চাঁদপুরের হাইমচরে মেঘনার পাড়ে প্রকৃতি আর মানুষের লালিত স্বপ্ন রাতের আধারেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। যে মাঠে সোমবার বিকেলে দাপিয়ে বেড়িয়েছে একঝাঁক শিশু-কিশোর, রাত পোহাতেই সেখানে এখন শুধুই মেঘনার অতল জলরাশি। হাইমচরের চরভৈরবী ইউনিয়নে প্রভাবশালীদের অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে চরের জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে এমনটি অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের ভাষ্য, হুমকির মুখে রয়েছে সরকারের কোটি টাকার নদী রক্ষা বাঁধ।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) উপজেলার ১নং গাজীনগর এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাঁধ সংলগ্ন বিস্তীর্ণ বালিচর এখন গভীর গর্ত আর পানিতে একাকার।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কয়েকদিন ধরে মনির হোসেন জুয়েল নামে এক ব্যক্তি ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে নদী ও পুকুরের মাটি কাটছিলেন। তাদের দাবি, জুয়েল রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ কার্যক্রম চালাচ্ছেন। নদী রক্ষা বাঁধ ভেঙে গেলে ঘরবাড়ি ও কৃষি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা দুদু রাঁড়ী বলেন, “আশেপাশে কোনো খোলা জায়গা নেই। এই বালুচরটিই ছিল আমাদের সন্তানদের একমাত্র খেলার মাঠ। সোমবারও এখানে ফুটবল খেলা হয়েছে। সকালে এসে দেখি সব শেষ।”
আবুল হোসেন নামে অপর এক বাসিন্দা জানান, “প্রভাবশালীরা শুধু বালু নয়, আমাদের শিশুদের স্বপ্নগুলোও গিলে খেয়েছে।”
চরভৈরবী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইউসুফ জুবায়ের শিমুল বলেন, “ড্রেজার মালিক দাবি করছেন, তারা নদী থেকে কোনো বালু কাটেননি।”
হাইমচর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহাজুল ইসলাম শফিক বলেন, “বালুখেকোদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে না। তারা যে দলেরই হোক না কেন, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। নদী রক্ষা বাঁধ ধ্বংস করার অর্থ হলো পুরো এলাকাকে বিপদে ফেলা।”
এদিকে, খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে অভিযান চালান হাইমচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমিত রায় এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। অভিযানে অবৈধ বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত একটি ড্রেজার ও একটি বাল্কহেড জব্দ করা হয়। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে চারজনকে আটক করে হেফাজতে নেয় পুলিশ।
হাইমচর উপজেলার ইউএনও অমিত রায় বলেন, “বালু উত্তোলন অপরাধে আমরা কঠোর অবস্থান নিয়েছি। সরঞ্জাম জব্দসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন। নদী রক্ষা বাঁধের ক্ষতি কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।”
চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বালু উত্তোলনের ফলে বাঁধের যে অংশটি ঝুঁকিতে পড়েছে, সেখানে স্টকে থাকা ব্লক ফেলে তাৎক্ষণিকভাবে মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান।”
নীলকমল নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ কংকন কুমার বিশ্বাস জানান, প্রশাসনের নির্দেশে ড্রেজার জব্দ করা হয়েছে। স্থানীয়দের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নদীর বাঁধ না মেরামত করলে কয়েক দিনের মধ্যে পাড়ে বড় ধরনের ক্ষতি হবে।