সারা বাংলা

মেঝেতে শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই, শিমুলের বাঁচার আকুতি

একসময় মানুষের দুঃখ-দুর্দশা তিনি তুলে ধরতেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখতেন সাহসের সঙ্গে। আজ সেই নারী সাংবাদিক শাহনাজ পারভীন শিমুল নিজেই এক করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি। দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। 

সিরাজগঞ্জ পৌরসভার সয়াধানগড়া মধ্যপাড়ার বাসিন্দা শিমুল; মৃত আব্দুল কাদেরের মেয়ে। দীর্ঘ সাত বছর স্থানীয় বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। রয়েছে ৪ বছরের একটি মেয়ে এবং ৩ বছরের ছেলেসহ পরিবার।

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সকালে শিমুলের বাড়ি গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর এই সাংবাদিক এখন বিছানায় শুতে পারেন না। মেঝেতেই নিথর হয়ে পড়ে থাকেন। চোখে-মুখে শুধু বাঁচার আকুতি।

পরিবার জানায়, ৫ বছর আগে পারিবারিকভাবে শিমুলের বিয়ে হয়। স্বামী অটোরিকশা বিক্রির শো-রুমে কাজ করেন। গত ৩ বছর শিমুলের চিকিৎসার পেছনে পরিবার প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। সিরাজগঞ্জসহ ঢাকা, রাজশাহীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। চিকিৎসক নিশ্চিত করেছেন শিমুল হাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ভারতে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই পথ এখন বন্ধ। চিকিৎসার খরচ জোগাতে পরিবারের জমি, স্বর্ণালঙ্কার, সঞ্চয় সবই বিক্রি হয়ে গেছে। তবুও থামেনি রোগের নির্মম অগ্রযাত্রা।

শিমুলের মা শাহিদা বেগম বলেন, ‘‘আমরা আর পারছি না। সব শেষ হয়ে গেছে। মানুষের কাছে হাত পেতেছি যদি কেউ আমার মেয়েটাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে।’’

স্থানীয়রা বলেন, একজন মানবিক ও সাহসী সাংবাদিককে এভাবে হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। প্রয়োজন শুধু সবার একটু সহানুভূতি ও সহযোগিতা।

নিজের অসহায়তার কথা বলতে গিয়ে শিমুল আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘‘কখনো ভাবিনি, একদিন নিজেই এমন অবস্থায় পড়ব। সবসময় মানুষের কথা লিখেছি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছি। আজ আমি নিজেই হেরে যাচ্ছি। তবুও বাঁচতে চাই—স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাই, আবার কলম হাতে নিতে চাই।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘চিকিৎসকেরা আশাবাদী উন্নত চিকিৎসা পেলে সুস্থ হওয়া সম্ভব। কিন্তু অর্থের অভাবে সেই সুযোগ পাচ্ছি না। আমি সবার কাছে হাতজোড় করে অনুরোধ করছি আমাকে বাঁচার একটা সুযোগ দিন। আপনাদের সামান্য সহায়তাই হয়তো আমার জীবন বাঁচাতে পারে।’’

সিরাজগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ইন্না বলেন, ‘‘শিমুল শুধু আমাদের সহকর্মী নন, তিনি একজন সাহসী কণ্ঠ। সবসময় মানুষের পাশে থেকেছেন। আজ তার এই দুঃসময়ে আমরা সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে সাহায্যের আহ্বান জানাই।’’

দৈনিক কলম সৈনিকের সম্পাদক আব্দুল হামিদ বলেন, ‘‘যদি একজন নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিক চিকিৎসার অভাবে হারিয়ে যান, তবে সেটা আমাদের সবার ব্যর্থতা। তাই সবাইকে তার পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ করছি।’’ চিকিৎসকদের মতে, রোগটি জটিল পর্যায়ে থাকলেও এখনও আশা শেষ হয়ে যায়নি। সময়মতো উন্নত চিকিৎসা পেলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আজ শিমুলের কলম থেমে আছে, কিন্তু তার জীবনের গল্প এখনো শেষ হয়নি। এই গল্পের পরিণতি কি হবে বেদনার, নাকি মানবিকতার জয়গানে লেখা নতুন এক জীবন তার উত্তর এখন সমাজের মানুষের হাতে।