ভোরের আলো ফোটার আগেই জেগে ওঠে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) ক্যাম্পাস। তবে এই জাগরণ শিক্ষার্থীদের কোলাহলে নয়; শুরু হয় কিছু নীরব মানুষের হাত ধরে। পরিচ্ছন্নতাকর্মী, হল স্টাফ, ক্যান্টিন কর্মচারী, মালি কিংবা নিরাপত্তাকর্মী; তাদের অদৃশ্য শ্রমেই প্রতিদিন সচল থাকে পুরো ক্যাম্পাস। তারা আড়ালে থাকেন, কিন্তু তাদের কাজের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা।
নীরব শ্রমে দিনের শুরু
সকাল হওয়ার আগেই কাজ শুরু করেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। তাদের একজন হৃদয় বাবু বলছিলেন, “৭ বছর ধরে এই দায়িত্ব পালন করছি। আমরা হরিজন, জাতিগতভাবেই এই কাজ করি। ভোর ৫টা থেকে ৯টা পর্যন্ত কাজ করি। শিক্ষার্থীরা আছে বলেই আমরা এখানে কাজের সুযোগ পেয়েছি। চেষ্টা করি সবসময় ক্যাম্পাস পরিষ্কার রাখতে।”
তাদের এই নিরলস পরিশ্রমেই প্রতিদিন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় শ্রেণিকক্ষ, করিডোর আর আবাসিক হল। একটি পরিষ্কার শ্রেণিকক্ষ বা সুশৃঙ্খল পরিবেশকে আমরা অনেক সময় স্বাভাবিক বলে ধরে নিই, কিন্তু এর পেছনে যে মানুষের ঘাম জড়িয়ে থাকে, তা সচেতনভাবে উপলব্ধি করা খুবই জরুরি।
নির্ঘুম রাতের নিরাপত্তা
দিনের আলো নিভে গেলে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন নিরাপত্তাকর্মীরা। এক আনসার সদস্য বলেন, “সারারাত একা ডিউটি করতে হয়। কথা বলার মানুষও থাকে না। পরিবারের সঙ্গে বেশি কথা বলতেও ভয় লাগে, মন খারাপ হয়ে যায়। জীবনটা অনেক কঠিন।”
তার এই স্বীকারোক্তি শুধু ব্যক্তিগত কষ্ট নয়; বরং একটি নিরাপদ ক্যাম্পাসের অদৃশ্য মূল্য। শিক্ষার্থীরা যখন নিশ্চিন্তে ঘুমায়, তখন কারো না কারো নির্ঘুম রাত সেই নিশ্চয়তার প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। নিরাপত্তা কোনো দৃশ্যমান সুবিধা নয়, এটি একটি অদৃশ্য নিশ্চয়তা, যা এই মানুষগুলোর ত্যাগে তৈরি হয়।
খাবারের পেছনের অদেখা ব্যস্ততা
ক্যাম্পাসের ডাইনিংয়ে প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থীর খাবার তৈরি হয়। এক ডাইনিংকর্মী বলেন, “সময়মতো খাবার দিতে অনেক চাপ থাকে। অভিযোগও শুনতে হয়, কিন্তু আমরা চেষ্টা করি যেন সবাই ভালোভাবে খেতে পারে।”
অন্যদিকে অফিস সহায়করা নীরবে চালিয়ে যান প্রশাসনিক কার্যক্রম। একজন জানান, “ফাইল আনা-নেওয়া, কাগজপত্র ঠিক রাখা, এসব কাজ আমরা করি। সামনে থাকি না, কিন্তু কাজের ধারাবাহিকতা আমাদের ওপরই নির্ভর করে।”
এই কাজগুলোকে আমরা প্রায়ই ‘ছোট’ বলে ভাবি, অথচ বাস্তবে এগুলোই একটি প্রতিষ্ঠানের মেরুদণ্ড। কারণ, একটি দিনও যদি এই চাকা থেমে যায়, পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়তে পারে।
অদেখা শ্রম, অপ্রকাশিত কৃতজ্ঞতা
অনেক শিক্ষার্থীই স্বীকার করেন, এই মানুষগুলোর অবদান নিয়ে তারা খুব একটা ভাবেন না। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাকলাইন মুস্তাক বলেন, “তাদের নিরলস পরিশ্রম আমাদের জীবনকে সহজ করে, অথচ আমরা তাদের প্রাপ্য সম্মান দিতে পারি না। তারা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারেরই অংশ, কিন্তু আমরা তা মানতে চাই না।”
এই স্বীকারোক্তির ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের সামাজিক বাস্তবতা, আমরা শ্রমকে ব্যবহার করি, কিন্তু সবসময় সম্মান দিতে শিখি না। অথচ একটি মানবিক সমাজ গড়ে ওঠে তখনই, যখন প্রতিটি শ্রমের মর্যাদা সমানভাবে স্বীকৃত হয়।
তবে, ভিন্ন চিত্রও আছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মাহবুবা ইসলাম মিলি বলেন, “এই ক্যাম্পাসের প্রতিটি ইট-পাথরের সঙ্গে মিশে আছে শ্রমজীবী মানুষের ঘাম। মালী মামার হাতে সবুজ ক্যাম্পাস, আনসার মামার নির্ঘুম রাত আমাদের নিরাপত্তা, আর পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের শ্রমে আমরা পাই সুন্দর পরিবেশ।”
তিনি আরো বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞানার্জনের জায়গা নয়, মানুষ হয়ে ওঠার জায়গাও। আর মানুষ হওয়ার প্রথম শর্ত, মানুষকে তার শ্রম ও মর্যাদার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা।”
অদৃশ্য কিন্তু অপরিহার্য
নোবিপ্রবি ক্যাম্পাসের প্রতিটি পরিচ্ছন্ন করিডোর, নিরাপদ হল, সবুজ প্রাঙ্গণ ও সময়মতো পাওয়া খাবারের পেছনে রয়েছে এই মানুষগুলোর অবদান। কিন্তু বাস্তবতা হলো—তাদের প্রাপ্য সম্মান, স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন এখনও অনেকাংশেই অনুপস্থিত।
এখানেই আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, আমরা কি কেবল সুবিধাভোগী, নাকি সচেতন সহযাত্রী? একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেখানে জ্ঞানের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধও চর্চা হয়।
এই মানুষগুলোর প্রতি সম্মান দেখানো মানে শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ নয়; এটি একটি ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের প্রথম ধাপ। তাদের কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া মানে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা, যা ভবিষ্যতের নাগরিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের নৈতিক দায়িত্বের অংশ হওয়া উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয় কেবল শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবার। আর সেই পরিবারের নীরব, অদৃশ্য শ্রমিকরাই প্রতিদিন নিজেদের পরিশ্রমে ধরে রাখছেন এই কাঠামোকে।
তাদের গল্প যত বেশি বলা হবে, ততই বদলাবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ, দৃশ্যমান সাফল্যের পেছনে সবসময়ই থাকে কিছু অদৃশ্য হাত; যারা নিঃশব্দে গড়ে দেয় আগামী দিনের ভিত্তি।