রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন বাজার ও ভ্রাম্যমাণ দোকানে মৌসুম শুরুর আগেই শুরু হয়েছে লিচু বিক্রি। এসব লিচুর বেশিরভাগই অপরিপক্ব। ক্রেতারা বলছেন, লিচুতে তেমন স্বাদ না থাকলেও বিক্রেতারা চড়া দামে বিক্রি করছেন।
বিক্রেতাদের ভাষ্য, তারা আগে থেকেই বাগান কিনে রেখেছেন। বাগানমালিকদের পুরো টাকা পরিশোধ করেননি। মালিকদের পাওনা পরিশোধের চিন্তা এবং ঝড় হলে লিচুর ক্ষতি হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে তারা লিচু বিক্রি করছেন।
কৃষি বিভাগ বলছে, পরিপক্ক লিচু বাজারে আসতে এখনো ১৫-২০ দিন সময় লাগবে। চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে লিচু বাগান রয়েছে ৫২৮ হেক্টর জমিতে। এ বছর লিচুর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮০০ টন।
লিচু চাষিরা জানান, শুরুতে গাছে লিচুর প্রচুর মুকুল এসেছিল। গুটি হলেও বৃষ্টির কোনো দেখা মেলেনি বরং প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ ও খরায় বেশির ভাগ গাছের লিচু ঝরে পড়েছে। অবশিষ্ট লিচুর কিছু ফেটে নষ্ট হয়ে গেছে। এ কারণে লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন বাগান মালিকরা।
রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, ভ্রাম্যমাণ দোকান বসিয়ে সবুজ ও হালকা লাল রঙের লিচু বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। বছরের নতুন ফল হিসেবে অনেক ক্রেতার নজরই লিচুর দিকে। ১০০ লিচু বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। পরিপক্ক লিচুর তুলনায় এগুলো আকারে ছোট। একটু বড় হলেই দাম বেশি চাওয়া হচ্ছে। অনেক ক্রেতাই শিশুদের আবদার মেটাতে এসব লিচু কিনছেন বলে জানান।
নগরীর ভদ্রা এলাকায় লিচু বিক্রি করছিলেন ইয়াসিন আলী। তিনি বলেন, “এখন যেসব লিচু বাজারে আছে সেগুলো পুরোপুরি মিষ্টি না। কিছুটা টক-মিষ্টি স্বাদের। মিষ্টি লিচু আরও এক থেকে দুই সপ্তাহ পরে আসবে।”
তিনি বলেন, “বাগান মালিকদের পাওনা পরিশোধ করতে লিচু পেড়ে বিক্রি করছেন অনেকে। আমি একটি লিচুগাছ কিনেছি সাড়ে ৫ হাজার টাকায়। গাছের সব লিচু খুচরা হিসেবে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারব। এতে খরচ বাদে ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা লাভ হবে।”
নগরীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে ভ্যানে লিচু বিক্রি করছিলেন জামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, “আমি দুই খাঁচা লিচু নিয়ে এসেছি। চাহিদা আছে মোটামুটি ভালোই। ১০০ লিচু ৪০০ টাকা করে বিক্রি করা যাচ্ছে। কমপক্ষে এক সপ্তাহ পর আরো ভালো লিচু বিক্রি করতে পারব। সেগুলোর রঙ টকটকে থাকবে এবং স্বাদও মিষ্টি হবে।”
মহানগরীর ছোট বনগ্রাম, রায়পাড়া, পবা, পুঠিয়া ও মোহনপুর উপজেলার কয়েকটি বাগান ঘুরে দেখা গেছে, বোম্বাই, মাদ্রাজি, কাদমি, মোজাফফরপুরী, বেদানা, কালীবাড়ি, মঙ্গলবাড়ী, চায়না-৩, বারি-১, বারি-২ ও বারি-৩ জাতের লিচু চাষ হয়েছে। তবে ঝরে পড়ায় ফলন খুব কম।
রাজশাহীর পবা উপজেলার লিচু চাষি শাহরিয়ার হোসেন বলেন, “আমার ৭০টি লিচু গাছে মুকুল এলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে ঝরে গেছে। রোদের প্রখরতায় লিচু ফেটে নষ্ট হয়ে গেছে। যেগুলো আছে সেগুলো এখনো পরিপক্ব হয়নি। আগাম জাতের কিছু লিচু পাকতে শুরু করায় বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।”
ভদ্রাতে লিচু কিনতে আসা রোখসানা পারভীন নামের এক নারী বলেন, “আত্মীয়ের বাড়িতে যাচ্ছি তাই লিচু কিনতে এসেছি। অন্যান্য কিছু ফল নিয়েছি আর সঙ্গে লিচুও নিয়ে নিলাম। দোকানদার একটি লিচু পাকা টসটসে দেখালো। আমাকে যেগুলো দিল মনে হয় না পাকা হবে। ১০০ লিচুর দাম নিলো ৩০০ টাকা।”
ওষুধ কোম্পানিতে কর্মরত ইলিয়াস হোসেন নামে আরেক ক্রেতা বলেন, “আমার দুই বাচ্চা লিচু খুব পছন্দ করে। তাই এখান থেকে লিচু নিলাম। যদিও লিচুগুলো টক লাগল কিন্তু বাচ্চাদের জন্য শখ করে নিলাম।”
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শঙ্কর কুমার বিশ্বাস বলেন, “অপরিপক্ব কোনো ফলই খাওয়া উচিত নয়। লিচুর ক্ষেত্রে তো আরও সতর্ক থাকতে হবে। অপরিপক্ব লিচু অনেক সময় মেডিসিন দিয়ে পাকানো হয়। এসব ফল খাওয়ার ফলে পেটে খিঁচুনি বা ব্যথা হতে পারে। এমনকি এতে ক্যানসারের ঝুঁকিও থাকে।”
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, “অনেক বাগানের লিচু এখনও পুরোপুরি পাকেনি। লিচু পরিপক্ব হতে আরো এক-দুই সপ্তাহের মতো সময় লাগবে। আমরা বাগানমালিক ও পাইকারদের প্রতিনিয়ত পরামর্শ দিয়ে থাকি, যেন কোনো ফল পরিপক্ব হলেই তারা বিক্রি করেন। মৌসুমের প্রথম লিচু হওয়ায় বিক্রেতারা কিছুটা বেশি দাম নিচ্ছেন। সরবরাহ বাড়লে দাম কমে যাবে।”