মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পদ্মা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে প্রায় তিন দশক ধরে বসবাস করছেন দুই শতাধিক পরিবার। উপজেলার চর জানাজাত ইউনিয়নের সামিদ খান কান্দি চরের এই জনপদের জনসংখ্যা প্রায় দুই হাজার। তবে, এখনো সেখানে পৌঁছায়নি আধুনিক নাগরিক জীবনের ন্যূনতম সুবিধা। নেই বিদ্যুৎ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এমনকি প্রাথমিক চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থাও। ফলে মানবেতর জীবনযাপনই যেন এখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চরবাসীদের বেশিরভাগই একসময় ছিলেন নদীভাঙনের শিকার। তাদের নিজস্ব ভিটেমাটি, ফসলি জমি সবই বিলীন হয়েছে পদ্মার ভয়াল গ্রাসে। বাধ্য হয়ে তারা আশ্রয় নিয়েছেন চরের জমিতে। বছরের পর বছর ধরে চরে বসবাস করলেও তাদের জীবনে উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া লাগেনি।
তারা জানান, চরের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ ও মাছ ধরা। প্রতিদিন ভোরে অনেকেই নৌকা নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে যান, আবার অনেকে মাঠে কাজ করেন ফসলের আশায়। তবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদী ভাঙন এবং অনিশ্চিত আয়ের কারণে চরবাসীর জীবনযাত্রা অত্যন্ত অস্থির। মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেই হিমশিম খেতে হয় অধিকাংশ পরিবারকে।
সামিদ খান কান্দি চরের যোগাযোগ ব্যবস্থাও অত্যন্ত দুর্বল। চর থেকে উপজেলা সদরে যেতে হলে একমাত্র ভরসা ইঞ্জিনচালিত নৌকা। নদীপথ পাড়ি দিয়ে, এরপর আঁকাবাঁকা ফসলি জমির মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে পৌঁছাতে হয় মূল ভূখণ্ডে। জরুরি প্রয়োজনে এই যাত্রাই হয়ে ওঠে জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি।
শিক্ষা ব্যবস্থার অভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু-কিশোররা। চরে কোনো বিদ্যালয় না থাকায় অধিকাংশ শিশুই স্কুলমুখী হতে পারে না। ফলে অল্প বয়সেই তারা জড়িয়ে পড়ছেন কৃষিকাজসহ অন্য শ্রমে। ফলে বাড়ছে নিরক্ষরতার হার, সংকুচিত হচ্ছে তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা।
চরের কয়েকটি বাড়ি
স্থানীয়রা জানান, স্বাস্থ্যসেবার চিত্র আরো করুণ। চরে নেই কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক। কেউ অসুস্থ হলে তাকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য উপজেলা সদরে নিতে হয়। যাতায়াতের দুর্ভোগের কারণে অনেক সময় রোগী পথেই মারা যান।
করিম মাদবর (৫৫) নামে একজন স্থানীয় বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা এখানে অনেক বছর ধরে আছি।এখনো এখানে বিদ্যুৎ আসেনি। পোলাপানের পড়ালেখার স্কুলও নাই। হাসপাতাল না থাকায় কেউ অসুস্থ হলে অনেক দূরে নিতে হয়, অনেক সময় রোগী পথেই মারা যায়।”
সোহেল সরকার নামে অপর বাসিন্দা বলেন, “চরের অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র হওয়ায় নিজেদের উদ্যোগে উন্নয়ন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ. এম. ইবনে মিজান বলেন, “চরের মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। আগামীতে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”