সরকারি নজরদারির অভাবে বিলুপ্ত হতে বসেছে কিশোরগঞ্জের জিআই সনদ প্রাপ্ত রাতাবোরো ধান। এক সময় জেলায় বাণিজ্যিকভাবে স্থানীয় জাতের এই ধান প্রচুর চাষাবাদ হলেও এখন কৃষকরা সামান্য পরিমাণে চাষ করছেন নিজেদের খাবারের জন্য। সরকারি-বেসরকারিভাবে এ ধানের বীজ সংগ্রহের উদ্যোগ নেই বলছে খোদ কৃষি বিভাগ। বীজের সহজলভ্যতা ও বিপনণ নিশ্চিত করা গেলে লাভজনক সুগন্ধি এ ধানের চাষ বাড়াতে চান চাষিরা।
এখন চলছে বৈশাখ মাস। প্রতিবছর এ সময় এলেই কিশোরগঞ্জের প্রায় দেড় হাজার বর্গকিলোমিটার হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার ধুম লাগে। দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করেন কৃষক-কৃষাণীরা। বরাবরের মতো এবারো চলছে ধান কাটা-মাড়াই ও শুকানোর কাজ।
জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে রাতাবোরো ধান আবাদ হয়েছে মাত্র ১৭৮ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে নিকলী হাওরেই আবাদ হয়েছে ১৫৫ হেক্টর জমিতে। কৃষকেরা বলছেন, বাজারে বীজ পাওয়া না যাওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে এ ধানের চাষ সম্ভব হয় না। তাই নিজেদের খাবারের জন্য অল্প পরিমাণে এ ধান চাষ করেন তারা।
জেলার নিকলী হাওরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অন্যান্য ধানের পাশাপাশি রাতাবোরো পাঁকাধান কাটছেন কৃষক। পরে, নৌকাতে বোঝাই করে নিয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে। বাড়ির আঙ্গিনাতে চলছে ধান মাড়াই ও শুকানোর কাজ।
কৃষকরা জানান, রাতাবোরো ধান রোপনের ১৪০ থেকে ১৪৫ দিনের মধ্যে ফলন ঘরে তোলা যায়। প্রতি হেক্টর জমিতে আবাদ করে এই ধান থেকে দুই থেকে সোয়া দুই টন চাল পাওয়া যায়। যার প্রতি কেজির বাজার মূল্য ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা।
কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলে বহু বছর ধরেই বোরো মৌসুমে চাষ হয়ে আসছে রাতাবোরো ধান। অন্য ধানের চেয়ে অনেক ছোট এবং ভিন্ন আকৃতির এ ধানের চাল রান্নার পর সুগন্ধ ছড়ায়। খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু এ চালে রয়েছে ক্যান্সার প্রতিরোধের উপদান। ২০২৫ সালে সব গুণাগুণ যাচাইয়ের পর কিশোরগঞ্জের রাতাবোরো ধানকে জিআই সনদ দেয় সরকার।
কিশোরগঞ্জের হাওরের সামান্য জমিতে নিজদের ও স্বজনদের দিতে রাতাবোরো ধান চাষ করেছেন কৃষকরা
নিকলী দামপাড়া এলাকার কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “রাতাবোরো ধান আমরা আগে বেশি পরিমাণে চাষ করতাম। এখন অল্পকিছু করি, নিজে খাই এবং আত্মীয়-স্বজনদের কিছু দেই। বাজারজাত করতে পারলে দাম খুব বেশি, খেতেও খুব টেস্ট।”
নিকলী সদর ইউনিয়নের কৃষক তাইজুল ইসলাম বলেন, “রাতাবোরো ধানের বীজ এখন আমরা পাচ্ছি না। পাশের কৃষকের কাছ থেকে অল্প আনা যায়, পর্যাপ্ত পাই না। পাইলে এ ধানের দাম ভালো পাওয়া যায়।”
দেশীয় জাতের গুণগত মানসম্পন্ন এ ফসল বিলুপ্ত হওয়ার আগেই এর বীজ সংরক্ষণের পাশাপাশি এ ধানের বিপণন ব্যবস্থার নিশ্চয়তাও জরুরি মনে করছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা। নিকলীর উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, “রাতাবোরো হলো এ অঞ্চলের স্থানীয় জাতের ধান। বর্তমানে এ ধান কৃষক বেশি চাষ করেন না। এর কারণ হলো- প্রথমত এর বীজ পাওয়া যায় না। দ্বিতীয়ত, প্রচুর ধান বিক্রির বাজার তারা পান না। অল্প করে চাষ করে নিজেদের মধ্যেই এলাকায় বিক্রি করেন।”
নিকলি উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আবদুস সামাদ বলেন, “আমাদের দেশে যারা সুগন্ধি চালের ব্যবসা করেন, তারা যদি কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং কৃষক যদি প্রচুর পরিমাণে বিক্রির নিশ্চয়তা পান তাহলে আশা করছি, এই ধানের চাষ আগামী বছর থেকে বৃদ্ধি পাবে।”
জিআই সনদ পাওয়ার পর রাতাবোরো ধানের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানান জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. সাদিকুর রহমান। তিনি বলেন, “রাতাবোরো ধানটি যেহেতু সম্পূর্ণভাবে একটি স্থানীয় জাত, ফলে এ জাতের বীজ সরকারি বা বেসরকারিভাবে সংরক্ষণ করা হয় না।”
এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, “ইতিমধ্যেই আমি বিএডিসি’র সঙ্গে কথা বলেছি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কিছু বীজ উৎপাদক কিশোরগঞ্জে আছেন। তাদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করছি, যাতে রাতাবোরো ধানের বীজ উৎপাদন করা যায় এবং কৃষকদের মাঝে তা সরবরাহ করে ধানের উৎপাদন বাড়ানো যায়। সারাদেশে এই ধানের পরিচিতি বাড়াতে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।”