পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিমা খাতের কোম্পানি ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদনে অনিয়ম ও নিরীক্ষায় জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় অডিট প্রতিষ্ঠান মাহফেল হক অ্যান্ড কোং এবং প্রতিষ্ঠানটির এনগেজমেন্ট পার্টনারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এবং সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের দায়ে মাহফেল হক অ্যান্ড কোং-কে আগামী এক বছর এবং সংশ্লিষ্ট অডিট পার্টনার মো. আবু কায়সারকে আগামী দুই বছরের জন্য পুঁজিবাজারের কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানির নিরীক্ষা কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিএসইসির কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এফআরসির ভূমিকায় বিএসইসির অসন্তোষ
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ২০১৮ ও ২০১৯ সালের আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষার দায়িত্বে ছিলেন মাহফেল হক অ্যান্ড কোং এবং পার্টনার আবু কায়সার। ওই সময় অডিট নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠলে অডিট খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) তদন্ত করে। তদন্ত শেষে এফআরসি যে নামমাত্র ব্যবস্থা নিয়েছিল, তাকে ‘সন্তোষজনক নয়’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে বিএসইসি। বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির তুলনায় এফআরসির ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত নগণ্য, যার ফলে কমিশন নিজেই শুনানির মাধ্যমে এই কঠোর শাস্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নিরীক্ষকের শাস্তি
বিএসইসির আদেশে বলা হয়েছে, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ রুলস, ২০২০-এর বিধি ১৪(৫) অনুযায়ী মাহফেল হক অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস আগামী এক বছর কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানির অডিট করতে পারবে না। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট এনগেজমেন্ট পার্টনার আবু কায়সার, এফসিএকে দুই বছরের জন্য এই পেশাগত কার্যক্রম থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিশনের চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট বিভাগ শীঘ্রই অভিযুক্তদের কারণ বর্ণনা করে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠাবে।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
নিরীক্ষা খাতের এই বিশৃঙ্খলা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমিন রাইজিংবিডিকে বলেন, “নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এফআরসিকে আরো সক্রিয় ও কঠোর হতে হবে। বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো অডিট রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই বড় বড় সিদ্ধান্ত নেয়। যদি সেই রিপোর্টেই জালিয়াতি থাকে, তবে তা পুরো পুঁজিবাজারকে ধ্বংস করে দিতে পারে।”
‘‘কোনো অডিটর যদি জেনে-বুঝে আর্থিক চিত্র বিকৃত করেন, তবে দ্রুত ও কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করা ছাড়া বাজার স্বচ্ছ করা সম্ভব নয়,’’ বলেন তিনি।
এদিকে, ফারইস্ট লাইফের মতো বড় কোম্পানিতে হাজার হাজার কোটি টাকার বিমা গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের অর্থ জড়িত। সেই টাকার হিসাবে যদি অডিটররা কারসাজির সুযোগ করে দেন, তবে সাধারণ মানুষের আস্থার কোনো জায়গা থাকে না। বিএসইসির এই সময়োপযোগী ও কড়া সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে অন্য নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে স্বচ্ছতা ফেরাতে বিএসইসির এমন কঠোর নজরদারি ভবিষ্যতে আরো জোরদার হবে বলে আশা করছেন বিনিয়োগকারীরা।