আমেরিকার প্রেসিডেন্টরা দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধকালীন সময়ে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া সৈন্যদের জন্য ঈশ্বরের আশীর্বাদ কামনা করে এসেছেন।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক আচরণ; যেখানে তারা রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতি ঐশ্বরিক অনুমোদনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন এবং ইরান যুদ্ধকে ধর্মীয় ন্যায়পরায়ণতার আবরণে ঢেকে ফেলছেন, তা বহু পুরনো রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দিতে পারে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সংবাদ ব্রিফিংগুলোতে ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি দিচ্ছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদেরকে প্রায় আধ্যাত্মিক যোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপন করছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে নিজের একটি এআই-তৈরি ছবি পোস্ট করেছেন, যেখানে তাকে যিশুরূপে দেখানো হয়েছে।
পোপ লিও চতুর্দশ সতর্ক করেছিলেন, “যারা বোমা ফেলে তাদের ঈশ্বর আশীর্বাদ করেন না।” এরপরই পোপের ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থানের সমালোচনা করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
এই ধরনের বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রকে সেই ‘ধর্মযুদ্ধ’-এর ধারণার আরো কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে, যা অতীতে বহু প্রেসিডেন্ট এড়িয়ে চলতে চেয়েছিলেন। কারণ এটি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতগুলোকে আরো জটিল ও অমীমাংসিত করে তুলতে পারে।
ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, তারা আল্লাহর ইচ্ছা বাস্তবায়ন করছে। যুদ্ধে শহীদ হওয়াকে ঐশ্বরিক পুরস্কার হিসেবে তুলে ধরে তারা। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বর্তমান যুদ্ধের ব্যাখ্যায় পারস্য সাম্রাজ্যের হাতে ইহুদিদের ধ্বংসের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা পাওয়ার বাইবেলীয় উৎসব পুরিমের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় ভাষা রিপাবলিকান মতাদর্শের কঠোরতা এবং মাগা (মেগ আমেরিক গ্রেট এগেইন) আন্দোলনের উত্থানের সঙ্গে যুক্ত আরো উগ্র ইভাঞ্জেলিক্যাল ধারার প্রভাবকে প্রকাশ করছে। এটি দেখায় যে, শীর্ষ রাজনৈতিক কর্মকর্তারা এখন নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রকাশ্যে তুলে ধরতে বেশি আগ্রহী; যদিও এতে অন্য ধর্মাবলম্বী বা ধর্মহীন মানুষদের আপত্তি তৈরি হয়।
এটি আংশিকভাবে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় হতে পারে। কিন্তু এটি একটি রাজনৈতিক কৌশলও, যেখানে কর্মকর্তারা ইভাঞ্জেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের সমর্থন টানতে চান; যারা ট্রাম্পের দুর্বল হয়ে আসা রাজনৈতিক ভিত্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ফারম্যান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক জিম গাথ বলেন, “এটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। তবে যেভাবে অত্যন্ত স্পষ্ট ও সেক্টেরিয়ানভাবে এটি করা হচ্ছে, তা অবশ্যই অভূতপূর্ব।”
অনেক ধর্মপ্রাণ আমেরিকানের কাছে রাজনীতিতে আধ্যাত্মিকতার কথা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ধর্ম সবসময়ই দলীয় রাজনীতির বিষয় নয়। কিছু বিশ্বাসী উদ্বিগ্ন- তাদের ধর্মকে যুদ্ধের যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যে সাংবিধানিক বিভাজন যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না।
এ ধরনের প্রকাশ্য ধর্মীয় ভাষা অনেক মানুষকে প্রান্তিক করে দিতে পারে। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর মতো বহুধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে, যেখানে বিভিন্ন বিশ্বাসের মানুষ কাজ করে। একই সঙ্গে আমেরিকায় ধর্মহীন থাকার অধিকারও রয়েছে।
ট্রাম্পের পূর্বসূরিরা সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে ধর্মীয় যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করা থেকে বিরত থেকেছেন। কারণ তারা বুঝতেন, এতে শত্রুপক্ষের ধর্মীয় প্রচারণাকে বৈধতা দেওয়া হয় এবং মিত্র মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হয়। এটি বিদেশে মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিয়োগ প্রচারণাকেও উসকে দিতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, ওসামা বিন লাদেন প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সৌদি আরবে মার্কিন সেনা উপস্থিতিকে ‘ক্রুসেডার’ আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার যুক্তি দেখিয়েছিলেন।
২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ একবার ‘ওয়ার অন টেরর’ প্রসঙ্গে ভুল করে এটিকে ‘ক্রুসেড’ বলে ফেলেছিলেন। পরে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমাদের যুদ্ধ কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধেও নয়।”
হেগসেথের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। তিনি বিশ্বাস করেন, রাজনৈতিক শুদ্ধতা যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ারফাইটারদের’ দুর্বল করে দেয়। তার বুকে জেরুজালেম ক্রসের ট্যাটু রয়েছে, যা ক্রুসেড যুগের ধর্মীয় প্রতীক।
হেগসেথ: ট্রাম্পের ‘পবিত্র যোদ্ধা’ হেগসেথ এই নতুন ধর্মীয় ভাষার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতীক।
পেন্টাগন জানিয়েছে, তার ধর্মীয় বক্তব্য জর্জ ওয়াশিংটনের ভ্যালি ফোর্জে প্রার্থনা করা বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের সৈন্যদের জন্য বাইবেল বিতরণের মতো ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ১৩ এপ্রিল পেন্টাগনে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের সময় স্যালুট করেন।
তবে সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু তার বিশ্বাস নয়, বরং একজন সরকারি কর্মকর্তার হিসেবে এত প্রকাশ্যে ধর্মীয় অবস্থান গ্রহণ করা উচিত কি না; সেটি ঘিরে।
হেগসেথ প্রায়ই যুদ্ধকে ধর্মীয় অর্থে ব্যাখ্যা করেন। উদাহরণস্বরূপ, ইরানে একজন মার্কিন পাইলটকে উদ্ধার করার ঘটনাকে তিনি ইস্টারের সময় ‘পুনরুত্থান’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ধর্মীয় বিশ্বাস সাধারণত চূড়ান্ত, কিন্তু যুদ্ধ শেষ করার জন্য কূটনীতি হওয়া দরকার নমনীয় ও আপেক্ষিক। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক যুদ্ধ ভূমি ও সম্পদের দ্বন্দ্ব হলেও ধর্মীয় আবরণ থাকায় শান্তি আলোচনাকে জটিল করেছে।
উগ্র ডানপন্থি মিলিশিয়া গ্রুপ প্যাট্রিয়ট ফ্রন্টের সদস্যরা ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসিতে ‘মার্চ ফর লাইফ’ মিছিলে যিশুর প্রতিকৃতি নিয়ে অংশগ্রহণ করেন।
হেগসেথ সাংবাদিকদের সমালোচনাকে বাইবেলের ‘ফ্যারিসি’দের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যাদের তিনি বলেছেন যিশুর ‘সততা’ নিয়ে সন্দেহ থাকা ব্যক্তি।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সামরিক নেতাদের ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার নতুন কিছু নয়। ডি-ডে অভিযানের সময় জেনারেল ডুইট আইজেনহাওয়ার এটিকে ‘গ্রেট ক্রুসেড’ বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং ঈশ্বরের আশীর্বাদ কামনা করেছিলেন।
কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মে আমেরিকা আরো ধর্মীয়ভাবে বৈচিত্র্যময় ও ধর্মনিরপেক্ষ হয়েছে। তাই অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সরকারি কর্মকর্তাদের এভাবে ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার এখন অনেকটাই সময়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিছু ধর্মীয় নেতা উদ্বিগ্ন এই কারণে যে, রাজনীতিবিদরা ধর্মকে নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন।
ওয়াশিংটনের এপিসকোপাল ডায়োসিসের বিশপ মারিয়ান বুডে বলেন, “এটি উদ্বেগজনক; কারণ এতে প্রশাসনকে ঈশ্বরের ইচ্ছার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হচ্ছে।”
যুদ্ধকালীন সময়ে ধর্মীয় বিশ্বাস অনেককে মানসিক সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু ইতিহাসে দেখা যায়, প্রতিপক্ষরা প্রায়ই বিশ্বাস করে, ঈশ্বর তাদের পক্ষেই আছেন। আব্রাহাম লিংকন তার দ্বিতীয় অভিষেক ভাষণে বলেছিলেন, “গৃহযুদ্ধে উভয় পক্ষ একই বাইবেল পড়ে এবং একই ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিল।”
পোপ বনাম হোয়াইট হাউস এই প্রশাসন এমনকি ক্যাথলিকদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপের সঙ্গেও দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে।
পোপ শান্তির পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, “যারা যুদ্ধকে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে তারা ধর্মকে অপব্যবহার করছে।”
তিনি বলেন, “যিশু বলেছেন শান্তির নির্মাতারা ধন্য। কিন্তু যারা ধর্মকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তারা ধিক্কৃত।”
ট্রাম্প এর জবাবে বলেছেন, তার পোপের সঙ্গে দ্বিমত করার অধিকার আছে।
তিনি পোপকে ‘রাজনৈতিক না হয়ে ধর্মীয় দায়িত্বে মনোযোগী হওয়ার’ পরামর্শ দিয়েছেন, যা ইউরোপ ও ক্যাথলিক সম্প্রদায়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সও পোপের ধর্মীয় বক্তব্য নিয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন, যা ক্যাথলিক মতবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিতর্কিত।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর জেরুজালেমের ওল্ড সিটিতে চার্চ অব দ্য হোলি সেপালখার পরিদর্শন করেন।
এই পুরো পরিস্থিতি যে বার্তা দিচ্ছে, তা হলো- ইরান যুদ্ধকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এমন এক অবস্থানে যাচ্ছে, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস সরাসরি রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ যখন ধর্মীয় নিশ্চয়তার ওপর দাঁড়ায়, তখন তা কৌশলগত দিকনির্দেশনা হারাতে পারে এবং সহিংসতাকে আরো দীর্ঘায়িত করতে পারে।
এটাই সেই কারণ, যার জন্য অনেক মার্কিন প্রশাসন অতীতে যুদ্ধকে ধর্মীয় আবরণ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছে।
[বিশ্লেষক: স্টিফেন কলিনসন সিএনএন পলিটিক্সের একজন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, যিনি হোয়াইট হাউসসহ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি কভার করেন।]