গুলি-বারুদ আর হত্যার পথ মাড়িয়ে আমরা একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে মগ্ন ছিলাম। আমাদের ছিল একরাশ আশা, সামনে চলার দৃঢ় প্রত্যয়। বিরূপ অন্ধকারের ভিড়ে জেগে ছিল আমাদের স্বপ্ন। এখনও হয়ত স্বপ্ন বয়ে বেড়ায় বুকের ভেতর, এখনও স্বপ্নবাজ তরুণদের সঙ্গে স্বপ্ন বিনিময় হয়। অনিশ্চয়তা, শঙ্কা অস্থিরতার পর্ব পেরিয়ে বহু বছর পর ভোট এলো। মানুষ ভোট দিতে গেল, সরকার বদল হলো। ভেবেছিলাম ভালোর পথে শুরু হলো আমাদের যাত্রা। আমরা ভেবেছিলাম ঘুণে খাওয়া এই রাষ্ট্র কোনো এক দেবদূত এসে রক্ষা করবে। কিন্তু বৈশাখ বেলার তপ্ত রোদের ভেতর আমাদের স্বপ্নগুলো ফিকে হয়ে আসছে যেন।
পুড়ছে মানুষের জীবন, জীবিকা, আগুনের তাপে পুড়ছে বাজার লঞ্চঘাট, গণপরিবহন, পুড়ছে কাঁচা-শাকসবজিও। অর্থনীতির আগুন, নীতির দহন আর মানুষের দীর্ঘশ্বাস জমতে শুরু করেছে। ইরান যুদ্ধের আঁচ লেগেছে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই জনপদে। পেট্রোল পাম্পে সারি সারি যানবাহনের লাইন, তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিদারুণ অপেক্ষা। অসহিষ্ণু মানুষ, হাতাহাতি এমনকি তেলের জন্য মৃত্যুও। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখে ক্লান্তি, মুখে অনিশ্চয়তা। তেলের দাম বাড়ে, তারপর বাজারে আগুনের ঢেউ ওঠে। সেই ঢেউ গিয়ে লাগে চাল-ডাল, সবজি, মাছ-মাংসের দামে। সবচেয়ে বেশি আঘাত পায় সেই মানুষটি, যার আয় কখনও বাড়ে না, কিন্তু ব্যয় প্রতিদিন বাড়ে।
এলপিজি তো সোনার হরিণ। দোকানে দোকানে সারি সারি রঙিলা সিলিন্ডার, তবুও দাম চড়া। এক মাসে দুইবার এলপিজির দাম বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬০০ টাকা। সরকারি দাম কেউ মানছেন না। ভোক্তার পকেট কাটা পড়ছে। মানুষ বিপন্ন, মানুষ অসহায়। এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়ে, রান্নাঘরের চুলা নিভে যেতে চায়। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব আসে, ঘরের বাতি যেন আর আলো নয়, উদ্বেগের নাম। সরকারি খাতায় দাম বৃদ্ধি সমন্বয় হলেও তা আমাদের মতো দরিদ্র মানুষের পাতে ভাত কমিয়ে দেয়, শিশুর দুধের গ্লাস ফাঁকা করে দেয়, বৃদ্ধের ওষুধের তালিকা ছোট করে দেয়।
এখন প্রশ্ন জাগে— সামনে সেচ মৌসুম। জ্যৈষ্ঠ মাসের মাটি চাপা রোদ্দুরে যখন পুড়বে ফসল ক্ষেতের কচিপাতা, তখন কি কৃষক ডিজেল পাবে? তখন কি ন্যায্য দামে কৃষকের হাতে আসবে সার? কিংবা রোদ পেরিয়ে যে ফসল কৃষকের ঘরে আসবে তার প্রকৃত দাম কি পাবে কৃষক? উত্তর আমাদের জানা নেই। পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই বছরে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে, অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। যে দরিদ্র- নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার প্রতিদিন হিসাব মেলাতে গিয়ে হিমশিম খায়— তাদের কাছে উন্নয়নের অর্থ কী?
গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর জন্য দফায় দফায় বৈঠক চলছে। বাসভাড়া বেড়েছে। লঞ্চভাড়া বাড়বে। বাসের ভেতর ভাড়া নিয়ে হাতাহাতি হবে, ঝগড়া হবে। আমরা গালি শুনে ঘরে ফিরব, মন খারাপ নিয়ে ঘরে ফিরব। শিক্ষায় বাজেট বাড়বে, স্বাস্থ্যে বাজেট বাড়বে, সড়কে বাজেট হবে। তবুও অক্সিজেনের অভাবে কোনো রোগী মৃত্যুর খবর ছাপা হবে, টিকা না পেয়ে মরবে শিশু, আইসিইউয়ের অভাবে খালি হবে হতভাগা মায়ের বুক।
এই সবুজ গ্রহের আলো-বাতাস সৌন্দর্য উপভোগের আগেই গত এক মাসে হামের কারণে জীবনপ্রদীপ নিভেছে শতাধিক শিশুর। এদের বয়স এক বছরের নিচে। পত্রিকার পাতায় প্রতিনিয়ত ছাপা হচ্ছে শিশু মৃত্যুর খবর, দীর্ঘশ্বাসের খবর। হতভাগা মায়েদের বুক খালি হচ্ছে রাষ্ট্র নামক ভূগোলে। যখন জীবন বাঁচে না; তখন মিলেনিয়ার ডেভেলপমেন্ট গোলস, উচ্চাভিলাষী বাজেট, মাথাচাড়া দেওয়া উন্নয়ন, মধুর ভাষণ সবকিছুই অর্থহীন। এই দুইশ শিশু বড় হলে স্কুলে যেত, খেলত, স্বপ্ন দেখত। আমাদের রাষ্ট্রীয় অবহেলা কেড়ে নিল এই শিশুদের কোমল প্রাণ। এই মৃত্যুর দায় কার? কেউই দায় নিচ্ছে না। কোথাও কোনো অনুশোচনা নেই!
শীত পেরিয়ে প্রতিবছর নতুন শিক্ষাবর্ষ আসবে। বই ছাপাতে দেরি হবে, টেন্ডারে দুর্নীতি হবে। কোমলমতি কোনো কোনো শিশুর মন খারাপ হবে সময়মতো নতুন বই না পেয়ে। এরকম অসংখ্য মন খারাপ নিয়ে আমাদের আমাদের জীবনযাপনের অভ্যাস।
আসছে ৯ লাখ কোটি টাকার বাজের। ঘাটতি বাজেট, উন্নয়ন ব্যয়, সুদ পরিশোধ, ঋণের বোঝা, করের বোঝায় ত্রাহিদশা দেখা দেবে। রেকর্ড বাজেটে, উচ্চাভিলাষী বাজেটে মানুষের কষ্ট বাড়বে বৈ কমবে না। বাংলাদেশের ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট এখনও চূড়ান্তভাবে পাস হয়নি, তবে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র ও প্রাথমিক প্রস্তাবনা থেকে এর একটি স্পষ্ট কাঠামো পাওয়া যাচ্ছে। এই বাজেটটি এমন এক সময় আসছে, যখন অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক চাপ, জ্বালানি সংকট এবং রাজস্ব ঘাটতির মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের মোট বাজেটের আকার প্রায় ৯ লাখ কোটি থেকে ৯.২ লাখ কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেটগুলোর একটি। এই বড় আকারের বাজেট মূলত বাড়তি ভর্তুকি, সরকারি বেতন, সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার প্রয়োজনে সম্প্রসারিত হচ্ছে।
এই বাজেটের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো উচ্চ ঘাটতি। ধারণা করা হচ্ছে, বাজেট ঘাটতি প্রায় ২.৫ থেকে ২.৭ লাখ কোটি টাকা হতে পারে, যার একটি বড় অংশ দেশীয় ঋণ থেকে এবং বাকিটা বৈদেশিক উৎস থেকে নেওয়া হবে। অর্থাৎ, সরকারকে একদিকে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নিতে হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় বা এডিপি আগামী বাজেটে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ১.৯ লাখ কোটি টাকা আসবে দেশের নিজস্ব তহবিল থেকে এবং প্রায় ১.১ লাখ কোটি টাকা আসবে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে। এই উন্নয়ন বাজেটের মাধ্যমে অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাতে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, অতীতের মতো যদি প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, দুর্নীতি বা ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে, তাহলে এই উন্নয়ন ব্যয় প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে।
সবচেয়ে বড় চাপের জায়গাগুলোর একটি হলো ঋণের সুদ পরিশোধ। ২০২৬–২৭ বাজেটে সুদ বাবদ ব্যয় ধরা হচ্ছে প্রায় ১.৪২ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশীয় ঋণের সুদই প্রায় ১.১৫ লাখ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ কোনো উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয় না; বরং এটি অতীতের ঋণের মূল্য। ফলে বাজেটের একটি বড় অংশ কার্যত ‘অপ্রোডাক্টিভ’ব্যয়ে চলে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ব্যয়ের সক্ষমতাকে সংকুচিত করে।
ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ সহায়তা খাতেও বড় ব্যয় নির্ধারণ করা হচ্ছে। এই খাতে ব্যয় প্রায় ১.১৭ লাখ কোটি টাকা হতে পারে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, কৃষি ও খাদ্য খাতে ভর্তুকি দিতে গিয়ে সরকারকে এই বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ভর্তুকির চাপ আরও বেড়েছে। ফলে একদিকে সরকার দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে, অন্যদিকে ভর্তুকিও বাড়াতে হচ্ছে এই দ্বৈত চাপে বাজেট আরও ভারী হয়ে উঠছে। এই বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যও অনেক উচ্চ রাখা হবে, কারণ বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো তুলনামূলক কম। সরকার রাজস্ব বাড়াতে না পারলে ঘাটতি আরও বাড়বে, এবং ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও বারবার বলছে, রাজস্ব ব্যবস্থাকে শক্তিশালী না করলে অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হবে। সব মিলিয়ে ২০২৬–২৭ বাজেট একটি উচ্চাভিলাষী কিন্তু চাপপূর্ণ বাজেট হতে যাচ্ছে। একদিকে বড় বাজেটের মাধ্যমে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানোর চেষ্টা থাকবে, অন্যদিকে ঋণ, সুদ, ভর্তুকি ও ঘাটতির বোঝা এটিকে ভারী করে তুলবে।
বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ এখন প্রায় ২৬ লাখ কোটি টাকার ঘরে। প্রতি বছর রেকর্ড বাজেটের একটি বড় অংশ চলে যায় ঋণের সুদ পরিশোধে। সুদের এই শেকল আমাদের অর্থনীতিকে বেঁধে রাখে। আমরা ঋণ শোধ করতে নতুন ঋণের জালে জড়াই, বোঝা বাড়াই। এ এক চক্র, যার শুরু আছে, কিন্তু শেষ কোথায় তা কেউ জানি না। জনগণ যেহেতু ঋণগ্রস্ত রাষ্ট্রের মালিক; তাই তো আজকে যে শিশু জন্ম নিচ্ছে সে মাথাপিছু দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এই দেশে জন্মগ্রহণ করছে, যিনি মৃত্যুবরণ করছেন তিনিও দেড় লাখ টাকা ঋণের বোঝা নিয়ে মারা যাচ্ছেন। এই ঋণের একটি বড় অংশ আসে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে, যেমন বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। তারা আমাদের উন্নয়নের অংশীদার, আবার একই সঙ্গে আমাদের ওপর শর্ত আরোপকারীও। তাদের দেওয়া ঋণ অনেক সময় প্রয়োজনীয়, কিন্তু সেই ঋণের সঙ্গে আসে নীতিগত পরিবর্তনের চাপ। যা সবসময় সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির নয়। ভর্তুকি কমাতে হয়, দাম বাড়াতে হয়, আর তার ভার এসে পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের কাঁধে।
আমাদের তরুণরা এখনও স্বপ্ন দেখে। তারা পরিবর্তন চায়, তারা একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ চায়। কিন্তু যখন তারা দেখে তাদের চারপাশে অন্যায়, বৈষম্য, অনিশ্চয়তা তখন সেই স্বপ্নে ফাটল ধরে। একজন শিক্ষিত তরুণ যখন চাকরি পায় না, একজন মেধাবী ছাত্র যখন অভিমানে দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবে তখন তা ভাবনার বিষয়। আমরা পুড়ি, পুড়ে পুড়ে খাঁটি হই। টিকে থাকার সংগ্রাম, প্রতিদিনের কষ্টের মাঝে আমরা একটি ন্যায্য সমাজের, একটি স্বচ্ছ রাষ্ট্রের, একটি মানবিক অর্থনীতির স্বপ্ন দেখি। সেই স্বপ্নই আমাদের শক্তি, সেই স্বপ্নই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায়। সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন সঠিক নীতি, সৎ নেতৃত্ব, এবং সর্বোপরি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। উন্নয়ন যদি মানুষের জীবনে স্বস্তি না আনে, অর্থনীতি যদি মানুষের মুখে হাসি না ফোটায় তবে তা ব্যর্থ। লাখো শহীদের রক্তে কেনা এই বাংলাদেশ ব্যর্থ হবে নাকি সফল হবে- সেই উত্তর আমাদের খুঁজতেই হবে।