নেত্রকোণার মদন উপজেলায় ১১ বছরের এক মাদ্রাসাছাত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর এখনো গ্রেপ্তার হননি। আত্মগোপনে থেকেই তিনি ফেসবুক লাইভে এসে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মঙ্গলবার (৫ মে) সকাল থেকেই তার ফেসবুক লাইভ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রায় পাঁচ মিনিটের ভিডিও বার্তায় আমান উল্লাহ সাগর অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে জানান, তিনি কথা বলতে কষ্ট পাচ্ছেন। তবু, নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে চান জানিয়ে দাবি করেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ ছড়িয়েছে, এর সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ভুক্তভোগী ছাত্রীর সঙ্গে নিজের ছবি ব্যবহার করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ভিডিওতে আমান উল্লাহ সাগর বলেন, “মেয়েটি আগে তার মাদ্রাসায় পড়লেও গত বছরের শুরুতেই চলে যায় এবং পরে ঢাকায় অবস্থান করছিল। কয়েক মাস আগে আবার মাদ্রাসায় ফিরে আসে।” নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে ভিত্তিহীন উল্লেখ করে তিনি সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান এবং প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষার আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে আমান উল্লাহ সাগরের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এদিকে, শিশুটির অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা চিকিৎসক সাইমা আক্তারকে বিভিন্নভাবে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। নিজের ফেসবুক আইডিতে তিনি লেখেন, “নিতান্তই বাধ্য হয়ে এই ভিডিওটি করা। লাইফ থ্রেট, কুপিয়ে হত্যা করার হুমকিসহ আমার ক্যারিয়ার ধ্বংসের চেষ্টা চলছে। একটি ১১ বছরের মেয়ের পাশে দাঁড়ানোই কি আমার অপরাধ?” তিনি তার পোস্টে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং নেত্রকোণা-৪ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবরের সহায়তা কামনা করেন।
চিকিৎসকের স্বামী মো. আসিফুল ইসলাম জানান, একটি বেসরকারি টেলিভিশনে বক্তব্য দেওয়ার পর থেকেই তার স্ত্রী সাইবার বুলিংসহ নানা ধরনের হুমকির মুখে পড়েছেন। এমনকি চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্র চাওয়া ও পেশাগত ক্ষতির হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে তারা আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালে উপজেলার পাঁচহার গ্রামে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন আমান উল্লাহ সাগর। একই প্রতিষ্ঠানে তার স্ত্রী প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত। ভুক্তভোগী শিশু এক বিধবা নারীর একমাত্র মেয়ে। জীবিকার তাগিদে শিশুটির মা সিলেটে গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। শিশুটি নানির কাছে থেকে ওই মাদ্রাসায় পড়ালেখা করত।
অভিযোগে বলা হয়, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে অভিযুক্ত শিক্ষক জোরপূর্বক শিশুটিকে ধর্ষণ করেন এবং বিষয়টি কাউকে জানালে প্রাণনাশের হুমকি দেন। পরে গত ১৮ এপ্রিল থেকে তিনি ছুটিতে গিয়ে আর মাদ্রাসায় ফেরেননি।
ওই মাদ্রাসার শিক্ষক মো. ছোটন বলেন, “প্রায় পাঁচ মাস আগে ওই ছাত্রী মাদ্রাসা ছেড়ে চলে যায়, তখনও এ বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন না। তবে, ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর থেকে অভিযুক্ত তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ করেননি। বর্তমানে সাগর স্ত্রী-সন্তানসহ পলাতক।”
শিশুটির মায়ের অভিযোগ, গত বছরের ২ নভেম্বর মাদ্রাসা ছুটির পর শিক্ষক তার মেয়েকে ডেকে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণ করেন। পরে মেয়ের শারীরিক পরিবর্তন দেখে বিষয়টি জানতে পারেন এবং চিকিৎসা পরীক্ষায় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এরপর থানায় মামলা করা হয়।
মদন থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম জানান, গত সোমবার রাত পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে এবং তা এখনো চলছে। আশা করছি, খুব দ্রুতই অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।”