সাতসতেরো

এসো হে বৈশাখ

বাংলাদেশের একান্ত আপন লোকজ উৎসব হলো পহেলা বৈশাখের নববর্ষ উদযাপন। বারো মাসে তের পার্বণের এই দেশে বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর বাস। প্রতিটি ধর্ম সম্প্রদায়ের নিজস্ব উৎসব আছে। জাতিগোষ্ঠীগুলোরও রয়েছে নিজস্ব উৎসব। পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ উৎসবে একমাত্র ধর্ম সম্প্রদায় জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে পুরো বাংলাদেশের মানুষ আনন্দে মেতে উঠতে পারে। এই উৎসবটি তাই দেশের সবচেয়ে বড় সাধারণ সামাজিক উৎসব। এটি ঈদ, দুর্গাপূজা, বুদ্ধ পূর্ণিমা কিংবা বড়দিন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা চরিত্রের, আলাদা আমেজের।

দেশের সকল মানুষ মিলিত হয়ে উৎসবে মেতে ওঠার মধ্যে যে জাতীয় ঐক্যের পরিচয় মেলে নববর্ষের দিন, সারা বিশ্বেই তার তুলনা মেলা ভার। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের নববর্ষ উৎসব এই হানাহানি আর বিভেদে কণ্টকিত বিশ্বের জন্য শান্তির বার্তাবাহী হতে পারে। পহেলা বৈশাখের নববর্ষ উৎসব বাঙালির প্রাণের উৎসব। অথচ পহেলা বৈশাখ এলেই দেশের একশ্রেণির মৌলবাদী মানুষের অশুভ বক্তব্য চোখে পড়ে। পহেলা বৈশাখকে ধর্মীয় অনুভূতির বিপরীতে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা লক্ষ্যণীয় হয়ে ওঠে যা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির পরিপন্থী।

প্রাচীনকাল থেকেই বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণসহ ১২ মাস বাঙালির একান্ত নিজস্ব ছিল। বাংলাসহ ভারতীয় ভূখণ্ডে শকাব্দ, লক্ষ্মণাব্দ ইত্যাদি যে বর্ষপঞ্জি প্রচলিত ছিল তাতে এই মাসগুলোই ছিল। প্রতিটি মাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরাণ, কাব্যকাহিনি। বাংলার বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন বর্ষপঞ্জি প্রচলিত ছিল।

এইসব বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী নববর্ষ পালনের রীতি ছিল। পহেলা বৈশাখে মূলত খাজনা পরিশোধ করা হতো। আবার এদিন ব্যবসায়ীরা নতুন হিসাবের খাতা খুলতেন। এছাড়া এই দিনটিকে ঘিরে আরও নানা রকম উৎসব অনুষ্ঠান ছিল। প্রাচীনকালে নববর্ষ ছিল মূলত ঋতুধর্মী উৎসব। গৌড়েশ্বর শশাঙ্কের সময়ও নববর্ষ পালন করা হতো। পালিত হতো পাল ও সেন আমলেও। নবান্ন বা নতুন ধান উঠলে অগ্রহায়ণ মাসেও একটি উৎসব পালন করা হতো। মুঘল আমলে কৃষক চৈত্র মাসের শেষদিন পর্যন্ত ভূস্বামীদের খাজনা শোধ করতেন। শুধু খাজনা শোধ ও হালখাতাই নয়, তার সঙ্গে হতো মিষ্টিমুখ করা।

মুঘল সম্রাট আকবরের সময় একটি সমন্বিত বর্ষপঞ্জির প্রয়োজনে নতুন সন প্রচলিত হয়। বাংলা সনের জন্ম ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে এ কথা মোটামুটিভাবে অধিকাংশ পঞ্জিকাবিশারদ মেনে নিয়েছেন। তবে তা গণনা করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর ১৫৫৬ থেকে। নতুন সনটিকে প্রথমে ফসলি সন পরে বঙ্গাব্দ বলা হয়। সময়ের প্রয়োজনে বাংলা বর্ষপঞ্জির বেশ কয়েকবার সংস্কার হয়েছে। এর মূল সংস্কার করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র নেতৃত্বে গঠিত কমিটি। বর্তমান সরকারি বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রণেতা ভাষাসৈনিক আ জা ম তকীয়ূল্লাহ। তার প্রস্তাব অনুযায়ী এখন যে সরকারি বাংলা বর্ষপঞ্জি চালু রয়েছে তাতে খ্রিস্টীয় সাল ও বঙ্গাব্দের মাসগুলোর তারিখ সব সময়ের জন্য স্থির রয়েছে। ফলে প্রতিবছরই ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ হচ্ছে।

পহেলা বৈশাখের আগে জমিদার বা নবাবকে সারা বছরের খাজনা শোধ করার রীতি ছিল। জমিদারবাড়িতে এদিন সাধারণ প্রজারা সকলেই নিমন্ত্রিত হতেন। তাদের সুখাদ্যে আপ্যায়ন করা হতো। এ উপলক্ষ্যে মঙ্গল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। এই অনুষ্ঠানকে বলা হয় পুণ্যাহ। এখন আর এই রীতি নেই। 

ইংরেজ আমলে কলকাতা শহরে সাহেবিআনার হুজুগে নববর্ষ পালনের রীতি কিছুটা হ্রাস পায়। বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও জাতীয় বোধকে পুনর্জাগরিত করার লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে নতুনভাবে পহেলা বৈশাখ পালনের ধারা শুরু করেন। পাকিস্তান আমলে বাঙালির সংস্কৃতির উপর চলে দমন ও নিপীড়ন। তার প্রতিবাদেই ঢাকায় ষাটের দশকের শেষে নতুনভাবে পহেলা বৈশাখে উৎসব পালনের রীতি প্রচলিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ধীরে ধীরে বাঙালির প্রধান জাতীয় উৎসবে রূপ নেয় পহেলা বৈশাখ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শহরের মেলা, শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান। ১৯৮৯ সালে স্বৈরাচার বিরোধিতার অংশ হিসেবে চারুকলার ছাত্রশিক্ষকদের উদ্যোগে শুরু হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। 

মঙ্গল শোভাযাত্রায় কী থাকে? মঙ্গল শোভাযাত্রায় থাকে আমাদের চিরন্তন মোটিফ বা নকশায় তৈরি মুখোশ। সেই গঙ্গাহৃদি, পুণ্ড্রবর্ধন, রাঢ়, গৌড়, বঙ্গ, সমতট, হরিকেলসহ প্রাচীন জনপদগুলোর জনঐতিহ্যের ধারক মোটিফগুলো থাকে এই শোভাযাত্রায়। প্রাচীন বাংলায় পোড়ামাটির ফলক, মাটির টেপা পুতুলে আমরা যে ছবিগুলো দেখি প্যাঁচা, বাঘ, পাখি, হাতি, পুতুল ইত্যাদি থাকে মঙ্গল শোভাযাত্রায়। এই শোভাযাত্রা কোনো বিশেষ ধর্মের পরিচয় বহন করে না, বরং বাঙালির জাতীয় ঐতিহ্যকে ধারণ করে।  ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে পহেলা বৈশাখে বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রা।

পহেলা বৈশাখের নববর্ষ উৎসব বাংলাদেশের পাহাড়ি জনগোষ্ঠি নিজস্ব ঐতিহ্য অনুযায়ী পালন করেন। পাহাড়ি জনগোষ্ঠির উৎসবের নাম বৈসাবি। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, ফুলবিজু ইত্যাদি উৎসবের মাধ্যমে নববর্ষকে বরণ করেন। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব রয়েছে। কিন্তু একমাত্র পহেলা বৈশাখের উৎসবেই বাংলাদেশের সব মানুষ একসঙ্গে উৎসব পালন করতে পারে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীও এ সময় বৈসাবি উৎসবে মেতে ওঠে। বাংলাদেশের সব ধর্ম সম্প্রদায়ের এবং বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষসহ সবার সর্বজনীন উৎসব পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের নাগরিকদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক এবং বিশ্বে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতীক।

১৪৩৩ বঙ্গাব্দ বাংলাদেশের জন্য শুভ হোক।