পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন চার জন রাজনৈতিক কর্মী। এদের মধ্যে দুজন বিজেপি কর্মী ও দুজন তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী। ইতিমধ্যেই এসব হত্যার ঘটনায় একাধিক সন্দেহভাজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় প্রথম হত্যার অভিযোগ ওঠে সোমবার। ওই দিন কলকাতার পার্শ্ববর্তী জেলা হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে এক বিজেপি কর্মীকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে খুনের অভিযোগ উঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় মানুষজন এবং বিজেপি সূত্রে জানানো হয় মৃতের নাম যাদব বর। বয়স ৪৮ বছর। বিজেপির জয়ের আনন্দে সোমবার রাতে আবির খেলায় মেতেছিলেন তিনি। তার পরেই তাকে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতকারীরা আটক করে এবং কুপিয়ে ও পিটিয়ে খুন করে।
উদয়নারায়ণপুর বিধানসভার দেবীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ১৪৮ নম্বর বুথ এলাকার বাসিন্দা ছিলেন যাদব। পরিবার জানিয়েছে, ওই ব্যক্তি বিজেপির সমর্থক। রাজ্যজুড়ে বিজেপির জয়ের আনন্দ দলের সতীর্থদের সঙ্গে উদ্যাপন করছিলেন যাদব। সোমবার রাত ১১টা নাগাদ তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। সেই সময় তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যান কয়েক জন। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপ মারা হয় যাদবকে। খবর পেয়ে পুলিশ ও স্থানীয়রা দেহ উদ্ধার করে।
মঙ্গলবার ২৪ পরগনা জেলার নিউটাউনে বিজেপির বিজয় মিছিলে হামলা চালিয়ে এক বিজেপি কর্মীকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। নিউ টাউন থানা এলাকার বালিগুটিতে মঙ্গলবার বিকেলে এই খুনের ঘটনা ঘটে। এরপর উত্তেজিত স্থানীয়রা তৃণমূল কর্মীদের বাড়ি ভাঙচুর করে।
দুই বিজেপি কর্মী ছাড়াও ভোটপরবর্তী সহিংসতায় নিহত হয়েছেন দুই তৃণমূল কংগ্রেসকর্মী। কলকাতার বেলেঘাটায় ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস কর্মী বিশ্বজিৎ পট্টনায়েক। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন একটি ফোন আসার পরে বাড়ির থেকে বেরিয়ে যান তিনি। মঙ্গলবার বাড়ির সামনেই তার রক্তাক্ত নিথর দেহ পড়েছিল। হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। বেলেঘাটা পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেছে মৃতের পরিবার।
পেশায় তিনি কেবল সক্রিয় তৃণমূল কর্মীই ছিলেন না, সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে দলীয় বুথ এজেন্টের গুরুদায়িত্বও সামলেছিলেন। পরিবারের স্পষ্ট অভিযোগ, রাজনীতিই কেড়ে নিয়েছে তাদের ঘরের ছেলের প্রাণ। কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে পদ্ম শিবিরকে।
এছাড়া বীরভূম জেলার নানুর সন্তোষপুরে এক তৃণমূল কংগ্রেসকর্মীকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে বিজেপির কর্মীদের বিরুদ্ধে। আবির শেখ (৪৫) নামের তৃণমূল কর্মীর পরিবারের অভিযোগ, বিজেপির কর্মী, সমর্থকেরা তাকে রাস্তায় একা পেয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে।
আবিরের পিসি মহসিনা বেগম জানান, মঙ্গলবার তার বাড়ি এসেছিলেন আবির। বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়ি যাওয়ার পথেই বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতকারীদের রোষের মুখে পড়েন তিনি। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পরে নানুর থানার বিশাল পুলিশবাহিনী ঘটনাস্থলে গেলে মৃতদেহ উদ্ধারেও বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এই সময়ে আবিরের সঙ্গে ছিল চাঁদু শেখ নামে আরো এক ব্যক্তি। তিনিও গুরুতর আহত হয়েছেন। তাকে বোলপুর মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন দুই পুলিশ কর্মী ও তিনজন বিএসএফ জওয়ান। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সন্দেশখালি এলাকায় মাছের ভেড়ি দখল কে কেন্দ্র করে বিজেপি তৃণমূল সংঘর্ষ চরমে উঠল তা থামাতে পুলিশ বাহিনী নিয়ে যান সন্দেশখালি থানার ওসি ভরত প্রসূন কর। এ সময় তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। গুলিবিদ্ধ হন ওসি ভরত ও একজন মহিলা কনস্টেবল। তাদের উদ্ধার করতে এলে গুলিবিদ্ধ হন আরও তিনজন বিএসএফ জওয়ান। ওসি ও ওই মহিলা কনস্টেবলকে প্রথমে চিত্তরঞ্জন হাসপাতালে ও পরে বাইপাসের ধারে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গুলিবিদ্ধ তিন বিএসএফ জাওয়ানকে বিএসএফের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তারা প্রত্যেকেই পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, অন্তত ৩০০-৪০০ দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়েছে , অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে অথবা দখল করা হয়েছে। ১৫০জন প্রার্থীর বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশন হিংসা প্রতিরোধে কোনরকম ব্যবস্থা নেয়নি। বিজেপি ‘ভয় আউট ভরসা ইন’ স্লোগান দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এসেছিল কিন্তু ২৪ ঘন্টার মধ্যে বিজেপি তাদের ভরসার মডেল দেখিয়ে দিল।
তবে বিজেপি এসবের দায় স্বীকার করেনি। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য বলেছেন, “সহিংসতা, ভাঙচুরে তাদের কোনো কর্মী জড়িত নন। বিজেপির পতাকা নিয়ে যদি তৃণমূল কংগ্রেস আক্রমণ করে তার দায় বিজেপি নেবে না। এ কারণেই নেবে না কারণ এখনো পর্যন্ত আমরা সরকার গঠন করিনি ‘দুষ্কৃতকারীরা’ বিজেপির নাম ব্যবহার করে ‘অশান্তি পাকানোর চেষ্টা করছে।’ আমাদেরও দুজন কর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। নতুন সরকার দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত বিদায়ী রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব নিতে হবে।”
সহিংসতা রুখতে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। কোথাও ভাঙচুর বা সহিংসতার ঘটনা দেখলেই অভিযুক্তদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে বলেয়েছেন তিনি। রাজ্যের মুখ্যসচিব, রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালক, কলকাতার পুলিশ কমিশনার এবং কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর মহাপরিচালককে সতর্ক থাকারও নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। প্রস্তুত থাকতে বলেছেন জেলা কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের।
তবে এসবই মধ্যেই নিউটাউনের বালিগড়িতে বিজেপি কর্মী মধু মণ্ডল খুনের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তৃণমূল নেতা কমল মন্ডল ও তার তিন শাকরেদকে বুধবার ভোরে উত্তর ২৪ পরগনার গোপালনগর সীমান্ত এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে পালানোর সময় গ্রেপ্তার করেছে টেকনোসিটি থানার পুলিশ।