মাছ চাষে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত সুষম খাদ্য ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৫টি ভিন্ন স্থানে ২৭ এপ্রিল থেকে শুরু করে পাঁচ দিনের একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়।
এতে ময়মনসিংহ অঞ্চলের ৩৫০ জন মৎস্যচাষিকে উৎপাদন বৃদ্ধির কৌশল, অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত সুষম খাদ্যের ব্যবহার এবং টেকসই চাষাবাদ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। দেশের মাছ উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় এই অঞ্চলে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন আরো বাড়ানোর লক্ষ্যেই কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করা হয়।
নারিশ পোল্ট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেডের উদ্যোগে ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার বিভিন্ন এলাকায় এ কর্মশালাগুলো অনুষ্ঠিত হয়। এতে ময়মনসিংহের চারটি উপজেলা ও নেত্রকোনার একটি উপজেলায় মোট পাঁচটি কর্মশালা আয়োজন করা হয়। প্রতিটি কর্মশালায় প্রায় ৭০ জন করে মোট ৩৫০ জন মৎস্যচাষি, ফিড ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা অংশ নেন।
‘গুণগত খাদ্য পরিমিত পরিমাণ, মাছের বৃদ্ধি চাষির লাভ’ এই প্রতিপাদ্যে আয়োজিত কর্মশালাগুলোতে সার্বিক সহযোগিতা করে ইউএস গ্রেইনস অ্যান্ড বায়োপ্রোডাক্টস কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি)। প্রথম কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয় নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায়। পরে পর্যায়ক্রমে ময়মনসিংহের ফুলপুর, মুক্তাগাছা, সদর (শম্ভুগঞ্জ) ও ফুলবাড়িয়ায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
প্রতিদিনের কর্মশালা দুটি সেশনে ভাগ করা হয়। প্রথম সেশনে মাছ চাষের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা এবং দ্বিতীয় সেশনে মাঠপর্যায়ে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মৎস্য বিশেষজ্ঞ ড. মহিউদ্দিন আমিরুল কবির চৌধুরী।
কর্মশালাকে অংশগ্রহণমূলক করতে প্রশিক্ষণার্থীদের পাঁচটি দলে ভাগ করা হয়। প্রতিটি দল পুকুরের মাটি ও পানি ব্যবস্থাপনা, খাদ্য প্রয়োগ, রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা করে। পরে দলভিত্তিক উপস্থাপনা ও পোস্টার প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের শেখা বিষয় তুলে ধরা হয়। প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের মূল্যায়নের জন্য কুইজের আয়োজনও করা হয়।
ইউএসজিবিসির গ্লোবাল স্ট্যাটিস্টিকস অ্যান্ড ট্রেড ম্যানেজার মার্ক সিভিয়ার বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। সঠিক পুষ্টি ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন কৌশল সম্পর্কে বাস্তব ধারণা খামারিদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নারিশ পোল্ট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেডের সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের এভিপি সামিউল আলিম বলেন, “নিরাপদ খাদ্যের মাধ্যমে নিরাপদ পণ্য উৎপাদনই আমাদের লক্ষ্য।” তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি অ্যান্টিবায়োটিক ও কেমিক্যালমুক্ত মাছের খাদ্য উৎপাদন করে, যা আন্তর্জাতিক আইএসও ও এইচএসিসিপি মানদণ্ডে স্বীকৃত।
প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক এস এম এ হক বলেন, “মাছ চাষে লাভবান হতে পুকুর ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত মজুদ, অক্সিজেনের স্বল্পতা এবং অ্যামোনিয়ার মাত্রা সম্পর্কে অজ্ঞতা খামারিদের ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই সুষম খাদ্য ব্যবহার ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া ফুলপুরের মৎস্যচাষি মো. আব্দুল করিম জানান, এই প্রশিক্ষণ থেকে তিনি পুকুর ব্যবস্থাপনা, সঠিক খাদ্য প্রয়োগ ও রোগ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, যা উৎপাদন খরচ কমাতে এবং ফলন বাড়াতে সহায়ক হবে।
স্থানীয় ফিড ডিলার মো. সোহেল রানা বলেন, এ ধরনের প্রশিক্ষণ খামারিদের আরো কার্যকর পরামর্শ দিতে সহায়তা করবে, যা উন্নতমানের ফিড ব্যবহার ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
তাত্ত্বিক আলোচনার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে ব্যবহারিক প্রদর্শনী থাকায় অংশগ্রহণকারীরা বাস্তবমুখী অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান। আধুনিক ও ব্যয়সাশ্রয়ী পদ্ধতিতে পুকুর ব্যবস্থাপনা, সুষম খাদ্য ব্যবহার এবং উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেওয়া হয় কর্মশালায়।