তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। শেখ হাসিনা সরকারের ১৬ বছরেও এর কোনো অগ্রগতি হয়নি। এর পেছনে বড় কারণ ছিল পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তি। তবে সেই মমতার দুর্গের পতন হলো অবশেষে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, রাজনৈতিক অচলাবস্থা তো ভেঙে গেল, এবার কি তিস্তা চুক্তি আলোর মুখ দেখবে? কেন্দ্র ও রাজ্যে একই রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে— এমন ধারণা সকলের দীর্ঘদিনের। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কি সত্যিই তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করবে?
বাস্তবতা ইঙ্গিত দিচ্ছে ভিন্ন দিকে। রাজনৈতিক বাধা দূর হলেও নতুন কৌশলগত ও প্রকৌশলগত বাস্তবতা সামনে আসছে। এবং এই পরিস্থিতিকে সেটা আরও জটিল করে তুলতে পারে। ভারতের দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত নদী সংযোগ উদ্যোগ এখন তিস্তা ইস্যুর কেন্দ্রে চলে এসেছে।
ন্যাশনাল রিভার ইন্টারলিংকিং প্রজেক্ট (এনএলআরপি) ভারতের একটি বৃহৎ পরিকল্পনা। এই প্রকল্পটির লক্ষ্য ভারতের ৩৭টি নদীকে ৩০টি সংযোগের মাধ্যমে যুক্ত করা। এই প্রকল্পের আওতায় গঙ্গা-তিস্তা সংযোগের সম্ভাব্যতা যাচাই ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে বলে খবর প্রকাশ হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এই ধারণার সূচনা ব্রিটিশ প্রকৌশলী আর্থার কটন-এর সময় থেকে, যা পরে স্বাধীন ভারতে পুনরায় গুরুত্ব পায় এবং ধীরে ধীরে বাস্তবায়নের দিকে এগোয়।
বাংলাদেশ শুরু থেকেই এই প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। কারণ, এটি বাস্তবায়িত হলে উজানের পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হবে ভারতের হাতে। ফলে তিস্তা চুক্তি হলেও প্রকৃত পানি প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিঙের ঢাকা সফরের সময় তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত হয়ে যায় পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে। এরপর থেকে কেন্দ্রীয় সরকার বারবার সেই অজুহাত তুলে ধরে চুক্তি বাস্তবায়নে পিছিয়েছে। এখন যদি সেই রাজনৈতিক বাধা না থাকে, তাহলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার একক সিদ্ধান্তে এগোতে পারবে— এমনটাই মনে করা হচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা এখানে দ্বিমুখী। একদিকে দিল্লি চায় বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে এবং আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখতে। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যারা তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে সহজ কোনো সমাধান সামনে আসবে এমন নিশ্চয়তাও নেই। বরং এ নিয়ে জলঘোলা হতে পারো আরও। কারণ, ক্ষমতায় এসে বিজেপি সরকারকেও স্থানীয় কৃষকদের কথা ভাবতে হবে। নতুবা পরের নির্বাচনে বিপাকে পড়তে পারে দলটি।
তিস্তা ইস্যু এখন কেবল পানি বণ্টনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ভূ-রাজনীতির অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে চীনের আগ্রহ ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর নিকটবর্তী এলাকায় কোনো বিদেশি প্রভাব ভারতের নিরাপত্তা বিবেচনায় সংবেদনশীল।
এই প্রেক্ষাপটে ভারত তিস্তা ব্যবস্থাপনায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে চাইবে। তবে প্রশ্ন হলো— এই অংশগ্রহণ কি প্রকৃত পানি বণ্টনের দিকে যাবে, নাকি শুধুই নদী খনন, অবকাঠামো উন্নয়ন বা ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? কারণ, পানি ছাড়া এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
আরও বড় উদ্বেগ তৈরি করছে মানস-সংকোষ-তিস্তা-গঙ্গা সংযোগ পরিকল্পনা। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার পানি অন্য অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। এতে তিস্তায় সাময়িকভাবে পানি বাড়লেও যমুনা ও পদ্মার প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের সামগ্রিক জলপ্রবাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হতে পারে।
এই বাস্তবতায় তিস্তা চুক্তি আর একক কোনো সমাধান নয়। এটি একটি বৃহত্তর পানিব্যবস্থাপনার অংশ মাত্র। যদি উজানের পানি সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে চুক্তির কার্যকারিতা অনেকাংশেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ এখন দ্বিমুখী। প্রথমত, ভারতের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিস্তা চুক্তির বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, বৃহৎ নদী সংযোগ প্রকল্পের সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা করা। এর জন্য প্রয়োজন কৌশলগত কূটনীতি, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক অবস্থান।
শেষ পর্যন্ত মূল প্রশ্ন থেকেই যায়—তিস্তা কি সহযোগিতার প্রতীক হবে, নাকি আঞ্চলিক ক্ষমতার খেলায় একটি হাতিয়ার হয়ে থাকবে? এর উত্তর নির্ভর করছে ভারত এই নদীগুলোকে কিভাবে দেখবে— নিজস্ব সম্পদ হিসেবে, নাকি একটি অভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে, যার ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।
লেখক: সংবাদকর্মী