ভ্রমণ

মেদিনা, মরুভূমি আর তরল সোনার মরক্কো 

কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বিষয়ক দাবি রয়েছে অনেক দেশের—  চীনারা বলছে, সাংহাইয়ের হাইয়ার স্কুল, পাকিস্তান দাবি করে তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতীয়রা বলছে, বিহারের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। তবে গিনেস বুকের রেকর্ড ও ইউনেস্কো স্বীকৃতি দিয়েছে কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়কে। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকাল ৮৬৯ খ্রিস্টাব্দ। ইসলামের সোনালি যুগে এই বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠা। ফেজ নগরের ধনী নারী ফাতেমা আল ফিরিহী নির্মাণ করেন কারাউইন মসজিদ। পরে এটি রূপান্তরিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফাতেমার পরিবার তিউনিশিয়ার কারাউইন থেকে ফেজ শহরে বসবাস করতে আসেন। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ‘কারাউইন’। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, চিকিৎসা বিদ্যা, ইতিহাস, ভুগোলসহ আরও নানা বিষয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ফেজ নগরীকে বলা হতো ‘বাগদাদ অব দি ওয়েস্ট’।    

গল্পগুলো করছিল আমার গাইড মিস আমেনা; ৩০ বছর যিনি গাইড পেশায় নিযুক্ত ফেজ শহরে। মাঝবয়সী এই নারীর উদ্দীপনা আর ইংরেজি শুনে আমি অভিভূত! একবিংশ শতাব্দীতে আমি কারাউইন যেমন দেখলাম—সরু গলি দিয়ে হেঁটে যাবার সময় দূর থেকে দেখতে পেলাম একটি স্থানে পর্যটকের ভীড়। সামনে যেতে কিছু সময় লাগলো। গিয়ে দেখতে পেলাম বিশাল এক ব্রোঞ্জের দরজা। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কারাউইন দেখতে হবে। ভেতরে প্রবেশের অনুমতি নেই এখন। কারণ এটি এখন মসজিদে রূপান্তর করা হয়েছে। হয়তো সেভাবে আর চালু হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়টি। দরজা পেরিয়ে চোখ যায় একটি ফুয়ারা আর মোজাইকের কারুকাজ করা ফ্লোরে। আমি বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। পৃথিবীর প্রাচীন ও প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় দেখার অনুরণন নিজের ভেতরে এখনও টের পাচ্ছি। 

চৌয়ারা ট্যানারি

আমেনা আরও একটি স্থাপত্যের সামনে নিয়ে এলো। নাম ইনানিয়া মাদ্রাসা। মাদ্রাসাটি মারিনিদ শাসনামলে ১৩৫৫ সালে  প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি নির্মিত হয়েছে মারিনিদ ও মরোক্কোর স্থাপত্যের সংমিশ্রণে। কাঠ, পাথর ও মোজাইকের অসাধারণ কারুকাজ! পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াত, ইসলামিক জ্যামিতিক নকশার কারুকাজের মধ্যে মধ্যযুগের শৈল্পিক সমৃদ্ধি বোঝা যায়। মাদ্রাসার ঠিক উল্টো দিকে রয়েছে জলঘড়ি। প্রথম জলঘড়ি দেখলাম। আমেনা বলল, এ ধরনের জলঘড়ি পৃথিবীতে বিরল।  

আমেনা বলল, এখন জুতোর কারখানায় যাবো। এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ট্যানারি। গলির ভেতরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে গন্ধ নাকে এলো। একটি কারখানার চারতলা ছাদের উপর থেকে ট্যানারির কাজ দেখলাম। চৌয়ারা ট্যানারি নাম। একাদশ শতাব্দীর এ ট্যানারি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলছে। শ্রমিকেরা এখানে প্রাচীন পদ্ধতিতে পশুর কাঁচা চামড়া শোধন করে পাকা চামড়ায় পরিণত করেন।  

ফেজ নগরী নানা কারণে বিখ্যাত। এই শহরের টুপিরও ইতিহাস রয়েছে। এটিকে ফেজ টুপি, লাল টুপি কিংবা রুমি টুপি নামে ডাকা হয়। এই টুপির উৎপত্তি গ্রীসে। মধ্যযুগে এই টুপি মুসলিম বিশ্বে সমাদৃত ছিল। ফেজ নগরীর মেদিনা ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এই জীবন্ত জাদুঘরে প্রতিবেলায় পুদিনা চায়ের স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে।  

সাহারায় তাঁবুবাস— নীরবতার সোনালি বিস্তার

সাহারা মরুভূমি মরক্কোর সবচেয়ে রহস্যময় অধ্যায়। দিনের আলোয় সোনালি বালিয়াড়ি ঝলমল করে, আর রাতে আকাশভরা তারার নিচে এক অন্যরকম নিস্তব্ধতা নেমে আসে। ‘এলিজা ভয় লাগছে না?’ ‘Is it safe?’ শুভাকাঙ্ক্ষী ও বন্ধুদের এমন অনেক খুদে বার্তা পাচ্ছিলাম, যখন সাহারা তাঁবুবাসের কথা সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করেছি। 

যাই হোক, ফেজ শহরের রঙের ভুবন থেকে যাত্রা করলাম মরুর উদ্দেশ্যে। জীপ ছুটছে তো ছুটছেই। টুকটাক কথাবার্তা চলছে ইব্রাহিমের সঙ্গে। ইব্রাহিম ৫টি ভাষায় পারদর্শী— স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ, ইংরেজি, আরবি ও বারবার। সাহারা ছুঁয়ে গেছে পৃথিবীর ১২টি দেশ। ফেজ শহর থেকে ৩৭০ কিলোমিটার, ৮ ঘণ্টার ড্রাইভ ছিল আরফুদ শহরে, সেখান থেকে দেড় ঘণ্টার ড্রাইভ মারজুগা শহর। এই শহরের কোল ঘেঁষে সাহারা। মারজুগা শহরের কাছাকাছি আসতেই কিছু দূরে দেখতে পাচ্ছিলাম ঘন কুয়াশার মতো একটি কি যেন পথের একপাশ থেকে অন্যপাশে যাচ্ছে। ইব্রাহিম বলল, এলিজা দেখ মরু ঝড়। আমি সাথে সাথে ক্যামেরা তাক করলাম, কিন্তু ভিডিও কিংবা মোবাইলে কিছুই বোঝা গেল না। আমি ইব্রাহিমকে জিজ্ঞাসা করলাম, ভয়ের কোনো ব্যাপার আছে কি না? ইব্রাহিমের হাসি মুখে উত্তর— আমি ক্যাম্পে যোগাযোগ করেছি, আজ আবহাওয়া ভালো। আর মরু এলাকায় এরকম ছোটখাটো ঝড় চলতেই থাকে। 

গেছো ছাগলের পাল

মারজুগা শহরে এলাম। ইব্রাহিম বলল, আমাদের আরও কিছু সময় লাগবে ক্যাম্পে পৌঁছতে। তারপর আমার ড্রাইভার ইব্রাহিমের ভাষায় ‘অফ রোড’ রাস্তা ধরলাম। মানে কোন রাস্তা না বিস্তীর্ণ পথ। আপনি যেখান দিয়ে ইচ্ছে ড্রাইভ করতে পারবেন। ইব্রাহিম আরও বলছিল ‘Here you can make your own path.’ মুভিতে দেখা যায় অনেকটা সেরকম। গাড়ির চাকার ছাপ তৈরি হয়ে আছে। সেখান দিয়ে ১০০ কিলোমিটার বেগে একটি গাড়ি  চলে যাচ্ছে। আমি আর ইব্রাহিম সেরকম একটি পথ দিয়েই সাহারার দিকে যাচ্ছি, সেরকম গতিতে। সময় লাগলো ৩০ মিনিট। সমতল ভূমি শেষ হবার পর এলো বালির ছোট ছোট উঁচু-নীচু পাহাড়। মনে হচ্ছে এই গাড়ি উল্টে গেলো। আমি মুগ্ধ হয়ে ইব্রাহিমের বাহন চালাবার পারদর্শিতা উপভোগ করছি। মনে মনে একটু ভয়ও পাচ্ছি। গাড়ি উল্টে গেলে কী করবো! ইব্রাহিম আমার মনের কথা পড়ে ফেলল। বলল, এলিজা তুমি চুপ করে আছ কেন? ভয় পেও না। গাড়ি উল্টে যাবে না। অনেক পর্যটক বালির পাহাড়ে এরকম ড্রাইভ পছন্দ করে। 

চারদিকে বিরাণ মরুভূমি। ইব্রাহিম মনে করিয়ে দিল, রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে যেতে হবে উটের সওয়ারী হতে। তাঁবুবাস, উটের পিঠে সূর্য ডোবা দেখা, খানাদানা সব প্যাকেজের আওতাভুক্ত। যেতে যেতে চোখে পড়ছে ছোট ছোট গাছ, কোনোটিতে সবুজ পাতা রয়েছে, আবার কোনোটি পাতাবিহীন। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট গাড়ি চালিয়ে এলাম ক্যাম্পের সামনে। একি মরুভূমি! চারদিকে লাল গালিচা। দুদিকে তিনটি করে তাবু। লালগালিচা দিয়ে সোজা হেঁটে গেলে ডাইনিং হল। ডাইনিং হলের সামনে দেখতে পেলাম একজন ওয়েলকাম ড্রিংক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অরেঞ্জ জুস, পুদিনা চা আর পানি পরিবেশন করা হলো। আমার তাবু দেখিয়ে দেওয়া হলো। তাবুতে ঢুকে চোখ ছানাবড়া! এখানে আজ রাতের তাঁবুবাস। বাইরের সোনালি বালি না থাকলে এই রুমে প্রবেশ করলে কে বলবে মরুভূমিতে আছি!  

মারাকেশ শহরে একটি মসলার দোকান

যেতে হবে উটের মেলা দেখতে। আবার বালির পাহাড়ে ড্রাইভ। সেখানে থেকে ২৫ মিনিটে পৌঁছলাম উটের পিঠে চড়বার জন্য। একটি স্থানে এসে দেখলাম অনেকগুলো উট। ইব্রাহিম, মোহাম্মদ নামক এক উট চালকের কাছে আমাকে সোপর্দ করলো। আবহাওয়া ভালো, তবে সূর্যের তেজ বেশ কম, মাঝেমধ্যে বাতাস বইছে। আমার গলার স্কার্ফ নিয়ে মোহাম্মদ আমাকে মাথায় বেঁধে দিল, ঠিক যেমন এখানকার বেদুঈনরা রোদ, ধূলিঝড় থেকে রক্ষা পাবার জন্য মাথায় বাঁধে, আর বলল  Now you are Fatima. মোহাম্মদও দেখলাম তিনটি ভাষা জানে। ইংরেজি বলে দারুণ! আমি জিজ্ঞাসা করতে বাধ্য হলাম, কোথায় শিখেছ? সে বলল, আমি লিখতে পড়তে পারি না, শুধু বলতে পারি। সেই ছেলেবেলা থেকে বাবার সাথে কাজ করছি, সেই থেকেই অভ্যাস হয়ে গেছে। উটের পিঠে আমি আর মোহাম্মদ বালির পাহাড়ে উঠছি আর গল্প করছি। মোহাম্মদ আমার দেশের কথা শুনতে চাইল। আমি দেশের নাম বলার সাথে সাথে বলল, ইন্ডিয়া। আমি নিজের দেশের কথা বললাম। সে বলল, এর আগে বাংলাদেশের কথা সে শোনেনি।  

যথারীতি কিছু ছবি তুললাম। আকাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আজ সূর্য ডোবা দেখা সম্ভব হবে না। তারপরও মোহাম্মদ বলল, চলো আমরা সব থেকে উঁচু বালির টিলাতে যাবো। হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি। মোহাম্মদ তরতর করে উপরে উঠে গেল। আমি ভীষণ ধীর পায়ে উঠছি। উপরে দাঁড়িয়ে মোহাম্মদ বলছে, Yes, Eliza, you can do it. কিন্তু পা আর কাজ করছে না।  

উপর থেকে সূর্য না দেখলেও অনেক হোটেল দেখতে পেলাম। সব মাটির তৈরি। পাঁচ তারা হোটেলের মতোই নাকি সব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। যারা তাঁবুতে থাকতে চায় না তাদের জন্য এই সব হোটেল। উটের পিঠে ভ্রমণ করবার মতো এরকম অনেক জায়গা আছে এই শহরে। আমি সাহারার কিছুটা ভিতরে এবং যেখানে টুরিস্ট কম, সেরকম একটি জায়গায় আছি। তাই নেটওয়ার্ক একেবারেই নেই। ইচ্ছে করেই এরকম জায়গা নির্বাচন করেছি, যেখানে বেদুঈন, বারবার লোকদের সংখ্যা বেশি। 

শহর থেকে শহরে ছুটেছি

তারপর ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলাম। সন্ধ্যার কিছু আগে এসে পৌঁছলাম ক্যাম্পের কাছে। গাড়ি থেকে নেমে দেখি ক্যাম্পের ভিন্ন রূপ। লাল গালিচাজুড়ে ছড়িয়ে আছে ছোট ছোট সন্ধ্যা বাতি। সন্ধ্যায় আরও মায়াময় লাগছে তাঁবুর চারপাশ। আবারও পুদিনা চা পরিবেশন করা হলো। চা পান শেষে তাঁবুতে গেলাম। বিছানা ডাকছে। গা একটু এলিয়ে দিতে ইচ্ছে হলো। ডিনার দেওয়া হবে রাত ৯টায়। হাতে ঘণ্টাদেড়েক সময় পাওয়া গেল। বাড়িতে যোগাযোগ করতে হবে। নেটওয়ার্ক কিছুটা দুর্বল। 

ধীর পায়ে ডিনার রুমের দিকে গেলাম। এদের খাবার পরিবেশন করার পদ্ধতি তুরস্কের মতই— সালাদ আর স্টারটার শেষ হয় না। এগুলো খেয়েই পেট ভর্তি। মূল খাবারের চাহিদা কমে যায়। ডাইনিং হলে অন্য টেবিলে ছয় জনের একটি দল দেখতে পেলাম। তারা বেশ শোরগোল করেই খাবার উপভোগ করছে। হাসতে হাসতে আলখেল্লা পরিহিত একজন এসে আমায় অভিবাদন জানিয়ে বলল, আমার নাম মোস্তফা।

পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব: মেদিনা, মরুভূমি আর তরল সোনার মরক্কো