মতামত

বাংলাদেশ ফ্যাক্টর কি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের মোড় ঘুরিয়ে দিল?

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলে বিজয়ী ভূমিধস জয় পেয়েছে। তবে এই জয় বোঝার জন্য শুধু রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দেখলে চলবে না। নজর দিতে হবে বাংলাদেশেও। দীর্ঘদিন ধরে বামপন্থী রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত পশ্চিমবঙ্গে কীভাবে বিজেপি একটি শক্তিশালী বিকল্প হয়ে উঠল, তার পেছনে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ কি ভূমিকা রেখেছে? রেখে থাকলে কতটা? শেখ হাসিনার সরকার পতন কি তবে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য বুমেরাং হলো? 

২০১১ সালে বামফ্রন্টের পতনের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে। কিন্তু রাজ্যের রাজনৈতিক চরিত্র খুব বেশি বদলায়নি। রাজ্যের রীতিনীতি মূলত বামঘেঁষা থেকে যায় বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ। কৃষি, সামাজিক সুরক্ষা এবং বৃহৎ শিল্পবিরোধী মনোভাব- সব মিলিয়ে তৃণমূলকে অনেকেই ‘বামের থেকেও বাম’ বলে অভিহিত করতেন। এই প্রেক্ষাপটে হঠাৎ করে বিজেপির উত্থান অনেকের কাছেই বিস্ময়কর!

এই পরিবর্তনে উঠে আসে বাংলাদেশের নাম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের খবর বেশ ফলাও করে প্রচার হয়। ভারতীয় গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর আক্রমণের খবর। পশ্চিমবঙ্গে দ্রুত রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয় বিষয়টি। ঘটনা সত্য বা মিথ্যা যাই হোক, সেগুলোকে বৃহত্তর নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। এর ফলে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়ে। ধারণা করা যায় তারা এবার বিজেপিকে ভোট দিতে দুবার ভাবেনি। 

২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে দীপু চন্দ্র দাস নামে এক হিন্দু শ্রমিকের হত্যাকাণ্ড এবং তা ঘিরে কলকাতায় প্রতিবাদ এই আবেগকে আরও তীব্র করে। শুভেন্দু অধিকারীসহ বিজেপি নেতৃত্ব এই ঘটনাকে সামনে এনে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানায়। তাদের অভিযোগ ছিল, রাজ্য সরকার হিন্দুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে উদাসীন। এই বয়ান দ্রুত জনমনে সাড়া ফেলে। ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানের খেলাও বন্ধ করে দেয়। এবং পশ্চিমবঙ্গে এর সমর্থনও পাওয়া যায়।

এর পাশাপাশি অবৈধ অনুপ্রবেশের প্রশ্নটিও বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে। বিজেপি দাবি করে, বাংলাদেশের মুসলিম অনুপ্রবেশকারীরা পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে ভোটার তালিকায় প্রভাব ফেলছে এবং এর ফলে তৃণমূল রাজনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে। এই যুক্তি বাস্তবতা নিয়ে বিতর্কিত হলেও নির্বাচনী প্রচারে তা যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছে। দীর্ঘদিন ধরে যে রাজনীতি অর্থনীতি ও কল্যাণকেন্দ্রিক ছিল, তা ক্রমশ পরিচয় ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে।

এই নির্বাচনে মতুয়া সম্প্রদায়ের ভূমিকাও বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল। হরিচাঁদ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত এই সম্প্রদায়ের শিকড় বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের একাধিক কেন্দ্রে তাদের প্রভাব রয়েছে। যদিও ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় বহু মতুয়ার নাম বাদ পড়েছিল, তবুও তারা বড় অংশে বিজেপির পাশেই থেকেছে। এবং বিজেপিকে জয়ী করতে বড় ভূমিকা রেখেছে। 

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অতীত নির্যাতনের স্মৃতি বিজেপি দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে। ফলে মতুয়ারা নিজেদের শুধু একটি তফসিলি জাতি হিসেবে নয়, বরং ‘নির্যাতিত হিন্দু উদ্বাস্তু’ হিসেবে দেখতে শুরু করে। এই পরিচয় তাদের রাজনৈতিক পছন্দকে প্রভাবিত করেছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল তারাও বিজেপির প্রচারে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। তাদের আশা, বিজেপি ক্ষমতায় এলে নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকারের প্রশ্নে সমাধান দেবে। এই বিশ্বাস বিজেপির পক্ষে একটি শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তি তৈরি করে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত হিন্দু-মুসলিম বিভাজন- এই নির্বাচনে বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। হঠাৎ করেই তা যেন কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়। এবং এই পরিবর্তনের পেছনে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সীমান্তের অপরাংশের ঘটনাকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করে বিজেপি একটি নতুন বয়ান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। যা ভোটের মাঠে তাদের ভালো ফল দিয়েছে। 

পশ্চিমবঙ্গের মতো বহুত্ববাদী সমাজে এই পরিবর্তন শুধু একটি নির্বাচনী ফল নয়; এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক রূপান্তরের ইঙ্গিত। বাংলাদেশের ঘটনাবলি সেই রূপান্তরের একটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে, যা ভবিষ্যতের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। এবং সেটা ঠেকাতে প্রয়োজনে ভবিষ্যতে তৃণমূল-কংগ্রেস-সিপিএম একজোটও হতে পারে। সম্ভবত সেটা হতে খুব বেশি দেরি নাই। 

লেখক: গবেষক, সেন্টার ফর ইউরো এশিয়ান স্টাডিজ, জার্মানি