তীব্র উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত আজ বুধবার থেকে দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছেছে। স্থায়ী যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে আগামী শুক্রবার (১০ এপ্রিল) পাকিস্তানে আলোচনা বসছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থির হয়ে পড়ে।
বুধবার (১০ এপ্রিল) আল-জাজিরার এক প্রতিবেদন বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইরান ও চীন এবার হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন ডলারের আধিপত্যের অবসান টানতে চাচ্ছে।
তাদের মতে, বছরের পর বছর ধরে ওয়াশিংটন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের প্রাধান্যকে কাজে লাগিয়ে ইরান ও চীনসহ তাদের শত্রু ও প্রতিযোগীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে এবং ক্ষতিসাধন করেছে।
বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হয়, তার নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে। তেহরান ও বেইজিং এখন এই প্রণালিটিকে ডলারের বিকল্প হিসেবে চীনা মুদ্রা ইউয়ানকে চাঙা করার হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে।
এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর কাছ থেকে চীনা মুদ্রা ‘ইউয়ানে’ ট্রানজিট ফি বা শুল্ক আদায় শুরু করেছে ইরান। এটি চীন ও ইরানের গভীর অর্থনৈতিক সহযোগিতার সর্বশেষ উদাহরণ।
এখন পর্যন্ত কতটি জাহাজ ইউয়ানে অর্থ প্রদান করেছে তা স্পষ্ট না হলেও, ‘লয়েডস লিস্ট’-এর তথ্যমতে, ২৫ মার্চ পর্যন্ত অন্তত দুটি জাহাজ চীনা মুদ্রায় তাদের ‘ট্রানজিট ফি’ পরিশোধ করেছে। গত সপ্তাহে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
গত শনিবার জিম্বাবুয়েতে অবস্থিত ইরান দূতাবাস এক বার্তায় জানায়, বিশ্ব তেলের বাজারে এখন ‘পেট্রো-ইউয়ান’ যুক্ত করার উপযুক্ত সময় এসেছে। মূলত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর করতেই ইরান এই পথ বেছে নিয়েছে।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া এক যুদ্ধবিরতি চুক্তির অধীনে তেহরান হরমুজ প্রণালিতে দুই সপ্তাহের নিরাপদ যাতায়াতের গ্যারান্টি দিলেও, এ বিষয়ে কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ-এর সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ আল-জাজিরাকে বলেন, “একদিক থেকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের চোখে আঙুল দিয়ে অপমান করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, ইরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ও তাদের মিত্র চীনকে খুশি করতে ইউয়ান ব্যবহার নিয়ে খুবই সিরিয়াস।”
তেহরান ও বেইজিংয়ের জন্য ইউয়ানের মর্যাদা বৃদ্ধি করা একটি উভয়পক্ষেরই জয়। কারণ ইউয়ান ব্যবহারের ফলে চীন ও ইরান ডলার-নির্ভর আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে পারে। এছাড়া এটি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের খরচ কমায় ও লেনলেন প্রক্রিয়া সহজ করে। ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বছরের ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বের’ দেশ দুটির মধ্যে বাণিজ্য ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।
কিল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক বুলেন্ট গোকায় আল-জাজিরাকে বলেন, “বেইজিং এমন একটি ‘বহুমুখী আর্থিক বিশ্ব’ তৈরি করতে চায় যেখানে মার্কিন ডলারের কেন্দ্রীয় ভূমিকা উদীয়মান শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব দ্বারা ভারসাম্যপূর্ণ হবে।”
চীন ইরানের তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি ক্রয় করে এবং ধারণা করা হয় এই লেনদেন ইউয়ানেই সম্পন্ন হয়। বিনিময়ে ইরান চীন থেকে প্রচুর পরিমাণে যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ও রাসায়নিক আমদানি করে।
তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, চলমান যুদ্ধ এই দুই দেশের তেলের প্রবাহে খুব একটা ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহে ইরান ১২ থেকে ১৩.৭ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে, যার বেশিরভাগই গেছে চীনে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০২৪ সালে এক বক্তৃতায় আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, ইউয়ান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি সাধারণ মুদ্রা হয়ে উঠবে এবং ‘গ্লোবাল রিজার্ভ কারেন্সি’-এর মর্যাদা অর্জন করবে।
গ্লোবাল সাউথের (উন্নয়নশীল বিশ্ব) দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউয়ান বেশ ভালো অবস্থানে পৌঁছেছে, কারণ এই দেশগুলোর অনেকের সঙ্গেই ওয়াশিংটনের সম্পর্ক বেশ শীতল।
তবে মার্কিন ডলারকে গুরুত্বসহকারে চ্যালেঞ্জ জানাতে হলে চীনা মুদ্রাকে এখনও অনেক দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে।
ডলারের বিপরীতে ইউয়ান এখনো অবাধে বিনিময়যোগ্য নয়, কারণ বেইজিংয়ের কঠোর মূলধন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। এর মানে হলো, ব্যবসায়ীরা চাইলেই ইচ্ছামতো ইউয়ান অন্য মুদ্রায় রূপান্তর করতে বা দেশের বাইরে পাঠাতে পারেন না।
অন্যদিকে, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের পরিমাণ কমলেও, এটি এখনো বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা। আইএমএফ-এর তথ্যমতে, গত বছর বিশ্বজুড়ে রিজার্ভের ৫৭ শতাংশ ছিল ডলারে, যেখানে ইউরো ছিল ২০ শতাংশ এবং ইউয়ান ছিল মাত্র ২ শতাংশ।
এদিকে, এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের মাত্র ৩.৭ শতাংশ ইউয়ানে সম্পন্ন হয়েছে, যা ২০১২ সালে ছিল ১ শতাংশেরও কম।
হংকংয়ের নাটিক্সিস-এর এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া হেরেরো আল-জাজিরাকে বলেন, “হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসলে বিশ্বকে ‘ডলারমুক্ত’ করা সম্ভব নয়। হরমুজ প্রণালিতে ইউয়ানের ব্যবহার শুধুমাত্র জ্বালানি প্রবাহে বিকল্প মুদ্রার ব্যবহারকে কিছুটা স্বাভাবিক করবে।”
তিনি আরও জানান, বড় ধরনের ‘ডলারমুক্তকরণ’ করতে হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণ প্রয়োজন। অথচ সত্তর দশকের সেই চুক্তির পর থেকে সৌদি আরবসহ সব উপসাগরীয় দেশ নিরাপত্তার বিনিময়ে তাদের তেলের দাম একচেটিয়াভাবে ডলারে নির্ধারণ করে আসছে।
ডলারের আধিপত্যে ‘আঘাত’
ব্রাসেলসের ইউরোপীয় সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির পরিচালক হোসুক লি মাকিয়ামা আল-জাজিরাকে বলেন, চীন যদি ডলারের মতো আন্তর্জাতিকীকরণ করতে নাও পারে, তাতে তেহরানের খুব একটা কিছু যায় আসে না।
তিনি বলেন, “চীন ইরানের প্রায় সব তেল কিনে নেয় এবং তাদের বাণিজ্য আসলে ভারসাম্যপূর্ণ। কারণ ইরান অন্য কোথাও থেকে যা পায় না, সেই সব যন্ত্রপাতি ও শিল্পপণ্য চীন থেকে সহজেই সংগ্রহ করতে পারে।”
লি-মাকিয়ামার মতে, অতীতে ইউরোপ বা জাপানের মুদ্রা ডলারকে সরাতে পারেনি কারণ তারা তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সব প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম ছিল না। কিন্তু চীন বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে একটি ‘ওয়ান-স্টপ শপে’ পরিণত হয়েছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ডিফারেন্স গ্রুপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ড্যান স্টেইনবক আল-জাজিরাকে বলেন, স্বল্পমেয়াদে ডলারের শ্রেষ্ঠত্ব না বদলালেও, ইউয়ানের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার সময়ের সাথে সাথে নির্দিষ্ট কিছু খাতে মার্কিন আধিপত্যে ফাটল ধরাবে। এটি হবে ধীরগতির ক্ষয়, হুট করে কোনো পরিবর্তন নয়।
হার্ভার্ডের অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ আল-জাজিরাকে বলেন, আগামী বছরগুলোতে যুদ্ধের পরিণতি কী হয় তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। তার মতে, “যদি ইরান ও চীন জয়ী হয়, তাহলে বিশ্বের দেশগুলো মার্কিন আর্থিক নিষেধাজ্ঞার হাত থেকে বাঁচতে ডলারের বাইরে অন্য মুদ্রায় বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহিত হবে। কিন্তু যদি যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য পূরণ করে ইরানের বর্তমান সরকারকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে, তবে ডলারের আধিপত্য আরও কিছুকাল টিকে থাকবে।”