মতামত

বাঙালি সংস্কৃতির প্রতিপক্ষ  

বাঙালি সংস্কৃতির প্রবহমান চর্চার পথটি সবসময় মসৃণ ছিল না। হাজার বছরের পুরোনো এই সংস্কৃতি ঐতিহ্য, ভাষা, সাহিত্য ও জীবনযাত্রার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এর সমন্বয়বাদী রূপ দীর্ঘকাল ধরে আর্য, বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে একসূত্রে বেঁধে রাখলেও তা নানা সময়ে রাজনৈতিক-সামাজিক-সাম্প্রদায়িক প্রতিকূলতা, ষড়যন্ত্র ও বাধার সম্মুখিন হয়েছে। তারপরও এই সংস্কৃতি তার নিজস্ব ধারায় বিকশিত হয়েছে, বিভিন্ন সংকট মোকাবেলা করে তার প্রবহমানতা অক্ষুণ্ণ রেখেছে। 

বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার প্রতিকূলতার অনেক কারণ রয়েছে। কিছু কারণ প্রকাশ্য, কিছু সুপ্ত। ধর্মীয় মৌলবাদ ও বিভ্রান্তি, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, অপসংস্কৃতি ও বিকৃতি, বিভাজনমূলক রাজনীতি, প্রকাশ্য ও প্রতিরোধকারী বিরুদ্ধ অপশক্তি অন্যতম, কিন্তু এছাড়াও মানুষের মনস্তত্ত্বের গভীর স্তরে সুপ্তভাবে রয়েছে নিজ ঐতিহ্য সম্পর্কে অজ্ঞতা, তরুণ প্রজন্মের আত্মপরিচয়ের সংকট ও লোকজ সংস্কৃতির গ্রহণ-বর্জনের দ্বিধা যা বাঙালি সংস্কৃতিকে ভেতর থেকে দুর্বল করছে। বাইরের আঘাত যতটা না ভাঙে, ভেতরের ক্ষয় তার চেয়ে বেশি ধসিয়ে দেয়। 

বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান ২টি উপাদান হলো ভাষা ও উৎসব। পহেলা বৈশাখই একমাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসব যার সাথে সাহিত্য-সংগীত-নৃত্য-চারু ও কারুশিল্প-পোশাক-খাদ্যের একটি বিশেষত্ব ও স্বকীয় পরিচয় রয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতির সূচনা থেকে দীর্ঘ পথপরিক্রমায় প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ধর্মীয় সংগীত, নৃত্যকলা, চিত্রকলা, স্থাপত্যশিল্প, বাউল-ভাওয়াইয়া-জারি-সারি-ভাটিয়ালি প্রভৃতি লোক-সংগীত, পোশাকশিল্প, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি ধারণ করেছে। কিন্তু আজ বাঙালি নিজের সেই ঐতিহ্য সম্পর্কে যথেষ্ট অজ্ঞ ও উদাসীন। তাদের একটি বড় অংশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাঙালির ঐতিহ্যের প্রতি এক ধরনের ঔদাসীন্য ও ঘৃণা প্রদর্শন করছে। শুধু তরুণদের দায়ী করলেই চলবে না, বরং বয়সী প্রজন্ম সংখ্যায় তরুণদের চেয়ে কম নয়। এই অজ্ঞতার কারণটি মনস্তাত্ত্বিক যা সঠিক উপলব্ধির প্রতিবন্ধক। Cognitive Bias বা মানসিক পক্ষপাত, নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কে অসচেতনতা, সঠিক ইতিহাসচর্চার অভাব, তথ্য এড়িয়ে চলার প্রবণতা, অপপ্রচার ও ভুল ইতিহাসের প্রভাব, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা, পারিবারিক শিক্ষার শূন্যতা, নগর জীবন ও সাংস্কৃতিক বিচ্যুতি, ভিন্নদেশী সংস্কৃতির ভ্ৰান্ত অনুকরণ সবসময়ই বাঙালি সংস্কৃতির পথ আটকায়।

বাঙালির দীর্ঘকালের সাংস্কৃতিক লড়াই, ভাষার অধিকার থেকে সংস্কৃতির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম বা স্বাধীনতার লড়াইয়ের সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে না বলে যে অভিযোগটি প্রায়ই শোনা যায়, তার মধ্যে সত্যতা হয়তো আছে। ইতিহাস লুকিয়ে রাখা, বিকৃত বা দখল করা যায়, তবে প্রজন্মের দায়িত্ব হলো সঠিক ইতিহাস খুঁজে বের করা যে দায়িত্বটি তারা সেভাবে নিতে চাইছে না। গুজব ও জনশ্রুতিতেই তারা সন্তুষ্ট। নিজ ঐতিহ্যকে ‘প্রাচীন’ ও ‘অনাধুনিক’ মনে করার ভ্রান্তি বাড়ছে। বর্তমানের কেজো শিক্ষাব্যবস্থায় নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি চর্চা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। পারিবারিক গণ্ডিতে শিল্প, সাহিত্য, উৎসব, খেলাধুলা এতটাই ব্রাত্য যে তা এক ধরনের সাংস্কৃতিক শূন্যতা তৈরি করছে। ভিন্ন সংস্কৃতির প্রভাব নিজ সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করতে শেখায়, কিন্তু সেই পক্ষ এতটা প্রবল নয় যে তা দীর্ঘকালের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির চরম বিপর্যয় ঘটাতে পারে, তবে নিশ্চিত ক্ষতি করে এবং এসব কার্যকলাপের কারণে পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি হয়ে যায়।

হাসান আজিজুল হক ‘অধরা বাঙালি সংস্কৃতির খোঁজে’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘বাঙালি সংস্কৃতির প্রশ্নের সমাধান আমাদের করতেই হবে। বাংলাদেশের নতুন নাগরিক যারা, তারা তাদের আত্মপরিচয়ের জায়গাটাকে খুব স্পষ্ট করে দেখতে পাচ্ছে না। আত্মপরিচয়ের জায়গাটা তাদের শূন্য। … এখন যদি আমাদের পরিবারের মধ্যে, আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থার মধ্যে আমাদের রাষ্ট্রের ভাবনায় নিজের জাতিসত্তার পরিচয়টা না থাকে, তাহলে আমাদের সন্তান যারা, তাদের কোনোদিন এই জাতিসত্তা গড়ে উঠবে না। আজ গোটা বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে দেখা যায়, এই বিষয়টা সম্বন্ধে আমরা নিজেরাই বুঝি না। ঠিক কথা বলতে গেলে, বোঝেন না তা নয়, এই প্রশ্নের তোয়াক্কাই করেন না। আমি জানি না এটা অল্প ক্ষতি, না কি বড় ক্ষতি। একটা দেশের মানুষ তার আইডেন্টিটিটা জানে না, এবং গর্ব ও অহংকার করার জায়গা হবে বিদেশ, বিদেশি সংস্কৃতি! এর চেয়ে ভয়ংকর কিছু আমি ভাবতে পারি না।’ সন্দেহ নেই যে বিষয়টি সত্যিই খুব ভয়ঙ্কর। 

বাঙালি তরুণদের আত্মপরিচয়ের যে সংকট লক্ষ্য করা যাচ্ছে তার মূলে রয়েছে ঐতিহ্য ও নিজস্ব সংস্কৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতার পাশাপাশি ধর্মীয় ও ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের দ্বন্দ্ব, ইতিহাসের অপব্যাখ্যা ও অস্বীকৃতি। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, ইতিহাস ও লোকজ চেতনার শিকড়গুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখে না। কোনটি ঘরের আর কোনটি পরের সে সম্পর্কে বিভ্রান্ত। সম্প্রদায় ও জাতির পার্থক্য উপলব্ধি করতে এরা অক্ষম। এরাই আবার বিশ্বায়ন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত। নিজস্ব সংস্কৃতি অপেক্ষা বিদেশি সংস্কৃতিকে আধুনিক মনে করার প্রবণতা তাদের নিজস্ব পরিচয়ের প্রতি উদাসীন করে তুলেছে। তাছাড়া বাঙালি মুসলমানদের একটি বড় অংশ বাঙালি সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে। এ দেশে আজ বাঙালি বনাম মুসলিম দ্বন্দ্বটি অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে। 

দেশভাগ পরবর্তী সময়ে তৎকালিন পূর্ব-পাকিস্তানের মুসলমান জনগোষ্ঠী নিজেদের ‘মুসলিম’ হিসেবে পরিচয় দিতে যতটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত ‘বাঙালি’ হিসেবে ততটা নয়। তারা ধর্মীয় পরিচয়-কেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে নিজেদের সাংস্কৃতিক বিভাজনটা তাই তারা পরিষ্কার বুঝে উঠতে পারেনি। এক ধর্মের লোকেরা এক সম্প্রদায়ভুক্ত হতে পারে, এক জাতি নয়। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের মূল সুরটি তাই তারা ধরতে পারে না, এমনকি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পরেও না। সংস্কৃতির সংগ্রাম তাই চলতেই থাকে, চলমান থাকে বিরোধিতাও। রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ হন, তাঁকে লড়াই করে উদ্ধার করতে হয়, সংস্কৃতিতে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে হয়, কিন্তু তাতে বিরোধিতা কমে না। প্রতিনিয়ত তাঁর নতুন-নতুন অপরাধ আবিষ্কার হয়। মিথ্যার ‍সুচতুর বয়ানে প্রতিনিয়ত তিনি ক্ষত-বিক্ষত হন। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে যদিও এর মাঝে দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জাতীয়তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়নি। হয়তো তখন ভিন্ন কোনো বিকল্প ভেবে নেওয়ার উপায় ছিল না। কিন্তু ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ এর মধ্যে এদেশীয় একদল পণ্ডিত ‘ভারতীয় ষড়যন্ত্র' আবিষ্কার করেন। তারা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে মুসলিম চেতনার বিরুদ্ধ অবস্থান হিসেবে ভাবতে ভালোবাসেন। তাদের কাছে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ যতটা ইতিহাস-ঐতিহ্য নির্ভর বাস্তবতা, তার চেয়ে বেশি ভারতীয় রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ববাদী বয়ান। এই ধারণার আগুনে তেল ঢালার জন্য বিশাল পণ্ডিতের দল ‘দাঁতালো চোপা’ আর ‘ধারালো লেখনি’ হাতে বসে আছেন। 

এদেশীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের মধ্যে ভিন্ন ধর্মের মানুষদের প্রতি ঘৃণার প্রকাশ ক্রমেই যেন তীব্রতর হচ্ছে। এ কি এক সহজাত প্রবণতা! এই মানুষেরা ভাবতে ও প্রচার করতে চান যে ভাষা, সংস্কৃতি ও ভূখণ্ডের পরিচয়ের ভিত্তি হিসেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ মূলত ভারতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা থেকে আগত। কিন্তু একটি সেকুলার ও সংস্কৃতি নির্ভর সমাজ নির্মাণে নিজস্ব সংস্কৃতি অপরিহার্য তা তারা মানতে চান না। কারণ তাদের প্রত্যাশা হলো, ধর্ম ও ধর্মীয় পুনর্জাগরণবাদ হবে রাষ্ট্র ও সমাজের ভিত্তি। ‘বাঙালি’ ও ‘মুসলিম’ এর দ্বন্দ্ব তাই যেমন মেটে না, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় রীতি-নীতির সংঘাতও তাই জিইয়ে থাকে। নববর্ষের উৎসব তাই কেঁপে ওঠে মুহুর্মুহু বোমা হামলার প্রতিহিংসায়, সংস্কৃতি শিক্ষালয়গুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যায় উগ্রবাদীর উন্মত্ত হিংসায়, সংস্কৃতি কর্মী-শিল্পীরা শারীরিকভাবে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান অথবা দেশত্যাগে বাধ্য হন। রাষ্ট্রযন্ত্রের কূটিল কুশীলবরা তখন নিশ্চুপ থাকেন। উগ্রবাদ তাই বাঙালি সংস্কৃতির বড় ও স্থায়ী প্রতিপক্ষের এক নাম।

বাঙালি সংস্কৃতির সমন্বয়বাদী বৈশিষ্ট্য, যা যুগ যুগ ধরে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদের মাঝে শিল্প, সংস্কৃতি ও লোকজ বিশ্বাসের মাধ্যমে একটি উদার ও ধর্ম-নিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্য গড়ে তুলেছে, তা সংকীর্ণ মৌলবাদী চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক। ধর্মীয় মৌলবাদ বাঙালি সংস্কৃতির প্রতিপক্ষ, কারণ তারা বহুত্ববাদ ধারণে অক্ষম। বাঙালি সংস্কৃতি লোকজ আচার, নববর্ষ, উৎসব, মেলা বা পাল-পার্বণকে ভিত্তি করে চলে। মৌলবাদ এই বৈচিত্র্যময় ও সমন্বিত সংস্কৃতিকে ‘বিজাতীয়’ বা ‘ইসলামবিরোধী’ বলে গণ্য করে। সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য হরণে তাদের মূল অস্ত্র ধর্মীয় অপব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তি, কিন্তু বাঙালি মুসলমান সমাজ ঐতিহাসিকভাবেই উদারবাদী সংস্কৃতি চর্চা করে আসছে। সেখানে এত হিংসার আবাদ ছিল না। বর্তমানে রাজনৈতিক মৌলবাদের ব্যাপক বিস্তৃতি সাম্প্রদায়িক বৈরিতা সৃষ্টির মাধ্যমে সবকিছুর অপমৃত্যু ঘটাচ্ছে। ফলে সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হচ্ছে। 

গোলাম মুরশিদের পর্যবেক্ষণ হলো, ‘উনিশ শতক থেকে আনুষ্ঠানিক ধর্মের প্রতি অনেকের আনুগত্য বৃদ্ধি পায়—হিন্দু এবং মুসলমান উভয়ের মধ্যে। বিশ শতকে আনুষ্ঠানিক ধর্ম সম্পর্কে এই আগ্রহ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের প্রভাবে আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে স্বীকার করতে হবে যে, ধর্মের আনুষ্ঠানিকতায় উৎসাহ যতটা বৃদ্ধি পেয়েছে, মানবধর্মের প্রতি তেমন নয়। বরং সমন্বয়ধর্মী মানবতাবাদে বাঙালির আগ্রহ হ্রাস পেয়েছে।’ বাংলাদেশের রাজনীতি আজ উগ্রবাদের কবলে। ইসলামি মৌলবাদের একটি আন্তর্জাতিক বৈশিষ্ট্য আছে যার উৎস মধ্যপ্রাচ্য। কিন্তু সেখানকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজ থেকে আমাদের সংস্কৃতি একেবারে ভিন্ন। প্যান-ইসলামিক নেশন বলে কোনো কিছু নেই। তবে, এদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা নেই, নেই জাতীয়তাবাদী বৈশিষ্ট্য। বরং তারা সাম্রাজ্যবাদকে তোষামোদ করে এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে। তাদের এই আচরণ প্রগতিবিরোধী।

আমাদের সংস্কৃতির মূল ভিত্তি লোকজ ভাবাদর্শ। ধর্মীয় অনুষঙ্গও এসেছে জীবনাচারের অংশ হিসেবে। সুফিবাদের দ্বারা যে ধর্ম বিস্তার লাভ করেছিল তার মানবিক দিককে আজ উপেক্ষা করা হচ্ছে। একটি সহজিয়া ধারার প্রবর্তন করেছিলেন বাউল সাধকরা। তাদের সংগীতের আধ্যাত্মিক ও মানবিক দিকগুলো অসাধারণ, কিন্তু আজ তারাও উগ্রবাদী কর্তৃক আক্রান্ত। মুহম্মদ মনসুর উদ্দিনের ‘হারামণি’ সংকলনের ‘আশীর্ব্বাদ’-এ রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন: ‘আমাদের দেশের ইতিহাস পর্যন্ত প্রয়োজনের মধ্যে নয়, বরং মানুষের অন্তরতম গভীর সত্যের মধ্যে মিলনের সাধনাকে বহন করে এসেছে। বাউল সাহিত্যে বাউল সম্প্রদায়ের সেই সাধনা দেখি—এ জিনিস হিন্দু-মুসলমানের উভয়েরই, একত্র হয়েছে অথচ কেউ কাউকে আঘাত করেনি। ...এ মিলনে গান জেগেছে। সেই গানের ভাষা ও সুর অশিক্ষিত মাধুর্য্যে সরল। এই গানের ভাষায় ও সুরে হিন্দু-মুসলমানের কণ্ঠ মিলেছে, কোরান পুরাণে ঝগড়া বাঁধেনি।’ 

কিন্তু আজ বাউল সংস্কৃতি মুসলিম ধর্মীয় আদর্শের শত্রু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। লালন-হাছন-আব্দুল করিমদের ব্রাত্য বলে ছুঁড়ে ফেলতে চাইছে। কিন্তু অসাম্প্রদায়িক চেতনাই আমাদের সংস্কৃতির মূল সুর। কিন্তু সাম্প্রতিক বাংলাদেশের অস্থির রাজনৈতিক অবস্থা ধর্ম-নিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্যের অনুকূল নয় বলে অনেকে মনে করেন। একটি উদারবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া সমন্বয়বাদী বাঙালি সংস্কৃতির ঐশ্বর্য্য উপলব্ধি অসম্ভব।

১৯৪৭ সালে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ভিত্তিতে দেশভাগের ফলে পূর্ব-বাংলার শিক্ষিত ও উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বিপদে পড়লেও মুসলমানরা নিজেদের দারুণ সুবিধাজনক অবস্থানে আবিষ্কার করলেন—একথা গোলাম মুরশিদ তার ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তাতে বাঙালির সমন্বয়মূলক অস্তিত্ব বিপন্ন হয়েছে। কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য শারীরিক বল প্রয়োগের মাত্রাও এরপর থেকেই বাড়তে থাকে, সেইসাথে কমতে থাকে সামাজিক নিরাপত্তা। বিষয়গুলো ধর্মীয় আচার থেকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃত হতে থাকে। এমনকি শব্দচয়ন ও ব্যবহারে সাম্প্রদায়িক পরিচয় অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তৎপরতা বাড়তে থাকে। ফলে সংস্কৃতির মধ্যে হিংসার বিষ ও রাজনৈতিক চাতুরির বৃদ্ধি ঘটে। আরো বাড়ে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মাঝে বিভাজন।

রাজনৈতিক স্বার্থে সংস্কৃতিকে ব্যবহারের ফলে নানা সংকট তৈরি হয়। বাঙালির নিজস্ব জাতিসত্তা তার ভাষার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ‘বাংলাদেশি জাতিসত্তা’ নামে কল্পিত কোনো বিষয় চাপিয়ে দেওয়ার অর্থ বিভাজন বাড়িয়ে তোলা। Cultural Hegemony'র মাধ্যমে পশ্চিমা শক্তিধর দেশগুলো অন্যদেশগুলোর সংস্কৃতিকে বিকৃত করে, তাদের স্বকীয়তা নষ্ট করে। তাদের মূল হাতিয়ার মিডিয়া। প্রযুক্তির সহজলভ্যতার যুগে খুব সহজেই তারা অন্যত্র পৌঁছে যায়। চলচ্চিত্র, নাটক, ওয়েব সিরিজ, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইত্যাদির মাধ্যমে আগ্রাসন চালিয়ে একটি জাতির সাংস্কৃতিক চেতনা বদলে দেয়ার চেষ্টা চলে। তবে ভেতর থেকে সাড়া পেলেই কেবল তা অতিমাত্রায় সক্রীয় হতে পারে। যদিও সাংস্কৃতিক মিশ্রণ সবক্ষেত্রে আগ্রাসন নাও হতে পারে, তবে এদেশের তরুণ প্রজন্মের মাঝে অনুকরণপ্রিয়তা বাঙালি সংস্কৃতির কিছু অবমূল্যায়ন ঘটাচ্ছে বৈকি। এই অপচেষ্টা রুখতে সংস্কৃতি চর্চার সাথে জনসচেতনতা জরুরি, কারণ সংস্কৃতির অবক্ষয় সামাজিক-রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে থাকে। কিছু কুফল এখন আমাদের সামনে দৃশ্যমান।

হাসান আজিজুল হক আরো মন্তব্য করেছেন, ‘আমরা যাকে এখন সংস্কৃতি বলছি, সেটা দেশের মধ্যবিত্ত বা বড়জোর নিম্ন-মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি। এর বেশি আমরা এগোতে পারি নি। এদিক থেকে গোটা বাংলাদেশ একটা আদিম জায়গায় পড়ে রয়েছে।’ সংস্কৃতি চর্চার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় ব্যবসায় ও বাণিজ্যিক দাপট লক্ষ্যণীয়। এখন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আয়োজন ব্যয়বহুল। যন্ত্র থেকে কণ্ঠশিল্পীরা আর্থিক সংকটে জীবন কাটান। সংস্কৃতি চর্চা ছড়িয়ে পড়ার বদলে সংকুচিত হয়ে গৃহবন্দী হতে বাধ্য হচ্ছে। বাড়ির ড্রইংরুমে আয়োজিত আড্ডার ঢংয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। এতে সংস্কৃতির সামাজিক প্রভাব কি বাড়ছে, না কমছে? নব্য-উদারবাদী অর্থনীতিতে সংস্কৃতিও পণ্য।

কিন্তু সংস্কৃতি শুধু বিনোদন নয়, তা বৃহত্তর অর্থে একটি জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক জীবনযাত্রার বৈশিষ্ট্য। সুচিন্তা ও সংবেদনশীলতাই কেবল তাকে ধারণ করতে পারে, কারণ এই সমাজে অনেক মানুষ আছে যারা সংস্কৃতি ছাড়া বাঁচতে পারে। লেখাপড়া শিখে তারা হিন্দু-মুসলমান হতে চেয়েছে, বাঙালি হতে চায়নি। হিন্দুরা ছিল আর্যগৌরব ও রাজপুত-মারাঠা বীর্যের মহিমায় মুগ্ধ ও গর্বিত, আর মুসলমানরা ছিল আরব-ইরানের বংশ-পরিচয়ে অহংকারী। আমাদের সংস্কৃতির ভেতরের প্রতিপক্ষ বাইরের শত্রুর চেয়ে অধিক শক্তিশালী। নীরব ঘাতকের মতো সব শেষ করে দেয়। আমাদের তাই সুস্থতার প্রত্যাশায় প্রতিষেধক নিয়ে মোকাবেলা করতে হবে। সেইজন্য চাই ব্যাপক সংগঠিত প্রস্তুতি। 

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক