চলতি বছরের বিধানসভা নির্বাচনে থালাপাতি বিজয় যদি তামিলনাড়ু জয় করেন, তবে ৪৯ বছরের ইতিহাসে প্রথম কোনো অভিনেতা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হবেন। ১৯৭৭ সালে সর্বশেষ অভিনেতা এম. জি. রামাচন্দ্রন যেভাবে রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন, তারপর আর কেউ তা করতে পারেননি।
১৯৭৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এম. জি. রামাচন্দ্রন শেষবার সিনেমা থেকে এসে সরাসরি ফোর্ট সেন্ট জর্জ দখল করেছিলেন। ১৯৮৭ সালে মারা যান রামাচন্দ্রন। ঝড়ের গতিতে জয়লাভ করা এই অভিনেতা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অর্থাৎ এক দশক তামিলনাড়ু শাসন করেন। ভক্তদের আবেগকে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক যন্ত্রে রূপান্তর করেন তিনি। কল্যাণমূলক রাজনীতিকে ভোটারদের আবেগের সঙ্গে যুক্ত করেন; ব্যক্তিত্ব ও নীতির সম্পর্ককে স্থায়ীভাবে বদলে দেন।
এরপর আর কোনো অভিনেতা সেই চূড়ান্ত নির্বাচনি সীমানা অতিক্রম করতে পারেননি, যদিও বহুবার চেষ্টা হয়েছে, তাদের বিপুল সংখ্যক ভক্ত-সমর্থকও ছিল। জে. জয়ললীতাও বড় মাপের চলচ্চিত্র তারকা হওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী হন। কিন্তু এম. জি. রামাচন্দ্রনের গড়ে তোলা রাজনৈতিক দল ‘এআইএডিএমকে’ দলকে উত্তরাধিকারসূত্রে গ্রহণ করে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেন। তবে নিজে নতুন কোনো রাজনৈতিক দল গড়ে এই মসনদ পাননি।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাথমিক গণনা বলছে, বিজয়ের দল তামিলাগা ভেত্রি কোঝাগম (টিভিকে), যা মাত্র দুই বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় ১০০–১১৮টি আসনের মধ্যে দলটির অবস্থান। এমনকি সর্বনিম্ন আসনেও, এটি বিজয়কে তামিলনাড়ু রাজ্যের রাজনীতির শীর্ষ সারিতে দৃঢ়ভাবে দাঁড় করিয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনে ২৩৪ আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১১৮টি; যার খুব কাছে রয়েছে বিজয়ের দল। সুচিন্তিত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন—বিজয়ের এই উত্থানকে চমকপ্রদ করে তুলেছে। তবে পূর্বসূরিদের মতো সিনেমা জগতে থেকে রাজনীতির সঙ্গে কিছুটা হলেও জড়িয়েছিলেন এই তারকা।
২০০৯ সালে বিজয় তার ফ্যান ক্লাবগুলোকে সুসংগঠিত করে। নাম দেন—বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম। শুরুতে এটি কল্যাণমূলক ও সামাজিক কাজের সংগঠন হিসেবে কাজ করে। পরে ত্রাণ, শিক্ষা সহায়তা ও স্থানীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে এটি বুথ-লেভেলে পরিচিতি তৈরি করে। ২০১১ সালে এআইএডিএমকে জোটকে প্রকাশ্যে সমর্থন করে এটি; যা ছিল বিজয়ের প্রথম সরাসরি নির্বাচনি অবস্থান এবং তার জনপ্রিয়তা ভোটে রূপান্তরিত হতে পারে কি না তার পরীক্ষা।
২০১০ সালের শেষভাগ ও ২০২০ সালের শুরু পর্যন্ত বিজয়ের সিনেমাকেন্দ্রিক জনসমাগমে রাজনৈতিক বার্তা আরো স্পষ্ট হতে থাকে। ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের সমালোচনা করে সিনেমার বাইরে অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দেন বিজয়। অডিও লঞ্চ, ফ্যান মিটিং ও সামাজিক কার্যক্রমে পরীক্ষার চাপ, বেকারত্ব, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক সমস্যা নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন—যা নতুন ভোটার ও শহুরে তরুণদের মাঝে সাড়া ফেলে।
বিজয় তার দল গঠনের আগেই সংগঠনের শক্তির প্রমাণ দেন। ২০২১ সালের স্থানীয় নির্বাচনে ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’-এর প্রার্থীরা অধিকাংশ আসনে জয়ী হন; যা প্রমাণ করে যে, এই নেটওয়ার্ক শুধু ভিড় জমায় না, ভোট আনতেও সক্ষম। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে, বিজয় যখন তামিলাগা ভেত্রি কোঝাগম (টিভিকে) দল প্রতিষ্ঠা করেন, তখনই স্পষ্ট করে দেন—২০২৬ সালের নির্বাচনে তার দল একাই লড়বে, কোনো জোট করবে না। কেবল তাই নয়, ডিএমকে-এআইএডিএমকে দ্বিমুখী রাজনীতির বিকল্প হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে।
এরপর বিজয় চলচ্চিত্র জীবন থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেন। প্রায় ৩০ বছরের ক্যারিয়ারে ৭০টির মতো সিনেমায় অভিনয় করার পর এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। তার পরিষ্কার বার্তা—এটি (রাজনীতি) আর পার্শ্ব প্রকল্প হিসেবে নেই। পরবর্তী দুই বছরে টিভিকে একটি ফ্যানভিত্তিক নেটওয়ার্ককে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে রূপান্তর করে। জেলা কমিটি, বিধানসভা ইউনিট, বুথ-লেভেলে সংগঠন গড়ে তোলেন। তাদের মূল বার্তা ছিল—শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দুর্নীতির বিরোধিতা ও জবাবদিহিতা।
প্রচলিত বক্তা হিসেবে নয়, বরং একজন শ্রোতা হিসেবে বিজয় নিজেকে তুলে ধরেন। সোশ্যাল মিডিয়া টাউন হল ও নিয়ন্ত্রিত জনসভা এর প্রধান মাধ্যম ছিল। তবে এই পথটা একেবারে মসৃণ ছিল না। ২০২৫ সালে করুরে বিজয়ের জনসভায় পদদলিত হয়ে অনেকে মারা যান। এ ঘটনা তাকে বড় সংকটে ফেলে দেয়। এতে সংগঠনের শৃঙ্খলা ও দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ ঘটনার পর বিজয়ের প্রতিক্রিয়া ছিল—সংযত, প্রকাশ্য ও সংশোধনমূলক। প্রথমবারের মতো বিজয় দেখান, বড় প্রশাসনিক সংকট কীভাবে সামলাতে হয়। এখন পরিসংখ্যান বলছে, তার এই ঝুঁকি নেওয়াটা কাজে দিয়েছে।
পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও প্রায় ১১০টি আসন বিজয়কে সরকার গঠনের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারে। সেটা হতে পারে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে, নয়তো মূল শক্তি হিসেবে। তবে নির্বাচনের আগে জোট করতে বিজয়ের অস্বীকৃতির অর্থ হলো, নির্বাচন পরবর্তী যেকোনো ব্যবস্থা তার প্রতিষ্ঠান বিরোধী অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা।
কাঠামোগতভাবে এর প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। ডিএমকে-নেতৃত্বাধীন জোট, দুর্বল হলেও টিকে থাকা এআইএডিএমকে-এর পাশাপাশি টিভিকে শক্তিশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এম. জি. রামাচন্দ্রনের উত্থানের পর যে তোলপাড় হয়েছিল, তারপর তামিলনাড়ু সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এতদিন ছোট দলগুলো বড় দুই দলের ওপর নির্ভরশীল ছিল, এখন তৃতীয় শক্তি পাচ্ছে।
এম. জি. রামাচন্দ্রনের সঙ্গে তুলনা অনিবার্য হলেও তা অসম্পূর্ণ। যেখানে এম. জি. রামাচন্দ্রন নাটকীয় বিভাজন এবং জনকল্যাণমূলক জনতুষ্টিবাদী ঢেউয়ের ওপর ভর করে জয়ী হয়েছিলেন, সেখানে বিজয়ের আহ্বানের মূলে রয়েছে প্রজন্মগত উদ্বেগ, শাসন-ক্লান্তি এবং স্বচ্ছ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি। এটি ক্ষমতায় রূপ নেবে, না কি শুধু রাজনীতির মানচিত্র বদলাবে—তা সময় বলবে। তবে ২০২৬ সালে ইতোমধ্যে তামিলনাড়ুর রাজনীতির ভাষা বদলে দিয়েছে। প্রায় পাঁচ দশক পর প্রথম অভিনেতা হিসেবে বিজয় ফোর্ট সেন্ট জর্জে প্রবেশ করবেন, নয়তো প্রমাণ করবেন—এমন ঘটনা আর অসম্ভব নয়!