সারা বাংলা

ফেনী-ঢাকা রুটে মাসের ব্যবধানে দুই দফা বাস ভাড়া বৃদ্ধি

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী রুটে চলাচলকারী স্টার লাইন পরিবহন এক মাসের ব্যবধানে দুই দফায় ৪০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বৃদ্ধি করেছে। গত ঈদের আগে তারা ভাড়া বৃদ্ধি করে। এখন জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে সরকার থেকে ভাড়া বাড়ালে আরেক দফা ভাড়া বাড়ায়।

ফেনী-ঢাকা রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন বাসচালক, মালিকপক্ষ ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফেনী থেকে ঢাকা রুটে যাতায়াতে অন্তত সাতটি কোম্পানি লোকাল বাসে যাত্রী পরিবহন করেন। তবে এ রুটে স্থায়ীভাবে পরিবহন ব্যবসা করা একমাত্র পরিবহন স্টার লাইন। এ পরিবহনের মালিকপক্ষ গত ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে ঢাকা-ফেনী রুটে ২০ টাকা ভাড়া বাড়িয়েছিল, যা পরবর্তীতে আর কমানো হয়নি। সর্বশেষ জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষিতে সরকারের ভাড়া বৃদ্ধির নির্দেশনা পেয়ে তারা আবারও ২০ টাকা ভাড়া বৃদ্ধি করে। 

এ রুটে চলাচলকারী অন্যান্য লোকাল বাসগুলোও পূর্বের চেয়ে ২০-৩০ টাকা ভাড়া বাড়িয়েছে। তবে এসব পরিবহনের বেশিরভাগই যাত্রীদের সঙ্গে দরদাম করে ভাড়া নির্ধারণ করতে দেখা গেছে। যেখানে বাসভেদে ঢাকা পর্যন্ত ২৫০ টাকা থেকে ৩২০ টাকা নিচ্ছে। 

স্টার লাইন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে ফেনী থেকে ঢাকার টিটিপাড়া পর্যন্ত এসি বাসের সিট ভাড়া ৪৭০ টাকা, নন এসিতে ৪০০ টাকা। যা একমাস আগেও ছিল ৪৩০ ও ৩৬০ টাকা। ফেনী থেকে ঢাকার আবদুল্লাপুর-মিরপুর পর্যন্ত এসিতে ৫৪০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে, যা একমাস আগে ৪৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা করা হয়েছিল। ফেনী থেকে ঢাকার আবদুল্লাপুর-মিরপুর পর্যন্ত নন এসিতে ৪৭০ টাকা সিট ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এ পথে একমাস আগে ৪৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৫০ টাকা করা হয়েছিল। ছাগলনাইয়া, পরশুরাম ও সোনাগাজী থেকে টিটিপাড়া পর্যন্ত নন এসিতে সিট ভাড়া ৪৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই পথে আবদুল্লাপুর-মিরপুর পর্যন্ত এসিতে ৫৯০ টাকা ও নন এসিতে ৫২০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, বিআরটিএ থেকে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার হিসাবেও দেখা গেছে গড়মিল। যেখানে ফেনী থেকে ঢাকা ১৪৯ কিলোমিটার দূরত্বে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ২ দশমিক ২৩ টাকা করে ৪০ আসনের বাসের জনপ্রতি ভাড়া (টোল ব্যতীত) ৪২৪ টাকা দেখানো হয়েছে। এর সঙ্গে টোল জনপ্রতি ১৬ দশমিক ০৭ টাকা যোগ করে ৪৪০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে প্রকৃতপক্ষে প্রতি কিলোমিটারে ২ দশমিক ২৩ টাকা হিসাবে ১৪৯ কিলোমিটার দূরত্বে ভাড়া হওয়ার কথা ৩৩২ দশমিক ২৭ টাকা। এর সঙ্গে টোলের ১৬ দশমিক ০৭ টাকা যুক্ত হয়ে ৩৪৮ দশমিক ৩৪ টাকা প্রকৃত ভাড়া হওয়ার কথা ছিল। যেখানে ৯১ দশমিক ৬৬ টাকা গড়মিল রয়েছে। 

মহিন উদ্দিন নামে মানিকনগরের এক যাত্রী বলেন, এ রুটে যাতায়াতে স্থায়ীভাবে একমাত্র পরিবহন স্টার লাইন। লোকাল বাসগুলোতে দীর্ঘ সময় অপচয় ও অন্যান্য অসুবিধার কারণে মানুষজনের তেমন আগ্রহ থাকে না। এক মাস আগেও স্টার লাইনে ফেনী থেকে মানিকনগর পর্যন্ত ভাড়া ছিল ৩৬০ টাকা। গত রমজানের ঈদ উপলক্ষে সেই ভাড়া ২০ টাকা বাড়িয়ে ৩৮০ করা হলেও পরবর্তীতে আর কমানো হয়নি। এখন সরকারের ভাড়া বাড়ানোর অজুহাতে আরো ২০ টাকা বাড়িয়ে ৪০০ টাকা করেছে। এই ভাড়ার চাপ আমাদের জন্য বাড়তি বোঝা। 

আবুল বাশার নামে ঢাকার একটি বেসরকারি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী বলেন, ফেনী-ঢাকা রুটের সড়কপথে আমাদের একমাত্র যাতায়াত মাধ্যম স্টার লাইন পরিবহন। তারা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বারবার যাত্রীদের ওপর বাড়তি ভাড়ার চাপ দিচ্ছে। আমরা এখানে নিরুপায় হয়ে যাতায়াত করতে হয়। সরকার নির্ধারিত ভাড়া এখন শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। কোনো সংকট বা উৎসব ঘিরে ভাড়া বৃদ্ধি পরিবহন ব্যবসায়ীদের নিয়মে পরিণত হয়েছে। এবারও প্রথমে ঈদ উপলক্ষে ২০ টাকা ভাড়া বাড়ালো, এখন আবার তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে আরো ২০ টাকা বাড়িয়েছে। ফেনী থেকে মানিকনগর পর্যন্ত বর্ধিত ভাড়া ৩৮০ টাকা করলেও মানা যেত, এখনকার ৪০০ টাকা সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে আদায় করা হচ্ছে।

আব্বাস উদ্দিন নামে আরেক যাত্রী বলেন, বাস মালিকদের অযৌক্তিকভাবে ভাড়া বৃদ্ধির সাথে বিআরটিএ কর্মকর্তাদেরও দায় রয়েছে। তাদের নিরবতার কারণে বাস মালিকরা এমন স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ পান। 

ফেনী-ঢাকা রুটে চলাচলরত সিডিএম ট্রাভেলসের সুপারভাইজার সুমন বলেন, ‘‘মহিপাল থেকে কয়েকটি কোম্পানির লোকাল বাস এ পথে যাত্রী পরিবহন করে। আমাদের যাত্রা বিরতির নির্দিষ্টতা নেই। সেজন্য ভাড়াও তুলনামূলক কম। আগে ২০০ বা ২৩০ টাকা নেওয়া হতো। এখন ঢাকা পর্যন্ত ২৫০ টাকা থেকে ২৮০ টাকা নেওয়া হয়। তবে যাত্রীরা দরদাম করে আরো কম দেয়।’’ 

নেজাম উদ্দিন নামে আরেক বাসচালক বলেন, ‘‘মহিপাল থেকে আমাদের লোকাল বাসগুলোতে সরাসরি ঢাকার যাত্রী তুলনামূলক কমই পাওয়া যায়। তবে সবাই দরদাম করে ভাড়া দেন। এ ক্ষেত্রে ভাড়ায় তেমন নির্দিষ্টতা বা যাত্রা বিরতি নিয়েও সুনির্দিষ্টতা নেই।’’  

এদিকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ সত্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন স্টার লাইন গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান জাফর উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘‘আগেও আমরা সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম নিয়েছি। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ঈদের সময় ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল। তবে সেটিও তখনকার সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম ছিল। সর্বশেষ বিআরটিএ থেকে ৪০ সিটের একটি বাসের জন্য নির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে সমন্বয় করে বর্তমানে ৪০ টাকা কম রেখে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।’’ 

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে বিআরটিএ ফেনী সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) মো. আল ফয়সালের বক্তব্য জানতে তার দপ্তরে গেলেও চেয়ারম্যানের অনুমতি ছাড়া কোন বক্তব্য দেওয়া যাবে না বলে জানান। তবে অতিরিক্ত ভাড়া সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ থাকলে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে জানাতে বলেন তিনি।

এ ব্যাপারে ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রোমেন শর্মা বলেন, ‘‘অযাচিতভাবে ভাড়া বৃদ্ধি বা সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম রাখার কথা বলে বাহবা নেওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। পুরো বিষয়টি আমরা আরও খতিয়ে দেখব। যদি বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’