সাতসতেরো

বিট জেনারেশন সম্পর্কে কতটা জানেন?

“বিট জেনারেশন” বা ‘বিটরা’ কারা?”—প্রশ্ন শুনতে সহজ মনে হলেও এর উত্তর দেওয়া আসলে বেশ জটিল। জ্যাক কেরুয়াক ‘বিট’ শব্দটিকে নেতিবাচক অর্থ থেকে সরিয়ে আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তিনি এটিকে beatific  বা এক ধরনের পবিত্র আনন্দের সঙ্গে তুলনা করেন।

তার মতে, বিট জেনারেশন হলো সেই প্রজন্ম, যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও কোরিয়ান যুদ্ধের পর হতাশ হয়ে বস্তুবাদী জীবন থেকে সরে এসে সহজ ও আধ্যাত্মিক জীবনের দিকে ঝুঁকেছিল।

গবেষক রবার্ট ইনচাউস্তিও মনে করেন, “বিট” হওয়া মানে এমন এক সমাজে আধ্যাত্মিক জীবন যাপন করা, যে সমাজ ধীরে ধীরে নিজের মূল্যবোধ হারাচ্ছে।

সহজভাবে বলা যায়, বিট জেনারেশন ছিল একটি সাহিত্যিক আন্দোলন, যা ১৯৪০-এর দশকে শুরু হয়ে ১৯৫০-এর দশকে ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায়। এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন জ্যাক কেরুয়াক, উইলিয়াম এস. বারোজ এবং অ্যালেন গিন্সবার্গসহ আরও অনেকে। 

গ্রেগরি করসো একবার বলেছিলেন, “তিনজন লেখক দিয়ে কোনো প্রজন্ম তৈরি হয় না।” অনেকেই মনে করেন, বিট জেনারেশন মানেই এই তিনজন—অ্যালেন গিন্সবার্গ, জ্যাক কেরুয়াক এবং উইলিয়াম এস. বারোজ। নিঃসন্দেহে তারা ছিলেন সবচেয়ে বিখ্যাত, এবং আন্দোলনের কেন্দ্রেও ছিলেন। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়।

জন ক্লেলন হোমস ১৯৫২ সালে লিখেছিলেন, “একটি পুরো প্রজন্মকে একটি নামে চিহ্নিত করার চেষ্টা সবসময়ই ব্যর্থ হয়।” সত্যিই, মাত্র তিনজন মানুষকে একটি প্রজন্ম বলা কিছুটা অযৌক্তিক। কারণ, পরবর্তী সময়ে যাদের ‘বিট’ বলা হয়, তাদের মধ্যে কোনো একক দর্শন, শৈলী বা লক্ষ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। তবুও, এই তিনজন লেখকের কাজই তাদের সময়ের ভাবনা ও লেখনশৈলীর প্রতিনিধিত্ব করেছে। মূলত তারাই “বিট” শব্দটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন।

সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক নাকি সামাজিক আন্দোলন? প্রথমে মনে হতে পারে, বিট জেনারেশন কেবল একটি সাহিত্যিক আন্দোলন। কিন্তু “বিট জেনারেশন” নামটি শুনলেই বোঝা যায়, এটি হয়তো একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক বা সামাজিক প্রবাহও ছিল। তাহলে প্রশ্ন আসে—১৯৫০-এর দশকের সব তরুণ কি বিট ছিল? নাকি কেবল লেখক ও শিল্পীরাই এই আন্দোলনের অংশ?

অ্যালেন গিন্সবার্গ ১৯৫৮ সালে বলেছিলেন, ‘‘এটি মূলত একটি সাহিত্যিক আন্দোলন—যেখানে কবিতা ও গদ্যের নতুন শৈলী নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছিল। তিনি মনে করতেন, সমাজবিজ্ঞানী বা সাংবাদিকদের অনেক ব্যাখ্যাই ছিল ভুল ও অপ্রাসঙ্গিক।’’

কিন্তু অন্য জায়গায় তিনি আবার বলেন, “বিট কোনো নির্দিষ্ট কবিতা বা উপন্যাস নয়—এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি, একটি মানসিকতা।”

অন্যদিকে গবেষক বিল মর্গান মনে করেন, বিট জেনারেশনকে একক সাহিত্যিক আন্দোলন বলা ঠিক নয়। বরং এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা, যা ১৯৬০-এর দশকের তরুণ সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

১৯৪০-এর দশকে জ্যাক কেরুয়াক ও অ্যালেন গিন্সবার্গ ‘নিউ ভিশন’ নামে এক নতুন ভাবধারার অনুসন্ধান শুরু করেন। তারা জীবনের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজছিলেন—যেখানে মানুষ নিজস্ব চিন্তা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সত্যকে উপলব্ধি করবে।

‘বিট’ হওয়া মানে ছিল মূলধারার বাইরে থাকা—ভিন্নভাবে চিন্তা করা, ভিন্নভাবে বাঁচা। অনেকেই মনে করেন “বিট” মানেই বিদ্রোহ। কিন্তু গিন্সবার্গ এই ধারণার সঙ্গে একমত ছিলেন না। তার মতে, বিটরা বিদ্রোহী নয়, বরং তারা প্রকৃতি ও মানবতার প্রতি আরও সংবেদনশীল ও আন্তরিক ছিল।

‘বিট’ শব্দটি সম্ভবত হার্বার্ট হাঙ্কে প্রথম ব্যবহার করেছিলেন। তিনি নিজেকে beat বা ক্লান্ত, পরাজিত মনে করতেন। সেই শব্দটাই পরে এই লেখকগোষ্ঠীর পরিচয়ে পরিণত হয়। তারা ছিল সমাজের বাইরে থাকা মানুষ—লেখক, শিল্পী, বোহেমিয়ান, এমনকি অপরাধীও—যারা প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় অসন্তুষ্ট ছিল, কিন্তু সেটিকে বদলানোর বদলে নিজেদের মতো করে বাঁচতে চেয়েছিল।

এই জেনারেশনে অনেকে ডায়ান দি প্রিমা, চার্লস বুকাওস্কি বা হান্টার এস. থম্পসনকেও বিট বা পোস্ট-বিট হিসেবে উল্লেখ করেন।

অ্যামিরি বারাকা হয়তো সবচেয়ে সরলভাবে বলেছিলেন—“বিট জেনারেশন ছিল বিভিন্ন জাতি ও পটভূমির মানুষের একটি দল, যারা বুঝতে পেরেছিল যে সমাজে কিছু একটা সমস্যা আছে।”

সূত্র: বিটডম ডটকম