ঢাকার পুরান অংশের ব্যস্ত, সংকীর্ণ আর ক্লান্তিকর জীবনের ভেতর প্রতিদিন নীরবে লড়াই করে যাচ্ছে হাজারো শিক্ষার্থী। সেই ভিড়েরই একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার কুটি ইউনিয়নের জাজিয়ারা গ্রামের বিজয় বণিক। তার গল্প শুধু ব্যক্তিগত সংগ্রামের নয়, এটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের বাস্তবতার এক প্রতিচ্ছবি।
করোনা মহামারির সময় বিজয়ের জীবনে নেমে আসে কঠিন সংকট। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভেঙে পড়ে। কোচিং করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নেওয়া তো দূরের কথা, সংসার চালানোই হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যরা যখন কোচিংয়ে ব্যস্ত, বিজয় তখন দিনের বেলা বাবার সঙ্গে কাজ করেছেন। রাতে ক্লান্ত শরীরে কখনো বিদ্যুতের আলো, কখনো মোমবাতির ক্ষীণ আলোয় পড়াশোনা করেছেন। কোনো গাইডলাইন ছাড়াই নিজের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির ওপর ভর করে এগিয়ে গেছেন তিনি।
সেই পরিশ্রমের ফল মেলে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায়। ৭৮.৭৫ নম্বর পেয়ে তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান। এটি ছিল তার জীবনের বড় অর্জন। তবে খুব দ্রুতই তিনি বুঝতে পারেন, আসল সংগ্রাম শুরু হয়েছে এখনই।
ভর্তি হওয়ার পর প্রথম যে বাস্তবতার মুখোমুখি হন, তা হলো আবাসন সংকট। পুরান ঢাকায় একটি মেস পাওয়া যেমন কঠিন, তেমনি সেখানে বসবাসও চ্যালেঞ্জিং। অন্ধকার গলি, স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, জরাজীর্ণ ভবন ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পড়াশোনার জন্য একেবারেই অনুপযোগী। তবুও এসব জায়গায় থাকতে হয় বেশি ভাড়া দিয়ে। বর্ষাকালে ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়।
গ্রামের স্বস্তির পরিবেশ ছেড়ে এই জীবনে মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। তবুও থেমে থাকেননি বিজয়। কারণ তার লক্ষ্য একটাই, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।
হলের সুবিধা না থাকায় তার জীবন আরো কঠিন হয়ে ওঠে। মাসের শুরুতেই বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস বিলের চাপ। অস্বাস্থ্যকর খাবারের কারণে বাইরে খেতে হয়, ফলে খরচ বাড়ে এবং স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়ে। অনেক সময় চিলেকোঠার গরম ঘরে থাকতে হয়, যেখানে স্বাভাবিকভাবে থাকা কঠিন। এতে ঘুমের ঘাটতি তৈরি হয়, যা পড়াশোনায়ও প্রভাব ফেলে।
এই চাপ সামলাতে বিজয়কে একাধিক টিউশন করতে হয়। কিন্তু পুরান ঢাকায় পারিশ্রমিক কম হওয়ায় তাকে তিন-চারটি টিউশন নিতে হয়। এতে দিনের বড় একটি সময় চলে যায় যাতায়াতে। ফলে নিজের পড়াশোনার জন্য সময় ও শক্তি কমে যায়।
তার প্রতিদিনের জীবন যেন এক অবিরাম দৌড়। সকালে ক্লাস, তারপর নোট নেওয়া, এসবের পর শুরু হয় টিউশনের জন্য ছুটে চলা। যানজট পেরিয়ে এক টিউশন থেকে আরেকটিতে যেতে যেতে রাত হয়ে যায়। বাসায় ফিরে খাওয়া-দাওয়া শেষে আবার পড়তে বসেন। ক্লান্ত শরীর নিয়েও রাত জেগে পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি।
ঢাকায় আসার পর প্রথম কয়েক মাস ছিল সবচেয়ে কঠিন। নতুন শহর, অচেনা পরিবেশ, হাতে সামান্য টাকা, সব মিলিয়ে একসময় হাল ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু মা-বাবার কথা মনে করে আবার নিজেকে সামলে নেন। পরিবারের ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে।
ভালো ফল ধরে রাখতে তাকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়। রাত জেগে পড়ার কারণে শারীরিক সমস্যাও তৈরি হয়েছে। তবুও তিনি থেমে যাননি। তার এই পরিশ্রমের ফল হিসেবে স্নাতকে ৩.৮৩ সিজিপিএ অর্জন করেছেন এবং বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স প্রথম সেমিস্টারে অধ্যয়ন করছেন।
বিজয়ের মতে, “হল না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য বৈষম্য তৈরি হয়েছে। সচ্ছল শিক্ষার্থীরা যেখানে সহজে খরচ সামলাতে পারে, সেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সুযোগের বৈষম্যও।”
এছাড়া, পুরান ঢাকার বায়ুদূষণ, দূষিত পানি ও অতিরিক্ত ভিড় তার জীবনের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য এই পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে, এত প্রতিকূলতার মাঝেও বিজয়ের স্বপ্ন থেমে নেই। তিনি শুধু নিজের নয়, সমাজের জন্যও কিছু করতে চান। নিজের গ্রামের মানুষের জন্য কাজ করাই তার অন্যতম লক্ষ্য।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তার প্রত্যাশা, আবাসন সংকটের দ্রুত সমাধান। তার বিশ্বাস, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মেধায় পিছিয়ে নেই; তারা শুধু সমান সুযোগ চায়।
প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে যারা এখানে পড়তে আসতে চান, তাদের জন্য বিজয়ের পরামর্শ, স্বপ্ন দেখুন, তবে প্রস্তুত হয়ে আসুন। আর্থিক ও মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত রাখুন এবং কোনো অবস্থাতেই হাল ছাড়বেন না। কারণ কঠিন পথই মানুষকে শক্ত করে তোলে।