ক্যাম্পাস

হাওরে আগাম বন্যা ঠেকাতে স্বল্পমেয়াদি বোরোধান চাষে সাফল্য

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা প্রতি বছরই আগাম ও আকস্মিক বন্যার কবলে পড়ে, যার ফলে ব্যাপক কৃষি ক্ষতি হয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি বোরোধান চাষে সফলতা পেয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। তাদের মতে, এই পদ্ধতিতে বন্যা শুরু হওয়ার আগেই ধান ঘরে তোলা সম্ভব।

সোমবার (৪ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান গবেষক অধ্যাপক মো. হাবিবুর রহমান প্রামানিক এ তথ্য জানান। এ সময় সহযোগী গবেষক অধ্যাপক ইসরাত জাহান শেলীসহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে, যার মধ্যে প্রায় ১৮ শতাংশ উৎপন্ন হয় হাওরাঞ্চলে। তবে আগাম বন্যার কারণে প্রতিবছর হাওরের ধানক্ষেতে ১০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়ে থাকে। এতে কৃষকেরা শেষ মুহূর্তে এসে ফসল ঘরে তুলতে ব্যর্থ হন, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

অধ্যাপক প্রামানিক জানান, হাওরের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এপ্রিলের শেষ দিক থেকেই বন্যার পানি ঢুকতে শুরু করে, যা মে মাসে সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়। গত ৩৬ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মে মাসে বন্যার ঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ এবং এপ্রিলের শেষার্ধে প্রায় ৪২ শতাংশ। তাই এপ্রিলের মাঝামাঝির আগেই ধান কাটা গেলে ক্ষতির ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

এই লক্ষ্যেই ২০২০ সাল থেকে হাওরে স্বল্পমেয়াদি বোরোধান চাষ নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। গবেষকরা জানান, প্রচলিত দীর্ঘমেয়াদি জাতের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি ধান চাষ করলে ১৫ থেকে ২০ দিন আগেই ফসল কাটা যায়।

হাওরে বহুল চাষ হওয়া ব্রি ধান প্রসঙ্গে অধ্যাপক প্রামানিক বলেন, “হাওরে বহুল চাষ হওয়া ব্রি ধান-৯২-এর জীবনকাল প্রায় ১৬০ দিন, যা কাটতে বৈশাখের মাঝামাঝি সময় লাগে, ঠিক তখনই বন্যা শুরু হয়। এর পরিবর্তে ব্রি ধান-৮৮, ব্রি ধান-১০১, ব্রি ধান-১১৩, ব্রি ধান-১০৫ ও ব্রি ধান-২৫-এর মতো স্বল্পমেয়াদি জাত (প্রায় ১৪৫ দিন) ব্যবহার করলে একই সময়ে রোপণ করেও অন্তত ১৫ দিন আগে ধান ঘরে তোলা সম্ভব।”

মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় দেখা গেছে, ২৬ ডিসেম্বর রোপণ করা ব্রি ধান-৮৮ এপ্রিলের ৮ তারিখেই কাটা গেছে। একইভাবে অষ্টগ্রাম ও ইটনা এলাকায় জানুয়ারির শুরুতে রোপণ করা স্বল্পমেয়াদি জাতগুলো এপ্রিলের মাঝামাঝির মধ্যেই কাটা সম্ভব হয়েছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি জাত তখনো পরিপক্ব হয়নি।

গবেষকরা আরো জানান, হাওরে বোরোধান চাষে তাপমাত্রার তারতম্য, শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টি বড় চ্যালেঞ্জ। থোড় আসার সময় তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে বা ফুল আসার সময় ৩৫ ডিগ্রির বেশি হলে ধান চিটা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

অধ্যাপক প্রামানিক সতর্ক করেন, “স্বল্পমেয়াদি ধানে ফলন কিছুটা কম হওয়ায় অনেক কৃষকের মধ্যে অনীহা দেখা যায়। তবে দীর্ঘমেয়াদি ধানে ফলন বেশি হলেও আগাম বন্যায় পুরো ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি, এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।”

গবেষকদের মতে, এপ্রিলের প্রথমার্ধে ধান কাটতে হলে সর্বোচ্চ ১০ জানুয়ারির মধ্যে চারা রোপণ শেষ করতে হবে। পাশাপাশি হাওরাঞ্চলে দ্রুত রোপণ ও ফসল কাটার জন্য কৃষি যান্ত্রিকীকরণ অপরিহার্য।

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক প্রামানিক বলেন, “রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ও হার্ভেস্টারের মতো আধুনিক কৃষিযন্ত্র সহজলভ্য হলে স্বল্প সময়ে সমন্বিতভাবে রোপণ ও ফসল কাটা সম্ভব হবে। এতে বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা করা অনেক বেশি কার্যকর হবে।”