অর্থনীতি

জ্বালানি খাতে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে শুল্কহার হ্রাসের আহ্বান ডিসিসিআইয়ের

শিল্প-কারখানায় পণ্য উৎপাদন, বিপণন, পরিবহনসহ জনজীবনের সব ক্ষেত্রে জ্বালানির বিষয়টি ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে বিশেষ করে জ্বালানি খাতে আমাদের সক্ষমতার ঘাটতির বিষয়টি সামনে এসেছে। যেখানে এ খাতে দীর্ঘদিনের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের অভাবের বিষয়টি বেশ স্পষ্ট। দেশের সব স্তরের দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে অফশোর ও অনশোরে গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানো, জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বিদ্যমান শুল্কহার হ্রাস, এ খাতের উদ্যোক্তাদের স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা প্রদানসহ সর্বোপরি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার দীর্ঘসূত্রিতা কমানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক স্বদিচ্ছার একান্ত অপরিহার্য বলে জানিয়েছে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমদে।

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট: বাংলাদেশে প্রভাব এবং মোকাবিলায় কর্মপন্থা নির্ধারণ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা তিনি এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ সাসটেইএবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি এসোসিয়েশন (বিএসআরইএ) এবং ইনফ্রাস্ট্রাচকার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) গোলটেবিল আয়োজনে সহায়তা করেছেন।

সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান, বিশেষ অতিথি ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. আব্দুর রহিম খান ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এর সদস্য (বিদ্যুৎ) বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার।

অনুষ্ঠানে ডিসিসিআই পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছাড়াও জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তা ও সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, “বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল এবং ২৫ শতাংশের বেশি এলএনজি বাণিজ্য প্রতিদিন হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশ মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি করে। যার মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ডলার সংকটের কারণে আমাদের জ্বালানি খাত বর্তমানে একটি নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের মজুত ক্রমশ কমে যাচ্ছে। যা দ্রুত আমদানির মাধ্যমে সমাধান করা না হলে পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অন্যান্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।”

ডিসিসিআই সভাপতি উল্লেখ করেন, “বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের বছরে অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন ডলার খরচ হয় এবং যদি তেলের দাম ১২০ ডলারের উপরে ওঠে, তবে অতিরিক্ত জ্বালানি খাতে খরচ বাড়বে বছরে ৪-৫ বিলিয়ন ডলার বা ৬১০ বিলিয়ন টাকা, ফলে সরকারের লোকসান বাড়বে পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা পরিচালন ব্যয় বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।”

তিনি আরো বলেন, “জ্বালানি সংকটের কারণে তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, প্রতি ব্যাগ সিমেন্ট উৎপাদন ব্যয় ২৫-৩০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রতি কন্টেইনার অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৪,০০০ ডলার পর্যন্ত বাড়তি খরচ গুণতে হচ্ছে এবং সর্বোপরি জীবনযাত্রায় ব্যয়ের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।”

বিদ্যমান জ্বালানি সংকটে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি সরবরাহ, সংগ্রহ ও স্বল্পমেয়াদী কৌশল গ্রহণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে আনতে বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম আরো জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তাসকীন আহমেদ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্প সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, “আমাদের জ্বালানি প্রাপ্তির স্বল্পতা অনেক দিন ধরেই রয়েছে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এটিকে আরো বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। আগামী জুন পর্যন্ত কৃষি কাজে ব্যবহারের জন্য দেশে ৬ লাখ মেট্রিক টনের সার মজুত রাখা প্রয়োজন। যদি গ্যাসের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ঘাটতি থাকবে প্রায় ৪ লাখ মেট্রিক টন।”

তিনি বলেন, “এ খাতে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা হ্রাসে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। তবে গ্যাস অনুসন্ধানে সরকারের সক্ষমতা যেমন কম, সেই সাথে অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়াতে শৈথিল্যতার বিষয়টি বিদ্যমান রয়েছে। যা বেগবান কর প্রয়োজন।”

এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. আব্দুর রহিম খান বলেন, “সামপ্রাতিক সময়ের জ্বালানি সংকট প্রতিটি মানুষের জীবনজীবিকায় প্রভাব ফেলছে এবং এ সংকট মোকাবিলায় এ খাতের গ্রহণযোগ্য তথ্য নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে যথাযথ স্ট্রাটেজি প্রণয়ন ও বাস্তাবায়ন জরুরি জ্বালানির সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সৌর বিদ্যুৎ ও নাবয়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিদ্যমান শুল্ক হার প্রত্যাহারের ওপর তিনি জোরারোপ করেন।”

সেই সাথে নতুন নতুন গ্যাস কূপ অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানোর ও জ্বালানি আমদানি উৎসের বহুমুখীকরণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

বিইআরসির সদস্য (বিদ্যুৎ) বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলার একটি কার্যকর পন্থা হতে পারে, তবে শিল্পসহ অন্যান্য খাতে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অফশো ও অনশোরে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানোর বিকল্প নেই।”

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া বলেন, “সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের সংষ্কারের মাধ্যমে ভর্তুকি হ্রাসের ওপর জোর দেওয়া আবশ্যক।”

তিনি জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার উৎসাহিত করতে বিশেষ করে বিদ্যুৎ চালিত গাড়ি আমদানিতে শুল্ক বাড়াতে এনবিআরকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রস্তাব প্রেরণ করবে।

বিএসআরইএর সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, “জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের রাজনৈতিক স্বদিচ্ছার কোনো বিকল্প নেই। তবে এক্ষেত্রে ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।”

তিনি এ খাতের এসএমই উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদী স্বল্প সুদে ঋণ সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দেন।

ইডকলের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা নাজমুল হক বলেন, “এ সংকট মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের পাশাপাশি প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে কমিটি গঠনের মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।”

ইঞ্জিনিয়ার মো. সিরাজুল মাওলা বলেন, “এলপিজির সরবরাহের অভাবে দেশে ইতোমধ্যে অনেক স্টেশন ইতোমধ্যে বন্ধ হয়েছে। এ খাতের দীর্ঘমেয়াদে একটি মাষ্টার প্ল্যান থাকা ও আমাদানি উৎসের বহুমুখীকরণ প্রয়োজন। সৌর বিদ্যুৎ খাতে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনের কোনো বিকল্প নেই।”

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রকৌশলী মোহাম্মদ নুরুল আবসার বলেন, “২০২৪-২৫ অর্থবছরে পিডিবির ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৩ হাজার কোটি টাকা ছিল, এর প্রধান কারণ হরো জ্বালানি উৎপাদন খরচ অনেক বেশি এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম আরো বৃদ্ধি পেলে ভর্তুকি বাড়াবে।”