ক্যাম্পাস

স্বপ্ন, ধৈর্য আর পরিশ্রমে বিভাগে শীর্ষস্থানে কুবি শিক্ষার্থীরা

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রতিটি করিডোর, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ আর গভীর রাতের নির্জনতায় লুকিয়ে থাকে অসংখ্য স্বপ্ন, সংগ্রাম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্প। সেই গল্পগুলো কখনো নিঃশব্দে জন্ম নেয়, কখনো ব্যর্থতার ভেতর দিয়ে বড় হয়, আবার কখনো একদিন ফলাফলের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসে নতুন করে অনুপ্রেরণা জাগায়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালযয়ের (কুবি) বিভিন্ন বিভাগের যেসব শিক্ষার্থী নিজেদের মেধা, পরিশ্রম ও দৃঢ়তায় প্রথম স্থান অধিকার করেছেন, তাদের সাফল্য শুধু একটি ফল নয়—এটি দীর্ঘ পথচলার এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

এই অর্জনের পেছনে রয়েছে অনিশ্চয়তা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস, ব্যর্থতাকে শক্তিতে রূপান্তরের গল্প এবং নিজেকে প্রতিনিয়ত ছাড়িয়ে যাওয়ার নিরন্তর চেষ্টা। মানসিক চাপ, আত্মসন্দেহ কিংবা প্রতিকূলতা; সবকিছুকে পেছনে ফেলে তারা গড়ে তুলেছেন নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান।

এই গল্পগুলোর একটি হুরে জান্নাত অর্নার। মার্কেটিং বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর; দুই ক্ষেত্রেই প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। কিন্তু এই সাফল্যের শুরুটা ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। তিনি স্মরণ করেন, “প্রথম ক্লাসেই ‘জীবনের লক্ষ্য’ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কিন্তু তখন আমার কাছে কোনো পরিষ্কার উত্তর ছিল না।” সময়ের সঙ্গে সেই উত্তর খুঁজে পেয়েছেন তিনি।

“শুরুর দিনগুলো সহজ ছিল না। নতুন পরিবেশ, ভিন্ন বাস্তবতা আর নিজের ভেতরের অজানা ভয়—সব মিলিয়ে এক ধরনের দ্বিধা কাজ করত। আমি পারব তো?” এই প্রশ্নই ছিল তার নিত্যসঙ্গী। তবে প্রথম সেমিস্টারের ফলাফল যেন তাকে নতুন করে সাহস জুগিয়েছিল। সেখান থেকেই জন্ম নেয় আত্মবিশ্বাস।

এরপর শুরু হয় ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলার গল্প। প্রতিদিন বাসে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা, ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট, সব মিলিয়ে ব্যস্ত এক জীবন। কখনো শরীর সঙ্গ দেয়নি, কখনো প্রতিকূল ছিল পরিবেশ, তবুও থেমে থাকেননি তিনি। এই পথচলায় বন্ধুদের সহায়তা আর পরিবারের সমর্থন ছিল তার শক্তির জায়গা। বিশেষ করে মায়ের দোয়া তাকে বারবার স্থির থাকতে সাহায্য করেছে। শেষ পর্যন্ত সেই চেষ্টার ফল মিলেছে। অনার্স ও মাস্টার্স—দুই পর্যায়েই বিভাগে প্রথম হওয়ার পাশাপাশি ফ্যাকাল্টিতে প্রথম হয়ে বৃত্তি এবং ভাইস চ্যান্সেলর পুরস্কার অর্জন করেছেন অর্না। তার ভাষায়, “বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুধু পড়াশোনা নয়; এটা নিজেকে খুঁজে পাওয়ার, বদলে যাওয়ার এবং বড় হয়ে ওঠার সময়।”

লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মরিয়ম আক্তার শিফার গল্পেও রয়েছে একইরকম অধ্যবসায়ের ছাপ। স্নাতকে প্রথম হওয়া তার জন্য শুধু একটি ফলাফল নয়, বরং দীর্ঘ পরিশ্রম ও ধৈর্যের প্রতিফলন। “অ্যাসাইনমেন্ট, ডেডলাইন, টার্ম পেপার, সবকিছুই নিয়মিত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে,” বলেন তিনি। ক্লান্তি ও হতাশা এলেও থেমে যাননি।

তার ভেতরের এক টুকরো স্বপ্নই তাকে সামনে এগিয়ে নিয়েছে। “আমি জানি, অধ্যবসায়ীরা কখনো ব্যর্থ হয় না”, এই বিশ্বাসই ছিল তার প্রেরণা। নিজের অর্জনকে ভবিষ্যতের বড় লক্ষ্য পূরণের পথে শক্তি হিসেবে দেখতে চান তিনি। একই সঙ্গে পরিবার ও শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “তাদের অনুপ্রেরণা ছাড়া এই পথ এতদূর এগোনো সম্ভব হতো না।”

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তামকিনা জাহান সূচীর গল্প যেন আরো বেশি নীরব অথচ গভীর। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনগুলো তার কাছে ছিল সম্ভাবনার আলোয় ভরা—নতুন বইয়ের গন্ধ, অচেনা ক্লাসরুম আর অজানা স্বপ্নের আহ্বান। শুরু থেকেই তিনি নিয়মিত ক্লাস করা এবং প্রতিদিনের পড়া শেষ করার অভ্যাস গড়ে তোলেন।

কিন্তু, পথটা মোটেও সহজ ছিল না। কখনো মানসিক চাপ, কখনো পারিবারিক দায়িত্ব, আবার কখনো নিজের ভেতরের সন্দেহ, সব বাধা তার সামনে এসেছে। তবুও তিনি থামেননি। “প্রতিটি ভোরে নিজেকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছি,” বলেন তিনি। রাতের নির্জনতায় বই আর কলমই হয়ে উঠেছিল তার সবচেয়ে কাছের সঙ্গী।

ব্যর্থতার মুহূর্তে নিজেকে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন “আজকের কষ্টই আগামী দিনের সাফল্যের ভিত্তি।” সেই বিশ্বাসই তাকে এনে দিয়েছে স্নাতকে প্রথম হওয়ার সাফল্য। তবে এটিকে তিনি শেষ নয়, বরং নতুন স্বপ্নের সূচনা বলেই মনে করেন।

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আয়েশা আক্তারের পথচলাও ভিন্ন এক বাস্তবতার গল্প বলে। তার একাডেমিক যাত্রার প্রকৃত সূচনা তৃতীয় সেমিস্টার থেকে। জীবনের এক অনিশ্চিত সময়ে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, কোন পথে এগোবেন। নিজের আগ্রহ, ভালো লাগা আর সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিয়েই তিনি পথ বেছে নেন।

বাংলা সাহিত্যকে তিনি গ্রহণ করেছেন নিজের অস্তিত্বের অংশ হিসেবে। সেই ভালোবাসাই তাকে পৌঁছে দিয়েছে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যে। দীর্ঘ সময় নিজেকে গুটিয়ে রেখে প্রতিটি মুহূর্তের সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন তিনি। “বাস্তবতা কঠিন হলেও হাল ছাড়িনি”, এই দৃঢ় বিশ্বাসই ছিল তার চালিকা শক্তি।

তার কথায়, একটি পথ বন্ধ হলে আরেকটি পথ খুলে যায়, এই আস্থাই তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় তিনি তার অনুভূতি প্রকাশ করেন, “ফুল ফুটলো না যে মরুভূমিতে—দুঃখ করিনে তার জন্য; আমার চির দগ্ধ বুক তো শীতল হলো।”

এই শিক্ষার্থীদের গল্প একসঙ্গে মিলিয়ে দেয় একটি সত্য; সাফল্য কখনো হঠাৎ করে আসে না। এটি ধৈর্য, পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং অদম্য চেষ্টার ফসল। তাদের এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণা, ভবিষ্যতের পথচলায় এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।