মৌলভীবাজারে ৯৩টি চা বাগানে পুব আকাশে সূর্য ওঠার আগেই শুরু হয় দিনের কর্মযজ্ঞ। এখানে মায়াবি সবুজ চা গাছের ফাঁকে লুকিয়ে আছে হাজারো শ্রমিকের লাঞ্চনা আর ঘাম জড়ানো বঞ্চনার গল্প।
মে দিবস এলেই শ্রমিকের অধিকার নিয়ে উচ্চারিত হয় নানা স্লোগান। কিন্তু ব্রিটিশ আমলের আদলে চলা চা বাগানগুলোতে সাহেব-বাবু আর শ্রমিক নেতাদের যাঁতাকলে পড়ে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকারগুলো আজও স্বপ্ন রয়ে গেছে। দেশ বদলায়, সরকার বদলায়, কিন্তু বংশ পরম্পরায় কাজ করে যাওয়া এই চা জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের চাকা আজও ঘুরেনি। মে দিবসে সুন্দর জীবনযাপনের নিশ্চয়তা চান জীবন সংগ্রামী এই চা শ্রমিকরা।
সকালে সামান্য রুটি বা এক মুঠো চালভাজা আর এক কাপ চা খেয়েই কাজে নামেন শ্রমিকরা। কাঠফাটা রোদ কিংবা ঝোড়ো বৃষ্টি- কিছুই তাদের থামিয়ে রাখতে পারে না। খালি পায়ে সাপ, জোক আর বিষাক্ত পোকামাকড় উপেক্ষা করে দিনভর চলে পাতা সংগ্রহের কাজ। দিন শেষে ২৩ কেজি পাতা তুলতে না পারলে জোটে না কাঙ্ক্ষিত ‘হাজিরা’। গাছ ছাঁটা বা কিটনাশক ছিটানোর ক্ষেত্রেও থাকে কঠোর লক্ষ্যমাত্রা। বর্তমানে মাত্র ১৮৭ টাকা মজুরিতে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
বংশ পরম্পরায় বাগানে বসবাস করলেও এক চিলতে জমির মালিকানা নেই তাদের। মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু ধরে রাখতে পরিবারের অন্তত একজনকে বাগানে কাজ করতে হয়।
রাজনগর ইটা বাগানের নারী শ্রমিক রহিমন আক্ষেপ করে বলেন, “বর্ষা এলে বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করতে হয়। মে দিবসে আমাদের দাবি- শ্রমিকদের সুপি (বেতের ছাতা) ও রেইনকোর্ট দিতে হবে।”
আরেক শ্রমিক রুনা বলেন, “আমাদের চিকিৎসার উন্নয়ন করতে হবে। সব রোগের ওষুধ হিসেবে শুধু প্যারাসিটামল দেয়। আমাদের সন্তানদের বাহিরে চিকিৎসা দিতে হয়, এতে খরচ বেড়ে যায়।”
অধিকার আদায়ের প্রধান বাধা হিসেবে এখন দেখা দিয়েছে শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন না হওয়া। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ঘোষ ও লংলা ভ্যালীর সভাপতি সাইদুর রহমান জানান, ২০১৮ সালের পর থেকে নির্বাচন হচ্ছে না। ফলে চা শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের কথা বলার মতো কোনো প্রতিনিধি নেই। দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব গঠনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে শ্রমিক সর্দার আমীর মিয়া জানান, চায়ের দাম না বাড়ায় মালিকপক্ষ সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে পারছে না। তবে বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের উপ-পরিচালক মহব্বত হোসাইন জানান, সরকার শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে বদ্ধপরিকর। শ্রমিকদের কল্যাণে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে চা শ্রমিকরা ১৮৭ টাকা পাচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে তারা। বাংলাদেশ শ্রমবিধিমালা ১৫ এর তফশীল পাস অনুযায়ী শ্রমিকদের শৌচাগার ব্যবস্থা, বিশিুদ্ধ পানীয় জলের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
মে দিবস এলে রাজপথে অধিকারের স্লোগান ওঠে, কিন্তু বাগানের গহীনে তার প্রতিধ্বনি পৌঁছায় না। সবুজ পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই কষ্টের গল্পগুলো বদলাতে হলে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক নেতাদের আন্তরিক সমন্বয় প্রয়োজন বলে মনে করছেন চা সংশ্লিষ্টরা।