সারা বাংলা

সুনামগঞ্জে সরকারি ধান সংগ্রহ শুরু, উদ্বেগে কৃষক

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে চরম সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। একদিকে বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের ধান এখনো পানির নিচে তলিয়ে আছে, অন্যদিকে, রোদের অভাবে কাটা ধান শুকাতে না পারায় তাতে দেখা দিয়েছে পচন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই শুরু হয়েছে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম, যা বাস্তবে কৃষকদের জন্য আশার আলো না হয়ে নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাষিরা বলছেন, তাদের খাবারের মতো ধান ওঠেনি, যা উঠেছে সেখান থেকেও বিক্রি অসম্ভব। 

শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওরের কৃষক সেলিম মিয়া রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “ধান তো পানির নিচে, যেগুলো কেটেছি সেগুলোও শুকাতে পারছি না। এই অবস্থায় বিক্রি করব কীভাবে? আমাদের এতো ধান নষ্ট হলো, কিন্তু প্রশাসনের কেউ একবারের জন্য আসলো না।”

একই হাওরের কৃষক নুরুজ্জামান হক বলেন, “বৃষ্টি আর মেঘলা আকাশের কারণে ধান শুকানো যাচ্ছে না। রবিবার যেভাবে রোদ ছিল, এভাবে আজও থাকলে ধানের উপকার হতো। এখন ভয় পাচ্ছি যে, কষ্ট করে ফলানো ধানের ন্যায্য মূল্য তো দূরের কথা ন্যূনতম দাম পাবো কি না তা নিয়ে।”

যেসব কৃষক কোনোভাবে ধান কাটতে পেরেছেন, তারাও ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কা করছেন। তাদের অভিযোগ, ধানের দাম মাত্র ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বলছেন ক্রেতারা। যেখানে সরকার নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৪৪০ টাকা। মূলত সংকটের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অতি মুনাফালোভী কম দামে ধান নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।  

সদর উপজেলার কৃষক আমির উদ্দিন বলেন, “আমাদের ধান পানিতে ভিজে নতুন করে চাড়া গজিয়েছে। বেশিরভাগ ধান নষ্ট হয়েছে, যা পেয়েছি তা শুকানোর চেষ্টায় আছি। ধান কেনার জন্য যারা আসছেন, তারা ধান পছন্দ করছেন না। এক মণ ধানের দাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বলছে। ধান চাষের জন্য নেওয়া ঋণ কোথা থেকে দেব, আর কিভাবে খাব খুব টেনশন আছি।”

হাওরাঞ্চলের কৃষকরা দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, ধান শুকানোর জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা এবং পাশাপাশি ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

গবিন্দপুর গ্রামের কবির হোসেন বলেন, “কাটা ধানে চারা গজিয়েছে, সেই ধান আর কোনো কাজে লাগবে না। এই ধান বাড়ি থেকে বাইরে নিয়ে ফেলে দেবো সেটার জন্যে টাকা লাগবে। সবকিছুতেই লস হচ্ছে।” 

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, রবিবার মধ্যরাতে আবার বৃষ্টি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। একই সময় সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর পয়েন্টে ১২ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে এই পয়েন্টে নদীর পানির স্তর ৪.৮৭ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে, যা বিপৎসীমার ১.১৮ মিটার নিচে। 

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুলতানা জেরিন বলেন, কৃষকরা যেনো ধানের ন্যায্যমূল্য পান, মধ্যস্বত্বভোগী কেউ আসতে না পারে সেজন্য প্রতিটি উপজেলার খাদ্য কর্মকর্তারা সচেতন আছেন।

সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের আহরণ ও ব্যয়ন কর্মকর্তা বি. এম. মুশফিকুর রহমান বলেন, “প্রতিবছরের মতো এ বছরও সরকার ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করছে।  সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলার অনুকূলে ২১ হাজার ৩৪৯ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি কেজি ধানের সংগ্রহমূল্য ৩৬ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মণ ধানের মূল্য ১ হাজার ৪৪০ টাকা মন। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে সুনামগঞ্জ জেলায়  ধান সংগ্রহ শুরু করেছি। এখন পর্যন্ত আমরা ১৮ মেট্রিক টন ধান ক্রয় করতে সক্ষম হয়েছি।” 

তিনি বলেন, “এবার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার কাজ আমরা হাতে নিয়েছি। মাঠ পর্যায়ে যে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা আছেন, তাদের মাধ্যমে আমাদের কাছে তালিকা দেওয়া হয়েছে। ওই তালিকায় নির্ধারিত কৃষকদের কাছ থেকেই আমরা ধান সংগ্রহ করছি। আমরা ধানের মূল্য সরাসরি কৃষকের হাতে দেই না। কৃষকের নিজস্ব ব্যাংক একাউন্টে আমরা পে করি। সে কারণে কোন দালালের দৌড়ত্ব এখানে হবে না।”