বৈশাখের দুপুরে রোদ মাথার ওপর। সিলেটের আম্বরখানা বাজারে ভিড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে একবার বেগুন, একবার আলুর দাম জিজ্ঞেস করছিলেন রাহেলা বেগম। কিছুক্ষণ হিসাব মিলিয়ে শেষে ব্যাগে তুললেন অল্প কিছু জিনিস, কিন্তু তালিকার অনেক কিছুই বাদ দিলেন তিনি।
রাহেলা জানান, কয়েক সপ্তাহ আগেও সীমিত আয়ে সংসারের প্রয়োজন মিটাতে পারতেন। এখন একই বাজার করতে গিয়ে তাকে আগে থেকেই ঠিক করতে হয় কোনটা নেবেন, কোনটা বাদ যাবে। সবচেয়ে বেশি তাকে বিপাকে ফেলছে রান্নার তেল।
বাজারে কথা হয় রিকশাচালকের স্ত্রী রুবিনার সঙ্গে। তিনি বলেন, “সব কিনতে গেলে টাকা লাগে বেশি। তাই কিছু না কিছু বাদ দিতেই হয়।”
তিনি জানান, স্বামী রিকশা চালান। আয় বাড়েনি, কিন্তু খরচ বেড়েছে অনেক। আগে যেখানে মাস শেষে কিছু টাকা হাতে থাকত, এখন মাঝে মধ্যেই ধার করতে হচ্ছে। সংসারের চাপ সামলাতে এখন তিনি নিজেও কাজের খোঁজে বের হচ্ছেন প্রতিদিন।
একই চাপে আছেন নগরের নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত অনেক পরিবার। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সংসারের ভারসাম্য ভেঙে পড়ছে। বাজারে ঢুকেই দাম শুনে অনেকে পিছু হটছেন। তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকা ছোট হয়ে আসছে দিন দিন।
সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সিলেটের নিত্যপণ্যের বাজারে। বিশেষ করে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি থেকে খুচরা সব পর্যায়েই পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। সিলেট নগরের বন্দরবাজার এলাকার সবজি বিক্রেতা লিটন দাস জানান, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে, যা ক্রেতাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বাজারে আসা ক্রেতারা জানান, চাল, আটা, আদা ও কাঁচামরিচসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষদের দৈনন্দিন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি ব্যয়ের এই ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকলে সামনে আরো মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে কঠিন করে তুলতে পারে।
নগরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী রাশেদ মাহমুদ বলেন, “বেতন একই আছে, কিন্তু খরচ বেড়েছে। কোথাও না কোথাও খরচ কমাতে হচ্ছে। আগে প্রতি মাসে কিছু সঞ্চয় করলেও এখন তা কমিয়ে খরচ চালাতে হচ্ছে।”
বাজারের এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপরও। টিলাগড় এলাকার ভাতের হোটেলের মালিক জুয়েল আহমদ বলেন, “সবজি ও রান্নার তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ বেড়েছে। খাবারের দাম বাড়ালে ক্রেতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
এদিকে, পাইকারি ও খুচরা বাজারের মূল্য ব্যবধান কমাতে সরকার নিয়মিত বাজার তদারকি ও আইনগত ব্যবস্থা জোরদার করেছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।
গত সোমবার সংসদে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি জানান, উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত সরবরাহ চেইনে অপ্রয়োজনীয় মুনাফা ও কারসাজি কমাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে, জেলা পর্যায়ে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বাজারে অতিরিক্ত মূল্য আদায়, মজুতদারি ও প্রতারণার বিরুদ্ধে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে দেশব্যাপী নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।