আন্তর্জাতিক

শুক্রবার পাকিস্তানে শান্তি আলোচনায় বসছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। আগামী শুক্রবার (১০ এপ্রিল) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। খবর পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম দ্য ডনের।

বুধবার (৮ এপ্রিল) ভোরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। তিনি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বকে এই ‘বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের’ জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে আশা প্রকাশ করেন যে, ‘ইসলামাবাদ আলোচনা’ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনবে।

এই যুদ্ধবিরতি মধ্যস্থতায় সহায়তাকারী প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সব বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে আলোচনার জন্য উভয় দেশের প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

এই সমঝোতাটি এমন এক সময়ে এলো যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া আল্টিমেটাম শেষ হতে মাত্র দুই ঘণ্টা বাকি ছিল। উল্লেখ্য, তেহরান আল্টিমেটাম মানার কোনো লক্ষণ না দেখানোয় মঙ্গলবার ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, “আজ রাতে একটি আস্ত সভ্যতা মারা যাবে।”

সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক্স-এ লেখেন, “মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরালোভাবে এগিয়ে চলেছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এটি বাস্তবসম্মত ফলাফলের দিকে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “কূটনীতিকে সফল হওয়ার সুযোগ দিতে আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আন্তরিকভাবে অনুরোধ করছি যেন তিনি সময়সীমা আরও দুই সপ্তাহ বাড়িয়ে দেন।”

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যে সংঘাত শুরু হয়েছে, তা নিরসনে পাকিস্তান তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে।

শাহবাজ শরিফ ইরানকেও অনুরোধ করেছিলেন যেন তারা হরমুজ প্রণালি- যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ হতো- দুই সপ্তাহের জন্য খুলে দেয়।

তিনি বলেন, “পাকিস্তান সবটুকু আন্তরিকতা নিয়ে আমাদের ইরানি ভাইদের অনুরোধ করছে যেন তারা সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে দুই সপ্তাহের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়। আমরা সব যুদ্ধরত পক্ষকে দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতি পালনের আহ্বান জানাই যাতে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায়।”

এর কিছুক্ষণ পরই ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে জানান যে, তিনি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ এবং চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে কথা বলেছেন।

তিনি বলেন, “পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে, যেখানে তারা আজ রাতে ইরানের ওপর ধ্বংসাত্মক আক্রমণ না চালাতে অনুরোধ করেছেন- আমি ইরানের ওপর বোমা হামলা ও আক্রমণ দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করতে সম্মত হয়েছি। তবে এটি শর্তসাপেক্ষ যে, ইরানকে অবিলম্বে এবং নিরাপদে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণরূপে খুলে দিতে হবে।”

তিনি আরও যোগ করেন যে, “এটি হবে একটি দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধবিরতি!”

“এর কারণ হলো আমরা ইতিমধ্যে আমাদের সমস্ত সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছি এবং তা অতিক্রম করেছি। ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি স্থাপনের জন্য আমরা একটি চূড়ান্ত চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছি।”

“আমরা ইরানের কাছ থেকে একটি ১০-দফা প্রস্তাব পেয়েছি এবং আমরা বিশ্বাস করি যে এটি আলোচনার জন্য একটি কার্যকর ভিত্তি। অতীতে বিরোধের প্রায় সব পয়েন্টেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একমত হয়েছে, তবে এই দুই সপ্তাহের সময়সীমা চুক্তিটিকে চূড়ান্ত ও সম্পন্ন করার সুযোগ দেবে,” তিনি আরও বলেন।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে ট্রাম্প আরও বলেন, “এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাটি সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছানো একটি সম্মানের বিষয়।”

পরবর্তীতে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের পক্ষে একটি বিবৃতি শেয়ার করেন। সেখানে তিনি ঘোষণা করেন যে, যদি ইরানের ওপর হামলা বন্ধ করা হয়, তবে ইরানও তার রক্ষণাত্মক কার্যক্রম স্থগিত করবে।

তিনি বলেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পক্ষ থেকে আমি আমার প্রিয় ভাই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল মুনিরকে এই অঞ্চলে যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।”

“প্রধানমন্ত্রী শরিফের টুইটে করা ভ্রাতৃত্বপূর্ণ অনুরোধের প্রেক্ষিতে এবং ইরানের ১০-দফা প্রস্তাবের সাধারণ রূপরেখাকে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের মেনে নেওয়ার ঘোষণার প্রেক্ষিতে, আমি ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের পক্ষ থেকে ঘোষণা করছি: যদি ইরানের ওপর হামলা বন্ধ হয়, তবে আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী তাদের রক্ষণাত্মক কার্যক্রম স্থগিত করবে।”

তিনি আরও বলেন, “আগামী দুই সপ্তাহের জন্য ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে এবং কারিগরি সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত সম্ভব হবে।”

আলাদাভাবে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেসটিভি তেহরানের সেই ১০-দফা প্রস্তাবের রূপরেখা তুলে ধরেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ‘মেনে নিয়েছে’ বলে জানানো হয়েছে। 

এই দফাগুলোর মধ্যে ছিল: ইরানের বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসন না চালানো; হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখা; ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ইরানের অধিকারের স্বীকৃতি; ইরানের ওপর থেকে সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার; ইরানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সকল প্রস্তাব বাতিল; আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার বোর্ড অব গভর্নরস-এর সব প্রস্তাব বাতিল; ইরানের ওপর হওয়া ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ প্রদান; অঞ্চল থেকে মার্কিন যুদ্ধকালীন বাহিনী প্রত্যাহার; এবং লেবাননে হিজবুল্লাহসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা।

পরে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি’র সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘পরিপূর্ণ এবং সম্পূর্ণ বিজয়’ অর্জন করেছে।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরপরই এক সংক্ষিপ্ত টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “সম্পূর্ণ এবং পূর্ণাঙ্গ বিজয়। ১০০ শতাংশ। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।” ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কী হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, “সেটি পুরোপুরি দেখভাল করা হবে, অন্যথায় আমি এই চুক্তিতে আসতাম না।” ট্রাম্প আরও বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন চীন ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে ভূমিকা রেখেছে।

এদিকে, ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা তেহরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার শর্তে ইরানের ওপর দুই সপ্তাহের জন্য বোমা হামলা স্থগিত করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, “ইসরায়েল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দুই সপ্তাহের জন্য ইরানে হামলা স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে, যদি ইরান অবিলম্বে প্রণালি খুলে দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর সব ধরনের হামলা বন্ধ করে।”

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “ইরান যেন আমেরিকা, ইসরায়েল, ইরানের আরব প্রতিবেশী এবং বিশ্বের জন্য আর কোনো পারমাণবিক, ক্ষেপণাস্ত্র এবং সন্ত্রাসী হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়- যুক্তরাষ্ট্রের সেই প্রচেষ্টাকেও ইসরায়েল সমর্থন করে।”