মানবসভ্যতার প্রতিটি অগ্রগতির পেছনে যে শক্তি নীরবে কাজ করে, তা হলো শ্রম। শহরের আকাশচুম্বী অট্টালিকা থেকে গ্রামের সোনালি ধানের মাঠ; সবখানেই মিশে আছে শ্রমিকের ঘাম, শ্রম আর নিঃশব্দ অবদান। অথচ সেই শ্রমিকই প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন তার ন্যায্য অধিকার থেকে। এ যেন এক নির্মম বৈপরীত্য।
শ্রমিকের অবদান নিয়ে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন—‘রাজপথে তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে, রেলপথে চলে বাষ্প-শকট, দেশ ছেয়ে গেল কলে, বল তো এসব কাহাদের দান! তোমার অট্টালিকা কার খুনে রাঙা? ঠুলি খুলে দেখ, প্রতি ইটে আছে লিখা।’
এই প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক, আজও অমোঘ। পহেলা মে; মে দিবস। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে দিনটি পালিত হয় শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের প্রতীক হিসেবে। এটি শুধু একটি দিবস নয়; এটি ইতিহাস, সংগ্রাম এবং ন্যায্যতার দাবির প্রতিধ্বনি। এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শ্রমিকদের অধিকার কোনো দয়া নয়, এটি তাদের প্রাপ্য।
প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত অসংখ্য শ্রমিক কাজ করেন; কারখানায়, নির্মাণস্থলে, পরিবহন খাতে কিংবা কৃষিক্ষেত্রে। তাদের শ্রমেই সচল থাকে অর্থনীতি, গড়ে ওঠে উন্নয়ন। অথচ বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই তারা ন্যায্য মজুরি পান না; কখনো বিলম্বিত হয়, কখনো কম দেওয়া হয়, আবার কখনো নানা অজুহাতে বঞ্চিত করা হয়।
বলা হয়ে থাকে ‘গায়ের ঘাম শুকানোর আগে শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করো’; একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য যা হতে পারত মৌলিক নীতি। কিন্তু সেই আদর্শ আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
এই বঞ্চনা শুধু একজন শ্রমিকের জীবনে কষ্ট বাড়ায় না; তার পরিবারের ভবিষ্যতকেও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। একটি পরিবারের স্বপ্ন, সন্তানের শিক্ষা, জীবনের নিরাপত্তা, সবকিছুই জড়িয়ে থাকে তার ন্যায্য প্রাপ্যের সঙ্গে।
সমস্যার পেছনে রয়েছে নানা কারণ; সচেতনতার অভাব, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং অনেক ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের অসদাচরণ। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় বিদ্যমান আইনগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি। একইসঙ্গে শ্রমিকদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কেও সচেতন হতে হবে। শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠন গড়ে তোলা এবং তাদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি।
তবে শুধু আইন বা সংগঠনই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন একটি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। একজন শ্রমিক কেবল ‘কর্মশক্তি’ নন; তিনি একজন মানুষ। তারও আছে স্বপ্ন, পরিবার, সম্মান। তার প্রাপ্য মজুরি সময়মতো দেওয়া মানে শুধু আর্থিক দায়িত্ব পালন নয়, এটি তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন।
রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ এবং সমাজ, সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই নিশ্চিত হতে পারে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার। ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক নিরাপত্তা ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না।
এই মে দিবস আমাদের জন্য হোক নতুন অঙ্গীকারের দিন; কথায় নয়, কাজে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার। কারণ একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে, শ্রমিকের ঘাম যেন বৃথা না যায়, তার প্রাপ্য যেন সে পায়, সময়মতো, সম্মানের সঙ্গে।