বরগুনায় টানা দুই দিনের বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে তরমুজ ক্ষেত। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চাষিরা।
বরগুনায় বুধ ও বৃহস্পতিবার মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হয়েছে। পানি জমেছে তরমুজ ক্ষেতে। জ্বালানি ও শ্রমিক সংকটের কারণে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও করতে পারছেন না কৃষকরা।
তারা বলছেন, ফসল ঘরে তোলার ঠিক আগ মুহূর্তে দুই দিনের বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে ক্ষেত। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পাইকাররাও আসছেন না ফসলের মাঠে। যে দু’-একজন আসছেন, তারা অনেক কম দাম বলছেন। এতে লাভ তো দূরে থাক, খরচের টাকাও উঠবে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরগুনা জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বরগুনায় ১২ হাজার ৩২৪ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬ হাজার হেক্টর তরমুজ ক্ষেত শুধু সদর উপজেলায়। এখন পর্যন্ত বরগুনায় তরমুজ বেচাকেনা শুরু হয়নি। গত দুই দিনের বৃষ্টিতে কিছু তরমুজের ক্ষেত নষ্ট হতে পারে বলে ধারণা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
বরগুনা সদর উপজেলার নলটোনা ইউনিয়নের বাবুগঞ্জ এলাকার কৃষক জসিম উদ্দিন (৫৮) ছয় একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) গিয়ে দেখা গেছে, তার ক্ষেত তরমুজে ভরা। কিন্তু, পুরো ক্ষেত পানির নিচে।
জসিম উদ্দীন বলেছেন, “টানা দুই দিন বৃষ্টি হওয়ায় ফসলের মাঠ এখন পানির নিচে। শ্রমিক পাচ্ছি না। তাই, চেষ্টা করেছিলাম মেশিন দিয়ে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন করতে। কিন্তু, জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে সেটাও পাচ্ছি না। এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি।”
তিনি আরো বলেন, “বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে ৫ লাখ টাকা লোন নিয়ে এবং নিজের সর্বস্ব দিয়ে লাভের আশায় তরমুজ চাষ করেছিলাম। এখন আমার পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।”
বাবুগঞ্জের ছোনবুনিয়া এলাকার সুমন মিয়া, হাসনাত, আরিফ হোসেন, সোহাগ বিশ্বাসসহ একাধিক কৃষক জানিয়েছেন, একদিকে শ্রমিক সংকট, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের সংকট। বৃষ্টির পানি অপসারণে এখন আদি পদ্ধতিতে চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু, একেকজনের ৩ থেকে ১০ একর ফসলের মাঠে জমে থাকা বৃষ্টির পানি আদি পদ্ধতিতে নিষ্কাশন করা অনেক সময়ের ব্যাপার। এত সময় তরমুজ পানির নিচে থাকলে পচে যাবে।”
ইয়াসিন বরগুনা সদর উপজেলা এম বালিয়াতলী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ৩ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন।
ইয়াসিন বলেন, “তরমুজ পেকে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। মেশিনের মাধ্যমে সেচ দিয়ে পানি অপসারণ করতে ডিজেল দরকার। কিন্তু, তা পাচ্ছি না। অন্যদিকে, শ্রমিক পাচ্ছি না। এবার প্রথম তরমুজের চাষ করেছি আমি। তাই, এ বিষয়ে ধারণাও কম। কৃষি অফিসের কেউ ফসলের মাঠ পরিদর্শন করতে পারছে না। কোনো পরামর্শ দিচ্ছেও না।”
ইয়াসিনের মতো বরগুনা সদর উপজেলার হাজার হাজার তরমুজচাষির স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। দুই দিনের বৃষ্টিতে তরমুজ ক্ষেতে পানি জমে যাওয়ায় গাছ মরে যাওয়াসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দিয়েছে।
একই চিত্র দেখা গেছে বরগুনার আমতলী ও তালতলী উপজেলাতেও। আমতলী উপজেলার চাওরা এলাকার কৃষক জলিল মাতুব্বর বলেন, “এবার তরমুজের চাহিদা অনেক কম। দূর-দূরান্ত থেকে বড় ব্যবসায়ীরা না আসায় বড় ক্ষেত স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা যাচ্ছে না। বৃষ্টি না হলে আমার ক্ষেতের তরমুজ ১২-১৫ লাখ টাকায় বিক্রি হতো। কীভাবে ঋণের টাকা শোধ করব, জানি না। প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকার কিস্তি দিতে হয়।”
একই এলাকার অন্য কৃষকরা জানান, প্রতিবছর বড় ব্যবসায়ীরা তরমুজ কিনে দিনাজপুর, ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করতেন। কিন্তু, এ বছর ডিজেল সংকটের কারণে বড় ব্যবসায়ীরা তরমুজ কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। কারণ, ট্রাকভাড়া ৩৫ হাজার বেড়ে ৫০ হাজার টাকা হয়েছে। বৃষ্টির কারণেও ব্যবসায়ীরা আসছেন না।
বৃহস্পতিবার তালতলীর ছোট ভাই জোড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও ফসলের জমি বৃষ্টির পানির নিচে। একই সংকট তালতলীতেও।
কৃষক দুলাল শিকদার বলেন, “২ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। এতে আমার দেড় লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু, ক্রেতা না থাকায় ক্ষেতেই পড়ে আছে তরমুজ। এখন আবার বৃষ্টি হানা দিয়েছে। ক্ষেতে পানি জমে তরমুজ নষ্ট হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে উৎপাদন ব্যয়ের টাকাও উঠবে না।”
তালতলীর বগি এলাকার কৃষক মাসুদ বলেন, “পানিতে তলিয়ে যাওয়া তরমুজ ব্যবসায়ীরা কিনতে চায় না। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন এলাকার বড় বড় ব্যবসায়ী এখানে এসে ক্ষেত থেকে তরমুজ কিনে ট্রাকে করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেতেন। কিন্তু, এবার জ্বালানি সংকটের কারণে তারা আসছেন না। আমি সাড়ে তিন কানি জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। এতে আমার খরচ হয়েছে ৩ লাখ টাকা। বৃষ্টি না হলে ১৫ লাখ টাকায় এই তিন কানি তরমুজের ক্ষেত বিক্রি করতে পারতাম। এখন উৎপাদন খরচ তোলা নিয়ে চিন্তায় আছি। এখন ক্ষেতে ১৩ হাজার পিস তরমুজ পড়ে আছে। আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরগুনা জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেছেন, “বৃষ্টির কারণে তরমুজচাষিরা বিপাকে পড়েছেন, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করে পরামর্শ দিচ্ছেন কৃষকদের। আমি নিজেও বিভিন্ন ফসলের মাঠ পরিদর্শন করেছি। তরমুজের আংশিক ক্ষতি হতে পারে এই বৃষ্টির পানিতে। আগামী দুই দিন যদি খরা থাকে, তাহলে তেমন ক্ষতি হবে না।”
জ্বালানি সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, “কৃষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। যাদের খুব বেশি ডিজেল অথবা পেট্রোল প্রয়োজন, তারা আমাদের থেকে প্রত্যয়নপত্র নিলে ব্যবসায়ীরা দ্রুত তাদের জ্বালানি সরবরাহ করে থাকেন। তারপরও কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”