সারা বাংলা

সিলেটে ঐতিহ্যবাহী ‘লাকড়ি তোড়া’ উৎসব উদযাপন 

সিলেটে শত শত বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় উদযাপিত হলো ‘লাকড়ি তোড়া’ উৎসব। প্রাচীন এই আধ্যাত্মিক ও সামাজিক উৎসবটি শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং মানুষে মানুষে সমতার বার্তাবাহী ঐতিহাসিক পরম্পরা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। 

সুফি সাধক হজরত শাহ জালালের (রহ.) জীবনের শিক্ষণীয় ঘটনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ উৎসব এবারও ভক্ত-অনুরাগীদের ব্যাপক অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

বুধবার (১৫ এপ্রিল) যোহরের নামাজ শেষে হজরত শাহ জালাল (রহ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে মোতাওয়াল্লীর অনুমতিক্রমে শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। ঢাক-ঢোল, ব্যান্ডের বাদ্য এবং স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। ‘লালে লাল, বাবা শাহ জালাল’ এবং ‘৩৬০ আউলিয়া কি জয়’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে হাজারো মানুষ খালি পায়ে যাত্রা করেন সিলেট শহরতলীর লাক্কাতুরা চা-বাগান সংলগ্ন টিলার উদ্দেশে, যা মাজার থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

ভক্তদের হাতে দেখা যায় লাল কাপড়ে মোড়ানো দা ও কুড়ালজাতীয় সরঞ্জাম, যা দিয়ে টিলার গাছের ডালপালা সংগ্রহ করা হয়। তবে স্থানীয় নিয়ম ও পরিবেশগত বিধিনিষেধের কারণে কোনো জীবন্ত গাছ কাটা হয়নি বরং লাক্কাতুরা ও মালনীছড়া চা-বাগানের শ্রমিকদের পূর্বে সংগ্রহ করা ডালপালাই ব্যবহৃত হয়।

প্রায় ৭০৭ বছর ধরে পালিত হয়ে আসা এই ‘লাকড়ি তোড়া’ উৎসবের ইতিহাস গভীরভাবে জড়িয়ে আছে হজরত শাহ জালালের (রহ.) জীবনের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ‘লাকড়ি তোড়া’ অর্থ কাঠ সংগ্রহ ও কাটা। লোকজ বিশ্বাস অনুযায়ী, সমাজে অবহেলিত এক কাঠুরিয়ার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও মানুষের সমতার শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই প্রতীকী কার্যক্রমের সূচনা।

উৎসবের একপর্যায়ে লাক্কাতুরা টিলায় অনুষ্ঠিত হয় মিলাদ মাহফিল। সেখানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তাবারক বিতরণ করা হয়। এরপর ভক্তরা সংগৃহীত লাকড়ি নিয়ে পুনরায় মাজারে ফিরে আসেন এবং সেগুলো বড় দিঘীতে তিনবার ডুবিয়ে পরে নির্দিষ্ট স্থানে স্তূপ করে রাখা হয়। আসন্ন হজরত শাহ জালালের (রহ.) ওরসের শিরনি রান্নায় এই লাকড়িই ব্যবহার করা হবে।

আগামী ৭ ও ৮ মে অনুষ্ঠিত হবে মাজারের ৭০৭তম বার্ষিক ওরস, আর সেই ওরসের রান্নার জন্য এই উৎসবে সংগ্রহ করা হয় জ্বালানি কাঠ।

মাজার কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সংগৃহীত জ্বালানি কাঠ পরে হজরত শাহজালালের (রহ.) পুকুরে ধুয়ে নির্দিষ্ট স্থানে সংরক্ষণ করা হয়, যা ওরসের রান্নার কাজে ব্যবহার করা হবে।

এ বিষয়ে মাজারের খাদেম সামুন মাহমুদ খান বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও লাকড়ি তোড়া উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে। ভক্তদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো আয়োজন ছিল উৎসবমুখর। সামনে ওরসও সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে বলে তিনি আশা করেন। 

তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন।

ভক্তদের মধ্যে প্রচলিত একটি লোককথা অনুযায়ী, এক কাঠুরের জীবনের কষ্ট ও সামাজিক সমস্যার প্রেক্ষিতে হজরত শাহজালাল (রহ.) একবার তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে নিজেরাই জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করেন। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে ‘লাকড়ি তোড়া’ নামে এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবের সূচনা হয় বলে বিশ্বাস করা হয়, যা শত শত বছর ধরে সিলেট অঞ্চলের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।