সৌন্দর্য, বুদ্ধিমত্তা ও তীক্ষ্ণ রসবোধের কারণে ইংল্যাণ্ডের প্রথম রানি এলিজাবেথকে তুলনা করা হতো পৌরাণিক নায়িকাদের সঙ্গে। সৌন্দর্যচর্চায় তিনি ছিলেন ভীষণ মনোযোগী। ক্লিওপেট্রা, সিমোনেত্তা ভেসপুচ্চি কিংবা রানি প্রথম এলিজাবেথের মতো নারীরা আজও ক্ষমতার পাশাপাশি তাদের রূপের জন্যও সমানভাবে আলোচিত। তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর সত্য, যা বিশেষ করে রানি এলিজাবেথের জীবনে পরিণত হয়েছিল করুণ পরিণতিতে।
মিশরের রানি ক্লিওপেট্রা দুধ দিয়ে গোসল করতেন—এ গল্প বহুবার শোনা। ইতালির সিমোনেত্তা ভেসপুচ্চি মুখে জোঁক বসিয়ে রক্ত শুষে নিয়ে ত্বক ফ্যাকাশে করতেন, যা সে সময় সৌন্দর্যের প্রতীক ছিল। অন্যদিকে কেউ কেউ ডিমের সাদা অংশ, পাউরুটি ও ভিনেগার মিশিয়ে মুখে লাগাতেন। এমনকি চুলের রং পরিবর্তনে ব্যবহার করা হতো নিজের মূত্র! সৌন্দর্যের জন্য এই অদ্ভুত প্রচেষ্টাগুলো আজ বিস্ময়কর মনে হলেও, সে সময় এগুলোই ছিল স্বাভাবিক।
কিন্তু এই ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায়টি জড়িয়ে আছে ইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথের সঙ্গে। তার সৌন্দর্যচর্চা শুধু অভ্যাসে সীমাবদ্ধ ছিল না—এটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৫৬২ সালে গুটিবসন্তে আক্রান্ত হওয়ার পর তার মুখ ও গলায় গভীর দাগ পড়ে যায়। রাজকীয় ভাবমূর্তি বজায় রাখতে তিনি আশ্রয় নেন এক বিশেষ প্রসাধনীর—‘ভেনেশিয়ান সেরুজ’।
এই প্রসাধনী তৈরি হতো সীসা ও ভিনেগারের মিশ্রণে। ত্বককে নিখুঁত সাদা দেখাতে এটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। রানি এলিজাবেথ প্রতিদিন তার মুখ ও শরীরের উন্মুক্ত অংশে প্রায় আধ ইঞ্চি পুরু করে এই মেকআপ ব্যবহার করতেন। শুধু তাই নয়, দিনে একাধিকবার নতুন করে মেকআপের স্তর দিতেন। তার এই নিখুঁত, প্রায় মুখোশের মতো সাজকেই ইতিহাসবিদরা বলেছেন “মাস্ক অফ ইয়ুথ”।
কিন্তু এই সৌন্দর্যের মুখোশই হয়ে ওঠে তার মৃত্যুর কারণ। সীসা বিষক্রিয়ার ফলে তার ত্বক ক্রমশ ফ্যাকাশে হয়ে যায়, চুল ঝরে পড়ে, এমনকি স্মৃতিভ্রংশ ও মানসিক সমস্যার লক্ষণও দেখা দেয়। মেকআপ তোলার পর তিনি যে মিশ্রণ ব্যবহার করতেন, তাতেও ছিল পারদ—আরেকটি ভয়ংকর বিষাক্ত উপাদান। ফলে তার শরীর ধীরে ধীরে বিষে আক্রান্ত হতে থাকে।
জীবনের শেষ দিকে রানি এলিজাবেথ প্রায় সম্পূর্ণ টাক হয়ে যান এবং পরচুলার আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। তার ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দৃষ্টিশক্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে। একসময় যে সৌন্দর্য তাকে বিশ্বের নজরে এনেছিল, সেই সৌন্দর্যচর্চাই তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ স্বাভাবিক, কিন্তু সচেতনতা ছাড়া তা কখনো কখনো হয়ে উঠতে পারে প্রাণঘাতী। রানি এলিজাবেথের এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অতিরিক্ত বা অজানা উপাদানের ব্যবহার কতটা বিপজ্জনক হতে পারে।
সূত্র: হিস্টোরি অব ইয়েস্টারডে, থট কো