স্কুটি চালিয়ে হ্যান্ড মাইকে দেশাত্মবোধক গান বাজাতে বাজাতে মানুষের কাছে যাচ্ছেন ব্যতিক্রমী এক মানুষ। চলতি পথেই কখনো থামছেন, করছেন পথসভা। তিনি ভোট চাচ্ছেন না, রাজনীতির কথাও বলছে না। বলছেন প্রকৃতির কথা, বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তার কথা।
শুধু কথা বলেই দায়িত্ব শেষ, এমন নয়— হাতে হাতে ছড়িয়ে দিচ্ছেন লিফলেট। যেখানে লেখা আছে ফলজ ও ঔষধি গাছের গুরুত্ব। এমনকি ফাঁকা জায়গা পেলে নিজেই সেখানে রোপণ করছেন বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। তার সবুজের এই অভিযাত্রা শুধু এক এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়, ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে।
সাদেকুর রহমান সাদেক। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। এখন করছেন দেশ গড়ার যুদ্ধ। এই যুদ্ধে তার হাতিয়ার বৃক্ষ। এ কারণে নরসিংদীবাসীর কাছে ‘বৃক্ষ চাচা’ নামে তিনি পরিচিত। বয়স আশির কাছাকাছি হলেও বৃক্ষ চাচার উদ্যমে ভাটা পড়েনি। মুক্তিযুদ্ধে ৩ নাম্বার সেক্টরে কর্নেল নুরুজ্জামানের অধীনে যুদ্ধ করা এই সাহসী যোদ্ধা এখন যুদ্ধ করছেন সবুজের জন্য, মানুষের সচেতনতার জন্য।
২০০৩ সাল থেকে সাদেকুর রহমান এখন পর্যন্ত পাঁচ হাজারেরও বেশি ফলজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করেছেন। নরসিংদী শহরের ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনের পাশে তিনি রোপণ করেছেন প্রায় সাতশ তালগাছ। এ ছাড়া কোর্ট রোড এলাকায় জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের ভেতর, বিভিন্ন সরকারি জায়গা এবং মহাসড়কের পাশে লাগিয়েছেন অর্জুন, হরিতকি, বহেরাসহ নানা ঔষধি গাছ। রাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যান ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশেও তার রোপণ করা গাছ এখন ছায়া দিচ্ছে পথচারীদের।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘‘আমরা অনেকেই গাছ লাগানোর কথা বলি, কিন্তু সাদেক চাচার মতো করে বাস্তবে কাজ করি না। উনার কারণে আমাদের এলাকাটা এখন অনেক সবুজ হয়েছে।’’
কলেজ শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার বলেন, ‘‘আমি আগে গাছ লাগানোর গুরুত্ব বুঝতাম না। উনার কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এখন নিজেও বাড়ির আঙিনায় গাছ লাগাচ্ছি। রাস্তার পাশে যে গাছগুলো এখন ছায়া দিচ্ছে, এগুলো তিনিই লাগিয়েছেন। গরমে পথচারীরা উপকৃত হচ্ছে।’’
যদি এমন মানুষ আরও থাকতো, তাহলে দেশটা সত্যিই সবুজ হয়ে উঠত— বলছেন স্থানীয়রা।
এ প্রসঙ্গে সাদেকুর রহমান সাদেক বলেন, “আমি কোনো স্বার্থের জন্য গাছ লাগাই না, দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করি। একটি গাছ মানে শুধু ছায়া নয়—এটি খাদ্য দেয়, ওষুধ দেয়, পরিবেশ রক্ষা করে। আমি চাই প্রতিটি মানুষ অন্তত একটি করে গাছ লাগাক।”
“শুধু কথা বললে হবে না, কাজ করতে হবে। দারিদ্র্য দূর করতে এবং পরিবেশ রক্ষা করতে ফলজ ও ঔষধি গাছের বিকল্প নেই। নতুন প্রজন্ম যদি এগিয়ে আসে, তাহলে একদিন বাংলাদেশ সত্যিকারের সবুজ বিপ্লবে সফল হবে,” বলেন তিনি।
কাঠগাছ লাগাব বন-জঙ্গলে, ফল আর ঔষধি গাছ বাড়ির আঙিনা-মসজিদ প্রাঙ্গণে’—এই স্লোগান ধারণ করে সাদেকুর রহমান শুধু বৃক্ষ রোপণ করেন না, মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতেও কাজ করেন। তার মতে, সবাই সবুজ বিপ্লবের কথা বললেও বাস্তবে কাজ করেন খুব কম মানুষ। তাই সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে হলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
নরসিংদী রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন বঙ্গবন্ধু পার্কে গাছ লাগানোর সময় কথা হয় সাদেকুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, কত গাছ রোপণ করেছেন সঠিক হিসাব তিনি রাখেন না। কারণ তার কাছে কাজটাই বড়। নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে তার বার্তা—গাছের গুরুত্ব বুঝতে হবে, বিশেষ করে ফলজ ও ঔষধি গাছের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।