একবার ত্বকের বলিরেখা পড়তে শুরু করলে এর প্রভাব শুধু ত্বকেই পড়ে না, মনেও পড়ে। কিন্তু সহজ সত্য কথা হলো, বলিরেখা বা রিঙ্কেল বয়স বাড়ার একটি খুব সাধারণ লক্ষণ। যা ত্বকে ছোট ছোট রেখা বা গভীর ভাঁজ হিসেবে দেখা দেয়। যদিও এটি বয়স বৃদ্ধির স্বাভাবিক অংশ, তবুও নানা বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ এর গতি বাড়িয়ে দিতে পারে। ভালো খবর হলো, এসব কারণের অনেকটাই প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বলিরেখার কারণগুলো জানা এবং তা এড়িয়ে চলার উপায় শেখা আপনাকে দীর্ঘদিন মসৃণ ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ত্বক ধরে রাখতে সাহায্য করবে।
বলিরেখা হওয়ার কারণ কী? বলিরেখা হঠাৎ করে দেখা দেয় না; এটি ধীরে ধীরে তৈরি হয় বয়স ও জীবনযাপনের প্রভাবে। নিচে প্রধান কারণগুলো তুলে ধরা হলো—
১. স্বাভাবিক বার্ধক্য বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বক স্বাভাবিকভাবেই তার স্থিতিস্থাপকতা ও আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতা হারায়। কারণ শরীরে কোলাজেন ও ইলাস্টিন নামের প্রোটিনের উৎপাদন কমে যায়, যা ত্বককে টানটান ও নমনীয় রাখে। এছাড়া ত্বকের নিচের চর্বিও কমে যায়, ফলে ত্বক ঝুলে পড়ে এবং রেখা তৈরি হয়।
২. অতিরিক্ত রোদে থাকা সূর্যের অতিবেগুনি (UV) রশ্মি বলিরেখার অন্যতম বড় কারণ। দীর্ঘ সময় রোদে থাকলে ত্বকের প্রয়োজনীয় উপাদান নষ্ট হয়, ফলে দ্রুত বয়সের ছাপ পড়ে, সানস্পট, রুক্ষ ত্বক ও গভীর বলিরেখা দেখা দেয়।
৩. ধূমপান সিগারেটের রাসায়নিক উপাদান রক্তপ্রবাহ ও কোলাজেন উৎপাদন কমিয়ে দেয়, ফলে দ্রুত বলিরেখা পড়ে। এটি ত্বক থেকে অক্সিজেন ও পুষ্টিও কমিয়ে দেয়, যার কারণে বিশেষ করে ঠোঁট ও চোখের চারপাশের ত্বক বয়স্ক দেখায়।
৪. একই ধরনের মুখভঙ্গি বারবার করা হাসা, ভ্রু কুঁচকানো বা চোখ ছোট করে তাকানোর মতো অভ্যাসের কারণে ত্বকের নিচে ভাঁজ তৈরি হয়। বয়সের সঙ্গে ত্বকের নমনীয়তা কমে গেলে এই ভাঁজগুলো স্থায়ী রেখায় পরিণত হয়।
৫. পানিশূন্যতা ও শুষ্ক ত্বক ত্বক পর্যাপ্ত আর্দ্রতা না পেলে তা কম নমনীয় হয়ে পড়ে এবং সহজেই সূক্ষ্ম রেখা দেখা দেয়। শুষ্কতা বলিরেখাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
৬. পরিবেশ দূষণ বাতাসের ধুলাবালি, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য দূষক উপাদান ফ্রি-র্যাডিক্যাল তৈরি করে, যা কোলাজেন ও ইলাস্টিনের ক্ষতি করে ত্বকের দ্রুত বার্ধক্য ঘটায়।
৭. জিনগত কারণ ত্বক কত দ্রুত বুড়িয়ে যাবে, তা অনেকাংশে জিনের ওপর নির্ভর করে। যদি পরিবারের অন্য সদস্যদের অল্প বয়সে বলিরেখা পড়ে, তাহলে আপনার ক্ষেত্রেও এমন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
৮. ঘুমানোর ভঙ্গি একই পাশে বা উপুড় হয়ে ঘুমালে মুখের নির্দিষ্ট অংশে দীর্ঘ সময় চাপ পড়ে, ফলে ‘স্লিপ লাইন’ বা ঘুমজনিত বলিরেখা তৈরি হতে পারে।
৯. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের অভাব অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট কোলাজেনের ক্ষতি করে। আবার ব্যায়ামের অভাবে রক্তসঞ্চালন কমে যায়, ফলে ত্বক পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি পায় না।
১০. দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ অতিরিক্ত স্ট্রেস শরীরে কর্টিসল হরমোন বাড়ায়, যা ত্বকের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং মেরামতের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। পাশাপাশি খারাপ ঘুম ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাসও ত্বকের ক্ষতি বাড়ায়।
যেভাবে বলিরেখা প্রতিরোধ করা যায় বয়স থামানো সম্ভব নয়, তবে সঠিক যত্ন ও জীবনযাপনের মাধ্যমে এর দৃশ্যমান প্রভাব অনেকটাই কমানো যায়।
১. রোদ থেকে ত্বককে সুরক্ষিত রাখুন প্রতিদিন এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। বাইরে গেলে টুপি, সানগ্লাস ও সুরক্ষামূলক পোশাক পরুন।
২. ধূমপান ছাড়ুন ধূমপান ত্যাগ করলে ত্বকের স্বাস্থ্যের দ্রুত উন্নতি হয় এবং ধীরে ধীরে ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা ফিরে আসে।
৩. ত্বকবান্ধব খাবার খান ভিটামিন A, C, E, ওমেগা-৩ ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খান। ফলমূল, শাকসবজি, বাদাম, মাছ ও চর্বিহীন মাংস খাদ্যতালিকায় রাখুন। অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট কম খান।
৪. পর্যাপ্ত পানি পান করুন প্রতিদিন অন্তত আট গ্লাস পানি পান করুন, যাতে ত্বক আর্দ্র ও নমনীয় থাকে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ হারবাল চাও উপকারী হতে পারে।
৫. নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন ত্বকের ধরন অনুযায়ী ভালো মানের ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। হায়ালুরোনিক অ্যাসিড, রেটিনয়েড ও পেপটাইডযুক্ত পণ্য বলিরেখা কমাতে সহায়ক।
৬. পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন প্রতিদিন ৭–৮ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন। চিৎ হয়ে ঘুমানো বা সিল্কের বালিশের কভার ব্যবহার করলে ত্বকের ঘর্ষণ কম হয়। যা বলিরেখা কমাতে সহায়তা দিতে পারে।
৭. মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন ধ্যান, যোগব্যায়াম বা মাইন্ডফুলনেস চর্চা করুন। নিয়মিত ব্যায়ামও মানসিক চাপ কমাতে ও রক্তসঞ্চালন বাড়াতে সাহায্য করে।
৮. অ্যালকোহল ও ক্যাফেইন কমান অতিরিক্ত অ্যালকোহল ত্বককে শুষ্ক করে এবং উজ্জ্বলতা কমিয়ে দেয়। অতিরিক্ত ক্যাফেইনও কোলাজেন উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।
৯. নিয়মিত স্কিনকেয়ার রুটিন অনুসরণ করুন দিনে দুইবার মুখ পরিষ্কার করুন। মুখের ত্বক অতিরিক্ত ঘষাঘষি করবেন না, এতে ত্বকের ক্ষতি হতে পারে।
বলিরেখা কমানোর জন্য চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন।
সূত্র: স্কিনএভা ক্লিনিক