ক্যাম্পাস

যবিপ্রবির হলে খাবার খেয়ে অসুস্থ ৭০ ছাত্রী

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) একটি আবাসিক হলে খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ৭০ জন শিক্ষার্থী। এতে হলজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ওই হলের প্রভোস্টের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করছেন শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডা. এম আর খান মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন অসুস্থ সবাই। তবে, এ সময় নারী চিকিৎসক অনুপস্থিত। 

গত বুধবার (২২ এপ্রিল) যবিপ্রবির বীর প্রতীক তারামন বিবি ছাত্রী হলে রাতের খাবার খান শিক্ষার্থীরা। ভোর ৪টা থেকে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হতে শুরু করেন। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সকাল ৯টায় মেডিকেল সেন্টার খুললে বীর প্রতীক তারামন বিবি হল থেকে একের পর এক ছাত্রী আসতে থাকেন। দুপুর ১১টার দিকে মেডিকেল সেন্টারে অসুস্থ ছাত্রীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খান চিকিৎসক ও সহকারীরা। তবে, এ সময় দায়িত্বে থাকা মেডিকেল ইনচার্জ ডা. মোছা. মাসুমা নূরজাহান ও নারী আবাসিক চিকিৎসক ডা. নুসরত জামানকে অনুপস্থিত পাওয়া যায়। 

শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, বুধবার রাতে প্রায় ১৬৬ জন শিক্ষার্থী হলের ডাইনিংয়ে খাবার খান। যারা শুধু ডাইনিংয়ে খাবার খেয়েছেন, তাদের মধ্যে ৭০ জনের বেশি শিক্ষার্থী বমি, পাতলা পায়খানা, পেটব্যথায় আক্রান্ত হন। অনেকে অজ্ঞান হয়ে যান। তবে, যারা ডাল খাননি, তাদের অসুস্থ হওয়ার হার কম দেখা গেছে।  

বীর প্রতীক তারামন বিবি হলের ছাত্রীরা ডাইনিংয়ের পরিবেশের বিষয়ে জানান, দুপুরে রান্না করা খাবার রাতে গরম করে পরিবেশন করা হয়। ফলে, অনেক সময় খাবার থেকে দুর্গন্ধ আসে। ডাল ও তরকারিতে মুরগির পালক, চুলসহ বিভিন্ন উপাদান পাওয়া যায়। প্লেট ও বাটিও অনেক সময় অপরিষ্কার থাকে। এছাড়া, ডাইনিংয়ের আশপাশে বিড়ালের উপদ্রবও আছে। বিড়ালগুলো মাঝে মাঝে খাবারে মুখ দেয়। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, ছাত্রীদেরকে বিভিন্ন শর্তে জিম্মি করে রাখা হয়। চার মাসের ফিক্সড টোকেন না কাটলে সিট বাতিলের হুমকি দেওয়া হয়। আগে থেকেই মিলের টাকা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ করলেও কোনো সমাধান পাওয়া যায় না। খাবারের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। সময়মতো খাবার পানি সরবরাহ করা হয় না। খারাপ খাবার খেতে বাধ্য করছে হল প্রশাসন। 

তিনি আরো জানান, যিনি খাবার নিয়ে অভিযোগ করেন, তার ওপর মিল ম্যানেজারের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়। খাবারের মান খারাপ হওয়ায় অনেকেই টোকেন কাটতে চান না। তখন রুমে ডেকে নিয়ে অপমান করা হয়। নিজেরা রান্না করতে গেলে কুকার নিয়ে সমস্যা করা হয়। কুকার নিয়ে গেলে ফেরত দেওয়া হয় না। 

ওই শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা পড়াশোনা করতে এসেছি, অসুস্থ হয়ে কষ্ট পাওয়ার জন্য না। যদি প্রতিদিন এমন অনিরাপদ খাবার খেয়ে অসুস্থ হতে হয়, তাহলে এই হল ব্যবস্থাপনার কোনো মানে নেই। আমাদের প্রশ্ন, এই অব্যবস্থাপনার দায়ভার কে নেবে? আমাদের নিরাপদ খাবার, সুস্থ পরিবেশ এবং সম্মানজনক আচরণ পাওয়ার অধিকার আছে।” 

ছাত্রীদের অসুস্থতার বিষয়ে যবিপ্রবির ড. এম আর খান মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসক ডা. তারিক হাসান বলেছেন, “আমরা এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থী পেয়েছি, যাদের অসুস্থতার লক্ষণ প্রায় একই রকম। গতকাল রাতে তারা হলের ডাইনিংয়ে ভাত, মাংস, ভর্তা এবং ডাল খেয়েছিল। সম্ভবত সেখান থেকে ফুড পয়জনিং হয়েছে। সবাই পেটব্যথা, বমি এবং পাতলা পায়খানায় আক্রান্ত। ডায়রিয়াজনিত কারণে অনেকে দুর্বল হয়ে পড়েছে।”

তিনি আরো বলেন, “আমাদের স্বল্প সামর্থ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু, পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। কিছু রোগীর অবস্থা একটু জটিল আকার ধারণ করেছে। আমরা তাদেরকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছি। তাদের অবস্থা আরো খারাপের দিকে গেলে হয়ত এখানে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে না। উন্নত চিকিৎসার জন্য সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে।” 

হলের ছাত্রীদের অসুস্থতার বিষয়ে বীর প্রতীক তারামন বিবি হলের প্রভোস্ট ড. মোছা. আফরোজা খাতুন বলেছেন, “আমরা কিছুক্ষণ আগে জানতে পেরেছি ছাত্রীদের অসুস্থতার বিষয়ে। সহকারী হল প্রভোস্টকে পাঠিয়েছি মেডিকেলে। শহরে থাকায় যথাসময়ে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ ছিল না। অসুস্থ ছাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে আমরা চেষ্টা করছি। গতকাল দুপুরে আমিও ডাইনিংয়ে খাবার খেয়েছি। রাতের খাবারে আসলে কী হয়েছে, এখনো জানতে পারিনি। শিক্ষার্থীরা খাবার নিয়ে অভিযোগ করলে তখন শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ততার ভিত্তিতেই ম্যানেজারের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং ভালো ম্যানেজারদেরকে পুরস্কৃতও করা হয়।”

মেডিকেল সেন্টারে অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চিকিৎসকদের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তারা কল রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে আবাসিক চিকিৎসক ডা. নুসরাত জামান কল করে জানান, তিনি ব্যস্ত আছেন। পরে কথা বলবেন।