তবে সাইকেল সংস্কৃতির প্রকৃত উদাহরণ বলা হয় নেদারল্যান্ডসকে। এখানে জনসংখ্যার চেয়েও বেশি সাইকেল রয়েছে। প্রতিদিনের যাতায়াতের প্রায় ২৮ শতাংশই সম্পন্ন হয় সাইকেলে। উন্নত বাইক লেন, নিরাপদ পার্কিং এবং সরকারের উৎসাহে দেশটি হয়ে উঠেছে সাইকেলের স্বর্গরাজ্য।

একইভাবে ডেনমার্ক-এ সাইকেল চালানো যেন জীবনের অংশ। রাজধানী কোপেনহেগেন ২০১৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে সাইকেলবান্ধব শহরের স্বীকৃতি পায়। এখানে প্রতিদিন মানুষ গড়ে ১.৬ কিলোমিটার সাইকেল চালায়, আর ‘ট্যুর দে ডেনমার্ক’ প্রতিযোগিতা সাইকেলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়।

উত্তরের দেশ নরওয়ে-তেও সাইকেলের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় ই-বাইকের জনপ্রিয়তা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ড-এ রয়েছে প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সাইকেল পথ। এখানে ‘ট্যুর দে সুইস’ এবং ‘ট্যুর দে রোমানডিয়া’ ইভেন্ট সাইকেলপ্রেমীদের একত্র করে।

বেলজিয়াম-এ সাইকেল শুধু চলাচলের মাধ্যম নয়, এটি একটি পেশাদার খেলাধুলার অংশও। ‘রোন্দে ভান ফ্লান্দেরেন’ বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাইকেল রেস হিসেবে পরিচিত। শহরগুলোতে উন্নত লেন, পার্কিং এবং ভাড়ায় সাইকেল ব্যবস্থাও রয়েছে।

এশিয়ার আরেক উন্নত দেশ জাপান-এ সাইকেল মূলত স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত হয়। টোকিওসহ বড় শহরগুলোতে এটি খুবই জনপ্রিয়। ‘শিমানামি কাইডো’ নামের ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ সাইকেল রুট দেশটির একটি বড় আকর্ষণ।

উত্তর ইউরোপের দেশ সুইডেন এবং ফিনল্যান্ড-এও সাইকেল জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুইডেনের স্টকহোম, গোথেনবার্গ ও মলমো শহরে উন্নত সাইকেল অবকাঠামো রয়েছে। আর ফিনল্যান্ডে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নিরাপদ পথ সাইকেল চালানোর আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সাইকেল আজ আর শুধু একটি যানবাহন নয়—এটি একটি সচেতন, স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব জীবনের প্রতীক। উন্নত অবকাঠামো, সরকারি উদ্যোগ এবং মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সাইকেলের এই জয়যাত্রা আরও বিস্তৃত হচ্ছে।