পহেলা বৈশাখের রঙিন আবহে যখন চারপাশ উৎসবমুখর, তখন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) তরুণদের মাঝে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে বাংলা সাহিত্যচর্চা। ডিজিটাল যুগের ব্যস্ততা, একাডেমিক চাপ এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রার মাঝেও সাহিত্যকে ঘিরে তাদের ভাবনা, অনুভূতি ও দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে উঠছে আরো বৈচিত্র্যময় ও গভীর।
নোবিপ্রবির সাহিত্য সংগঠন ‘শব্দকুটির’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন সদস্যের বক্তব্যে উঠে এসেছে তরুণ প্রজন্মের সাহিত্যচর্চার বর্তমান ধারা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার চিত্র।
সাহিত্য এখন শুধু সৃজন নয়, এক শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম
সংগঠনটির সভাপতি মুজতবা ফয়সাল নাঈম বলেন, “সাহিত্য এখন আর কেবল কবিতা বা নাটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একটা সময় সাহিত্য বলতে ছিল গীতিকাব্য, নাটক কিংবা কবিতা। সেখান থেকে সাহিত্যের পরিসর উপন্যাস, গল্প কিংবা ছোটগল্পে বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমান সময়ে সাহিত্যের এই ধারণা আরও বিস্তৃত। তরুণরা সাহিত্যকে শুধু সৃজনশীলতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং নিজেদের চিন্তা, পরিচয়, সংস্কৃতি, সামাজিক অবস্থান, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ জানানোর একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছে।”
তিনি আরো বলেন, “ডিজিটাল মাধ্যম লেখালেখিকে সহজ ও বিস্তৃত করলেও গভীর পাঠের অভ্যাস কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তবে তার বিশ্বাস, এই প্রজন্ম সাহিত্যে নতুন ভাষা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং নতুন শক্তির সঞ্চার ঘটিয়েছে, যার ভবিষ্যৎ আশাব্যঞ্জক।”
চাপের মাঝে সাহিত্য-এক মানসিক আশ্রয়
লেখালেখি বিষয়ক সম্পাদক মেহেরাজ হোসেন বলেন, “সাহিত্য তার কাছে এক ধরনের মানসিক মুক্তির জায়গা, ভার্সিটি লাইফের সিটি, অ্যাসাইনমেন্ট আর সেমিস্টার ফাইনালের চাপে যখন দম বন্ধ হয়ে আসে, তখনই আমার পরম আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায় কিছু বই।”
তিনি আরো বলেন, “অনেকের কাছে সাহিত্যচর্চা বাড়তি বোঝা মনে হলেও আমার কাছে এটি মানসিক ক্লান্তি দূর করার অন্যতম মাধ্যম। পড়ার চাপের মাঝেও যখন গল্পের বই খুলি বা দু’কলম লিখি, তখন এক অদ্ভুত মানসিক শান্তি পাই। এই সাহিত্যচর্চাই আমাকে নতুন করে পথ চলতে শক্তি দেয়।”
পাশাপাশি প্লেটো ও সক্রেটিসের দার্শনিক চিন্তার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, “জ্ঞান অর্জনের কোনো শেষ নেই। সাহিত্য সেই জ্ঞানচর্চাকে জীবন্ত রাখে। এআই-রিলসের যুগে তরুণদের সাহিত্যচর্চাই পারে তাদের মানবিকবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে।”
আবেগ ও অনুভূতির নিখাদ প্রকাশ
সহ-আবৃত্তি বিষয়ক সম্পাদক আবৃতা সাহিত্যকে দেখেন নিজের ভেতরের অনুভূতি প্রকাশের একটি আদর্শ মাধ্যম হিসেবে- “আমার কাছে সাহিত্য হলো নিজের অভ্যন্তরীণ অপ্রকাশিত সত্তাকে প্রকাশ করার একটি আদর্শ স্থান।”
তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই পরিবারের উৎসাহে তার সাহিত্যচর্চার শুরু, যা ধীরে ধীরে ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে। ব্যস্ত জীবনের মাঝেও সাহিত্য মানুষকে হাসায়, কাঁদায় এবং জীবনের গভীর অর্থ খুঁজে পেতে সাহায্য করে। শত শত নকল মানুষের ভিড়ে কবিতার বই, গল্পের বইগুলো হয়ে ওঠে আমাদের পরম বন্ধু।
সাহিত্য সময় ও মানুষের সেতুবন্ধন
কার্যনির্বাহী সদস্য মাজেদা আক্তার সাহিত্যকে দেখেন সময় ও মানুষের মধ্যে এক অনন্য সেতুবন্ধন হিসেবে।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন- “একের ‘সহিত’ অন্যের মিলনের মাধ্যমই হলো সাহিত্য।”
তার মতে, সাহিত্য আমাদের প্রাচীন ও মধ্যযুগের মানুষের জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে আধুনিক যুগে থেকেও আমরা অতীতের চিন্তা ও বাস্তবতাকে অনুভব করতে পারি।
তিনি বলেন, “সাহিত্য আত্মিক বিকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, যা মানুষের চিন্তাশক্তি ও মননকে সমৃদ্ধ করে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই বইয়ের প্রতি তার আকর্ষণ ছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সেই পরিসর আরো বিস্তৃত হয়েছে।” ভবিষ্যতেও এই সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
পহেলা বৈশাখের উৎসবমুখর পরিবেশে নোবিপ্রবির তরুণদের সাহিত্যচর্চা যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ডিজিটাল যুগের নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও তারা সাহিত্যের মাধ্যমে নিজেদের চিন্তা, অনুভূতি ও সংস্কৃতিকে প্রকাশ করছে। তাদের বিশ্বাস সাহিত্যই পারে মানুষকে আরও মানবিক, চিন্তাশীল ও সচেতন করে তুলতে।
তরুণদের এই সাহিত্যচর্চা শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ নয়; বরং একটি সচেতন, মানবিক ও সাংস্কৃতিক সমাজ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাদের এই চর্চা ভবিষ্যতের জন্য এক ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।