সারা বাংলা

‘অন্যায় করলে বিচার হতো, এভাবে মানুষ কখনো মানুষকে মারে না’

“চোখের সামনে ভাইকে কোপাতে দেখেছি। তার পুরো শরীর রক্তে ভেজা ছিল। সে যদি কোনো অন্যায় করত, তার বিচার হতো। এভাবে মানুষ কখনো একজন মানুষকে মারে না।”

সাংবাদিকদের এসব কথা বলেছেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগরে বিক্ষুব্ধ জনতার পিটুনিতে নিহত ‘পীর’ আবদুর রহমান ওরফে শামিমের ভাই ফজলুর রহমান। 

ধর্ম অবমাননার অভিযোগে শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুরে দৌলতপুরে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় ‘শামিম বাবার দরবার শরিফ’-এ হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ সময় আব্দুর রহমান ওরফে শামিমকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

রবিবার (১২ এপ্রিল) দুপুরে ‘শামিম বাবার দরবার শরিফ’ গিয়ে দেখা যায়, তখনো সেখানে ধোঁয়া উড়ছিল।  

শনিবারের হামলার ঘটনায় আহত জামিরন ও রিমা খাতুন নামের দুই নারীর সঙ্গে কথা বলার সময় তাদের চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ দেখা যায়। তারা আব্দুর রহমানের ভক্ত। হামলার সময় জামিরন তার ডান হাতের মধ্যমা আঙুলে আঘাত পেয়েছেন। 

জামিরন বলেন, “দুপুরের দিক আমরা দরবারের গেটের সামনে দাঁড়া ছিনু। দেখনু, বেশ কয়েকজন মানুষ রড, লাঠি নিয়ে মিছিল করছে। এর পর দরবারের গেট ভাঙচুর শুরু করে দিল। তারা স্লোগান দিতে দিতে দরবারের ভিতরে ঢুকে গেল। কয়েকজন ভাঙচুর করতে থাকে। দরবারের দোতলায় বাবার (পীর) ঘরের সামনে যায় তারা। দরজা লাথি দিয়ে ভাঙে। ভিতরে বাবাকে গলা ধরে টেনে বের করে হাতে থাকা রড দিয়ে এলোপাতাড়ি মাথায় মারতে থাকে। টেনেহিঁচড়ে নিচে নামায়। সেখানে একজন বলতে থাকে, বাঁইচে আছে রে এখনো, মারেক।”

“বাবাকে মারতে মারতে নিচে নিয়ে আসা হয়। প্রথম যখন বাবাকে বের করে, তখন বাবা হাতজোড় করেছিল। কথা বলার সুযোগ চেয়েছিল। কিন্তু এলোপাতাড়ি যেভাবে মারছিল, কেউ তার কথা শোনেনি। নিচে নামিয়ে যখন রড দিয়ে এলোপাতাড়ি মাথায়, মুখে, নাকের ওপর কোপাচ্ছিল, তখন একবার শুধু বলতে শোনা গেছে ‘ইয়া মুরশিদ’। এরপর আর কোনো কথা বলতে পারেননি বাবা।”

তিনি আরো বলেন, “যারা লাঠিসোঁটা নিয়ে এসেছিল। তাদের বয়স ১৫ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। কেউ কেউ বড় ছিল। তাদের আসা দেখে আমরা ভেবেছিনু, হয়তো কোনো আলোচনা করতে আসছে। কিন্তু, তারা ভাঙচুর, হামলা, বাবাকে মেরে ফেলবে; এটা বুঝতে পারিনি। পরে বুঝছি, তারা প্রস্তুতি নিয়ে আইছিল। পরিকল্পনা করে বাবাকে হত্যা করেছে।”

দরবারে গিয়ে সরেজমিনে দেখা গেছে, দুটি ভবনে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে। আগুনে ছাই হয়ে গেছে দুটি আধা পাকা ঘর। একটি ঘর থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল। ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। আশপাশের বিভিন্ন বয়সী মানুষ দরবারের কাছে নীরব দাঁড়িয়ে আছেন। দরবারের সামনে ১৫ থেকে ২০ জন পুলিশ সদস্য চেয়ার পেতে বসে আছেন। দরবারের সামনে বাঁশবাগানের ভেতর দাঁড়িয়ে ছিলেন নিহত পীর আব্দুর রহমান শামিমের বড় ভাই ফজলুর রহমান। তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক।

গণমাধ্যমের পরিচয় পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ফজলুর রহমান বলেন, “চোখের সামনে ভাইকে কোপাতে দেখেছি। তার পুরো শরীর রক্তে ভেজা ছিল। সে যদি কোনো অন্যায় করে থাকত, তার বিচার হতো। এভাবে মানুষ কখনো একজন মানুষকে মারে না।”

তিনি জানান, শনিবার তিনি গ্রামের মসজিদে জোহরের নামাজ পড়ে এসে বাড়িতে খাবার খাচ্ছিলেন। এ সময় মানুষের শোরগোল শুনতে পান। বাড়ির বাইরে বের হয়ে দেখতে পান, দরবারের সামনে একশ’ থেকে দেড়শ’ মানুষ ব্যাপক ভাঙচুর চালাচ্ছে এবং তার ভাইকে দোতলা থেকে টেনে নিচে নামিয়ে এলোপাথারি কোপাচ্ছে। একপর্যায়ে অন্য মানুষের সহযোগিতায় পুলিশের গাড়িতে করে তার ভাইকে দ্রুত হাসপাতালে নেন। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। এ সময় আরো কয়েকজন আহত হন। 

দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তৌহিদুল হাসান জানিয়েছেন, শামীম নামের ওই ব্যক্তির অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। তাকে কোপানো হয়েছে। চিকিৎসা শুরুর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তিনি মারা যান। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে। 

ফজলুর রহমান জানান, তার ভাই আব্দুর রহমান শামিমের মরদেহ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে আছে। ময়নাতদন্ত শেষে বাবা ও দাদির কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে।

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ফজলুর রহমানের মুঠোফোনে একটি কল আসে। মুঠোফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তিকে তিনি বলেন, ‘জানাজা যদি কেউ না করায়, আমরা ভাইয়েরা মিলে জানাজা করাব। তবু লাশ বাড়িতে আনব।”

এ ঘটনায় মামলা করবেন কি না, জানতে চাইলে ফজলুর রহমান বলেন, ‘জানাজা শেষে ভাইয়েরা মিলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, আব্দুর রহমান শামিম পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। কয়েক বছর আগের ৩০ সেকেন্ডের এমন একটি ভিডিও গত শুক্রবার সকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার সকালে শামিমের দরবার থেকে আধা কিলোমিটার দূরে আবেদের ঘাট এলাকায় শতাধিক মানুষ জড়ো হয়। দুপুরের পর তারা ওই দরবারে হামলা চালায় এবং পুলিশের উপস্থিতিতেই শামিমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে।

এ বিষয়ে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, “শামিমের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এখনো পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। ওই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।”