১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথ জার্মানিকে নিজের আঁকা ৫টি চিত্রকর্ম উপহার দিয়েছিলেন। সেগুলো বার্লিনের ক্রাউন প্রিন্স প্যালেসে সংরক্ষিত ছিল, কিন্তু ১৯৩৭ সালের ১৫ অক্টোবর আরো অনেক চিত্রকর্মের সাথে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্মগুলো হিটলারের নির্দেশে নাৎসি বাহিনী সরিয়ে ফেলে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, আধুনিক শিল্পকলা হলো ‘Entartete Kunst’ অর্থাৎ ‘বিপথগামী শিল্প’।
রবীন্দ্রনাথের অভিব্যক্তিবাদী শৈলী নাৎসি আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় সেগুলো শুদ্ধি অভিযানের শিকার হয়। বাজেয়াপ্ত করা ছবিগুলোর একটি পরবর্তীকালে মিউনিখের একটি জাদুঘরে আবিষ্কৃত হয়। উল্লেখ্য বাতিলকৃত শিল্পকর্মের মধ্যে ভ্যান গঘ ও মান রে’র চিত্রকর্মও ছিল। সাদাচোখে বিষয়টিকে নাৎসি জার্মানির শিল্পবিরোধী নীতি ও ফ্যাসিবাদী আক্রোশ হিসেবে দেখা হলেও এর পিছনে খোদ হিটলারের ব্যক্তিগত হিংসা ও হীনম্মন্যতা কাজ করেছে। অনেকেরই জানা নেই যে, একদা অ্যাডলফ হিটলার ছবি আঁকতেন এবং পেশাদার শিল্পী হতে চেয়েছিলেন। ১৯০৫-১৯২০ সালের মধ্যে তিনি ২-৩ হাজারের বেশি জলরং ও তৈলচিত্র এঁকেছিলেন। সেসব ছবিতে ভিয়েনা ও মিউনিখের স্থাপত্য, নিসর্গ বা দালানকোঠার রূপ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা ছিল। কিন্তু তরুণ বয়সে তিনি দুবার ভিয়েনা একাডেমি অব ফাইন আর্টস-এ ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হন। শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা না পেয়ে তিনি পর্যটকদের কাছে পোস্টকার্ড ও ছবি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তার কাজগুলো মূলত ‘স্থাপত্যমূলক’।
সমালোচকরা সেগুলোতে মানুষের জীবনের সজীবতা ও গভীর দার্শনিক চিন্তার অভাব খুঁজে পেয়েছিলেন। অঙ্কনশিল্পের জন্য অনুপযুক্ত হিটলারকে তখন সহানুভূতিশীল এক পরীক্ষক একাডেমি অফ আর্কিটেকচারে আবেদন করার পরামর্শ দেন। কিন্তু সেখানে ভর্তির যোগ্যতা হিসেবে প্রয়োজন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণের সনদ, যা তার ছিল না। তাই তিনি সেখানে আবেদনের সুযোগই পাননি। আমাদের শিল্পী এসএম সুলতানের মতো ভাগ্য তাকে সমর্থন করেনি। শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর মতো কোনো সহৃদয় ব্যক্তির দেখা তিনি পান নি, যিনি মাধ্যমিকের চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণের সনদ না থাকা সত্ত্বেও সুলতানকে কোলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। তেমন হলে পৃথিবী হয়তো ভিন্ন কোনো হিটলারকে দেখতে পেত। তবে বর্তমানে তার আঁকা বেশ কিছু ছবি নিলামে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়েছে যদিও তা তার শিল্পমূল্যের স্বীকৃতি নয়। প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রের সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর শিল্পকর্মও যখন খুব উচ্চমূল্যে বিকোতে দেখা যায় তখন তার পেছনে শিল্পের প্রতি ক্রেতার ভালোবাসা নয়, ভিন্ন কোনো স্বার্থের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
হিটলারের কর্মকাণ্ডকে একজন ব্যর্থ শিল্পীর হিংসা ও ক্ষমতার বিকৃত প্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, কারণ শিল্প সম্পর্কিত তার মন্ত্যব্যের যৎকিঞ্চিত যা জানা যায় তা হতাশাজনক। ‘‘There existed in Germany a so-called ‘modern art,’ that is, to be sure, almost every year another one... The whole swindle of a decadent or pathological trend-art has been swept away’’ (জার্মানিতে তথাকথিত ‘আধুনিক শিল্প’ বলে কিছু একটার অস্তিত্ব ছিল এবং সত্যি বলতে কি, প্রায় প্রতি বছরই নতুন নতুন কিছু আসত... তবে অবক্ষয়ী বা রোগাক্রান্ত ধারার শিল্পের পুরো ভণ্ডামিটাই দূর হয়ে গেছে)। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘‘Works of art which cannot be understood in themselves but need some pretentious instruction book... will never again find their way to the German people.’’ (যেসব শিল্পকর্ম স্বাভাবিকভাবে বোঝা যায় না, বরং বোঝার জন্য ভণিতাপূর্ণ নির্দেশিকা গ্রন্থের প্রয়োজন হয়... সেগুলো আর কখনো জার্মানির জনগণের কাছে পৌঁছাবে না)। আধুনিক শিল্প সম্পর্কে তার ক্ষোভের কারণ সহজেই অনুমেয়। তিনি বাস্তবধর্মী শিল্পছাড়া বিমূর্ত শিল্প সৃষ্টিতে অক্ষম ছিলেন। নিজের অক্ষমতাকে কপট তত্ত্বের জালে আটকে ক্ষমতার প্রতাপ দিয়ে জব্দ করেছেন। ফলে রবীন্দ্রনাথসহ অন্যান্য আধুনিক শিল্পীদের চিত্রকর্মকে তিনি গ্যালারি থেকে সরিয়ে দিয়ে সান্ত্বনা পেতে চেয়েছেন, পেয়েছেন কিনা একমাত্র উনিই বলতে পারবেন।
প্রতিকৃতি, মুখোশ শিরোনামে ২টি, মেয়ে এবং দুটি পাখি —মোট ৫টি ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। শিল্পীদের নামের বর্ণানুক্রমে তৈরি তালিকার পাশে সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করে বিনিময়, বিক্রয় ও ধ্বংস করা হয়েছে মর্মে প্রমাণক সংরক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু অনির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায় যে, এই ছবিগুলোর মধ্যে ৩টি ছবি রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় ১৯৩৯ সালে ফেরৎ পাঠানো হয়, আর ১টি মিউনিখের এক মিউজিয়ামে খুঁজে পাওয়া যায়। অধঃপতিত শিল্পের তকমা পাওয়া সেই ছবি হয়তো কোনো শিল্পপ্রেমীর বিশেষ তৎপরতায় রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু বাকিগুলোর খোঁজ নেই— এমনকি যেগুলো ফেরৎ পাঠানো হয়েছে বলা হচ্ছে সেগুলোরও না।
সরিয়ে ফেলা রবীন্দ্রনাথের আঁকা একটি চিত্রকর্ম
১৮৭৮ সালের তরুণ বয়সের গুরুত্বহীন সংক্ষিপ্ত সফরের পর পরিণত বয়সে রবীন্দ্রনাথ ইতালি ভ্রমণ করেন দু’বার। ১৯২৫ সালে রোম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত পণ্ডিত ও ভারতবিদ অধ্যাপক কার্লো ফরমিচির আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ ইতালি সফর করেন, যিনি কবির কাছে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের স্বরূপকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। এরপর ১৯২৬ সালে সরাসরি মুসোলিনির আমন্ত্রণে তিনি ইতালি ভ্রমণ করেন। এক্ষেত্রেও ফরমিচি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতে মুসোলিনি জানান যে, ইতালীয় ভাষায় অনূদিত রবীন্দ্রনাথের সব রচনাই তিনি পড়েছেন। এমন ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে কবি তার কিছু প্রশংসা করেছিলেন, কিন্তু মুসোলিনির চালাকি বুঝতে পারেননি। সাহিত্যে নোবেলজয়ী এশিয়ার প্রথম কবির স্তুতি আদায় করে নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করাই ছিল তার উদ্দেশ্য।
কথিত আছে তখন নিজের ক্যামেরায় মুসোলিনি রবীন্দ্রনাথের ১টি ছবিও তোলেন। ইতালীয় ভাষা না জানার কারণে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক ইতালীয় সংস্কৃতির প্রশংসা করে প্রদত্ত বক্তৃতাগুলিকে বিকৃত করে মুসোলিনির প্রশংসা হিসেবে দেখানো হচ্ছিল। ইতালি ত্যাগ করার পর রোমাঁ রোলাঁ ও অন্যান্য বুদ্ধিজীবীরা রবীন্দ্রনাথকে মুসোলিনির শাসনের ভয়াবহ দমন-পীড়ন ও সহিংসতা সম্পর্কে অবহিত করেন। এরপরই ১৯২৬ সালের ৫ই আগস্ট সি এফ অ্যান্ড্রুজকে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটি চিঠি ‘ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি ফ্যাসিবাদের নিন্দা করে বলেন যে, এমন কোনো সরকারকে সমর্থন করতে পারেন না যারা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। এরপরেই ইতালীয় সংবাদমাধ্যম শাসকগোষ্ঠীর বরাতে কবিকে বিশ্রিভাবে অপমান করতে শুরু করে। বেনিতো মুসোলিনি নিজে ও ইতালীয় ফ্যাসিবাদী সংবাদমাধ্যম তাঁর সমালোচনা করে।
২৮ আগস্ট, ১৯২৬ Assalto নামের পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথকে একজন ‘পুরোনো অভিনেতা’ বলে অভিহিত করেছিলেন, যিনি ‘সেইসব পতিতার মতো আচরণ করছেন যারা সবসময় তাদের সর্বশেষ খদ্দেরের প্রেমে পড়ার শপথ করে’। তাঁর চরিত্রের উপর আক্রমণ করার পাশাপাশি তাঁকে ‘মিথ্যাবাদী, অসৎ ও নির্লজ্জ’ বলে আখ্যা দেয়। ফ্যাসিবাদী গণমাধ্যম তাঁকে ‘নপুংশক ও মেরুদণ্ডহীন’ বলার পাশাপাশি সরকারের পোষা একজন ‘গুরু’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে। ক্ষুব্ধ মুসোলিনি রবীন্দ্রনাথকে ‘খারাপ বাঙালি’ বলে আক্রমণ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে স্বার্থের মনস্তত্ত্ব এমনই, সেখানে কোনো যুক্তির প্রয়োগ চলে না।
১৯১২ সালে লন্ডনে সাক্ষাতের পর ডব্লিউ বি ইয়েটস ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যে যে উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তা তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিতেও ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই সম্পর্কে ফাটল ধরে যার মূল কারণগুলো ছিল রবীন্দ্রনাথের অনুবাদের মান নিয়ে ইয়েটসের অসন্তুষ্টি, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক দর্শনের মতপার্থক্য। ইয়েটস প্রথমে রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’র অনুবাদের মুগ্ধ প্রশংসক হলেও পরে তাঁর ইংরেজি অনুবাদের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ইয়েটস মনে করতেন, রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী কাজগুলো অতিরিক্ত ঈশ্বরমুখী যা তাঁর Mysticism বা মরমীবাদ থেকে আলাদা। আর এই বিষয়টি তিনি অপছন্দ করতেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের কাজে মানবিক অনুভূতির গভীরতার চেয়ে আধ্যাত্মিক ভাবালুতা বেশি দেখেছিলেন যা তাকে হতাশ করেছিল। তবে সমালোচনার তর্কে এই বিষয়টি কতখানি হালে পানি পাবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আইরিশ জাতীয়তাবাদী হিসেবে ইয়েটস তাঁর কবিতায় পৌরাণিক ও বীরত্বব্যঞ্জক সেলটিক পুরাণ ব্যবহার করতেন। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আন্তর্জাতিকতাবাদী, তিনি উগ্র জাতীয়তাবাদের বড় সমালোচক। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি ইয়েটসের রোমান্টিক জাতীয়তাবাদী আদর্শের সাথে পুরোপুরি মেলেনি।
মুসোলিনির তোলা রবীন্দ্রনাথের ছবি
তবে দূরত্বের সব কারণই আদর্শিক তা নয়। মানুষ উদারতা দিয়ে সবসময় স্বার্থদ্বন্দ্ব ও হিংসা জয় করে এমন প্রমাণ খুবই কম। ইয়েটসের তৎপরতায় দ্রুতই রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি এবং নিজের অর্জনের জন্য আরো এক দশকের অপেক্ষা ভেতরে ভেতরে তাঁকে ক্ষুব্ধ ও অসূয়াপ্রবণ করে তোলেনি— সেকথা জোর দিয়ে বলা যায় না। ১৯৩৫ সালে বন্ধু রোদেনস্টেইনকে লিখলেন, ‘Damn Tagore… We got out three good books… then he brought out sentimental rubbish and wrecked his reputation’ (ধুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর!… আমরা ওর তিনটি ভালো বই প্রকাশ করলাম… তারপর উনি কি সব আবেগপূর্ণ আবর্জনা বের করে নিজের সুনাম নষ্ট করলেন)।
১৯২৪ সালে চীন সফরের সময়ও রবীন্দ্রনাথ বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁর আধ্যাত্মিক মানবতাবাদের প্রতি চৈনিক বুদ্ধিজীবীদের বিরোধিতা যথেষ্ট হইচই ফেলেছিল। এই মানবতাবাদকে চীনের আধুনিকীকরণ, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ও জাতীয় মুক্তির জরুরি প্রয়োজনগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক ও পশ্চাৎপদ বলে মনে করা হতো। কবি হিসেবে তাঁর অবদানকে অস্বীকার না করলেও চেন দুশিউ-এর মতো সমালোচকরা মনে করতেন যে, তাঁর আদর্শিক বারতা চীনের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ও বিপ্লবী সংগ্রামের সাথে যায় না। মূলত, কট্টর বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ও মে ফোর্থ আন্দোলনের সমর্থকরা রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক বাণীকে ‘রক্ষণশীল’ ও ‘সামন্ততান্ত্রিক’ শক্তি হিসেবে দেখেছেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়টাতে চীনা সংস্কারকরা তাদের দেশের উন্নয়ন-সমস্যার সমাধান হিসেবে পাশ্চাত্য বস্তুবাদী শক্তিকে দেখেছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথের সাংস্কৃতিক আত্মসমীক্ষার আহ্বানকে তাদের কাছে সেকেলে বলে মনে হয়েছে। তাঁর সমালোচকদের মতে, পাশ্চাত্য ‘বস্তুবাদ’ গ্রহণের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের উপদেশটি ছিল আধুনিকীকরণের প্রতি অত্যন্ত নিরুৎসাহব্যাঞ্জক। বামপন্থীদের বিপ্লবকে সমর্থন না করার জন্য তারা রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করেছিলেন এবং তাকে আধুনিকতার জন্য অপ্রাসঙ্গিক এক ভাবালু ঋষি হিসেবে বিরুদ্ধাচারণ করেছেন। কিছু চীনা শিক্ষার্থী সরাসরি তাঁর বক্তৃতার প্রতিবাদে প্রচারপত্র বিলি করেছিল। আবার রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলো নিজেদের সমর্থনে তাঁর সফরকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল।
একইভাবে জাপানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক ভক্তি ও প্রশংসা থেকে তীব্র সমালোচনা ও তিক্ততায় বদলে গিয়েছিল। জাপানি বুদ্ধিজীবী ও জনসাধারণের কাছ থেকে তিনি তীব্র বিরোধিতার মুখোমুখি হন। তিনি ১৯১৬, ১৯২৪ ও ১৯২৯ সালে মোট তিনবার জাপান সফর করেন। একজন নোবেলজয়ী হিসেবে সমাদৃত হলেও জাপানি জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনা তাঁকে জাতীয়তাবাদী মহলে অজনপ্রিয় করে তোলে। পাশ্চাত্য ধাঁচের সাম্রাজ্যবাদ ও সামরিক নীতি গ্রহণের বিপদ সম্পর্কে তিনি জাপানকে সতর্ক করেছিলেন এবং জাপানি সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে তাঁর বক্তৃতাগুলো বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিল। অন্যান্য এশীয় দেশগুলোর প্রতি জাপানের আগ্রাসী আচরণের সুস্পষ্ট সমালোচনা করে তিনি বলেন যে, জাপান এশীয় স্বাধীনতার আলোকবর্তিকা না হয়ে বরং একটি ঔপনিবেশিক শক্তি হয়ে উঠছে। এ কারণে জাপানি কবি-সাহিত্যিকদের সাথেও তার দ্বন্দ্ব তৈরি হতে থাকে।
সবচেয়ে বড় সংঘাতটি হয়েছিল জাপানি কবি ওনে নোগুচির সঙ্গে । ১৯৩৭ সালে জাপানের চীন আক্রমণ-পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নানজিং গণহত্যার তীব্র নিন্দা করেন এবং জাপানি বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকেও প্রতিবাদ প্রত্যাশা করেন। কিন্তু নোগুচি জাপানিদের এই পদক্ষেপকে দেশপ্রেমের কাজ বলে আখ্যা দেন এবং রবীন্দ্রনাথকে যুদ্ধের উদ্দেশ্য না বোঝার জন্য অভিযুক্ত করেন। জাপানি চাপে থাকা চীন ও কোরিয়ার প্রতি রবীন্দ্রনাথের দৃঢ় সমর্থনের কারণে জাপানিদের সাথে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এর ফলে তিনি জাপান সফর বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং জাপান ‘ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের ভাইরাসে সংক্রমিত’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন। এই সংঘাতটি রবীন্দ্রনাথের আন্তর্জাতিকতা ও মানবতাবাদী দর্শন এবং তখন জাপানে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা উগ্র জাতীয়তাবাদের মধ্যকার গভীর বিভেদকে তুলে ধরেছিল।
১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথ সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন। সেখানকার অভিজ্ঞতা নিয়ে রচনা করেন ‘রাশিয়ার চিঠি’। সেখানে পরিমিত প্রশংসা ছিল, ছিল না ঢালাও নিন্দা। দেশটির সামাজিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতি গভীর মুগ্ধতা যেমন প্রকাশ পেয়েছিল, তেমনি তার সমগ্রতাবাদী পদ্ধতির নীতিগত সমালোচনাও ছিল। গণশিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও শ্রমিক শ্রেণিকে দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্রুত সাফল্যে তিনি গভীরভাবে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তবে, স্তালিনের দমনমূলক শাসন, বিশেষ করে ব্যক্তিগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা হরণের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তিনি নেতা ও কর্মীদের ইচ্ছার মধ্যে যোগাযোগের দূরত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং সহিংসতা ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করেন। আর তাই স্তালিনের শাসনামলে ‘রাশিয়ার চিঠি’ গ্রন্থটির অনুবাদ সেন্সরশিপের কবলে পড়ে। বিশেষত সেই অংশগুলো বাদ দেওয়া হয়েছিল যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাশিয়ায় স্বাধীনতার অভাব ও শাসনব্যবস্থার হিংসাত্মক প্রকৃতির সমালোচনা করেছিলেন। তাই, অধিক ন্যায়সঙ্গত সমাজ গড়ার সোভিয়েত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রশংসা করলেও এই পরীক্ষার ফলে মানুষের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের যে ক্ষতি হয়েছিল তা তাঁকে বিচলিত করেছিল। সব মানুষকে এক ছাঁচে ফেলে গড়া যায় না, তিনি বলেছিলেন।
১৯১৬-১৯১৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এর মূল কারণ জাতীয়তাবাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য সমালোচনা, যা আমেরিকার যুদ্ধকালীন মতাদর্শ এবং প্রবাসী ভারতীয়দের উগ্রবাদী রাজনৈতিক ভাবনার সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। উগ্রপন্থী প্রবাসী ভারতীয় লালা হরদয়াল ও সোহান সিং ভাকনা’র নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ‘গদর পার্টি’র ক্যালিফোর্নিয়া-ভিত্তিক বিপ্লবীদের কাছ থেকে সবচেয়ে তীব্র আক্রমণ এসেছিল। তাদের মুখপত্র ‘হিন্দুস্তান গদর’ পত্রিকার সম্পাদক রামচন্দ্র ভরদ্বাজ ছিলেন প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক। তাদের মতে, রবীন্দ্রনাথ এক ‘দুর্বল’ ও ‘পুরাতন ভারত’-এর সমর্থক। তিনি তাদের প্রস্তাবিত সক্রিয় ও সহিংস প্রতিরোধের চেয়ে আধ্যাত্মিকতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। ব্রিটিশদের কাছ থেকে ‘নাইটহুড’ গ্রহণ করার জন্য তিনি সমালোচিত হয়েছিলেন। এই উগ্রপন্থীরা বিষয়টিকে কোনো সম্মানজনক খেতাবের পরিবর্তে স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখেছিল। ভারতীয় বিপ্লবীদের তীব্র বিদ্বেষের কারণে তাঁর নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছিল, ফলে সান ফ্রান্সিসকোতে থাকাকালীন তাঁকে পুলিশ কর্তৃক সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল।
১৯১৩ সালের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সময়কালে পশ্চিমে রবীন্দ্রনাথ শিল্পী, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সমর্থন পেয়েছিলেন, যারা তাঁর সাহিত্যের কদর করতেন। ইংল্যান্ডে উইলিয়াম রোদেনস্টেইন, এজরা পাউন্ড, এইচ ডব্লিউ নেভিনসন, এইচ জি ওয়েলস ও ই বি হ্যাভেল প্রমুখ এবং আমেরিকায় হ্যারিয়েট মুডি, Poetry পত্রিকার সম্পাদক হ্যারিয়েট মনরো, প্রফেসর এডউইন হারবার্ট লুইস, প্রফেসর জেমস এইচ উডস, হেলেন কেলারসহ আরো অনেক তাঁর গুণমুগ্ধ ছিলেন। এরা তাঁর লেখা প্রকাশ ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতার আয়োজন করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ও বার্নাড শ
ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথের খ্যাতি উত্থান-পতনের এক চক্রের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। তিনি যখন শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার জন্য তহবিল সংগ্রহের প্রচেষ্টায় নিরন্তর ছুটে বেড়াচ্ছেন তখন জর্জ বার্নার্ড শ তাঁর এই প্রচেষ্টা নিয়ে রসিকতা করতে ছাড়েন নি। ঠাট্টা করে তাঁকে তিনি ‘Stupendranath Begore’ বলছেন। Stupendous ও Beg শব্দ দুটি দিয়ে তিনি তাঁকে ‘অকল্পণীয় ভিক্ষুক’ বলে কটাক্ষ করেছেন। মানুষের চিন্তাধারা ও কর্মকাণ্ড নিয়ে স্বভাবসুলভ মশকরা করাটা বার্নাড শ-এর স্বভাবের একটি অংশ ছিল, কিন্তু ১৯৩০ সালে ইংল্যান্ডে রবীন্দ্রনাথের সাথে তিনি দেখা করেছিলেন এবং অনেক সময় একসাথে কাটিয়েছেন। ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর বার্নার্ড (রবীন্দ্রনাথ ও বার্নাড শ) শ’ই ন্যাশনাল গ্যালারির ডিরেক্টরকে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি টানানোর জন্য অনুরোধ করেছিলেন, যা কবির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধের ইঙ্গিত দেয়।
এই একই বিষয় নিয়ে আমেরিকার সংবাদ মাধ্যমও তাঁকে আক্রমণ করেছিল। ১৯১৬-১৭ সালে দ্বিতীয়বার আমেরিকা সফরের সময়, মিনিয়াপলিস ট্রিবিউন-এর মতো কিছু সংবাদমাধ্যম তাঁর নিরলস তহবিল সংগ্রহের সমালোচনা করে তাঁকে ‘ভারত থেকে আসা সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী’ বলে অভিহিত করে এবং তিনি আমেরিকানদের ‘তিরস্কার’ করে বক্তৃত দেওয়ার জন্য ৭০০ ডলার পাচ্ছেন মর্মে অভিযোগ করে। গ্রাহাম গ্রিন রবীন্দ্রনাথের নোবেল-পরবর্তী সাহিত্যকে খারিজ করে দিয়েছিলেন। ১৯৩৭ সালে তিনি লিখেছিলেন যে, ডব্লিউ. বি. ইয়েটস ছাড়া আর কেউ তখনও রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে গুরুত্বের সাথে নিতে পারে তা তিনি বিশ্বাস করেন না। ডি এইচ লরেন্স ১৯১৬ সালে ‘গীতাঞ্জলি’কে ‘নিছক প্রতারণা’ বলে খারিজ করে দিয়েছিলেন। ফিলিপ লার্কিন তাঁর প্রতি তীব্র অবজ্ঞা প্রকাশ করে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন যে, যদি তাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তবে তিনি একটি অশ্লীল গালি দিয়ে উত্তর দিতে চাইবেন। ব্রিটিশ নারীবাদী ও সাংসদ এলিনর র্যাথবোন ১৯৪১ সালে ভারতীয়দের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লিখে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অকৃতজ্ঞতার জন্য ভারতীয়দের এবং পরোক্ষভাবে রবীন্দ্রনাথের মতো বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনা করেন, যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে গভীরভাবে মর্মাহত করেছিল।
লাতিন আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথের একনিষ্ঠ ভক্ত বলতে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। তবে হোর্হে লুই বোর্হেস তাঁর কাজের সমালোচনা করলেও অন্যদের মতো অশ্রদ্ধা পোষণ করতেন না। ১৯৩৭ সালের একটি রচনায় বোর্হেস ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর ১৯২৪ সালের সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের প্রশংসা করেছেন, তবে তাঁর কাজকে অস্পষ্ট, অতিরিক্ত ভাবপ্রবণ ও কাঠামোগতভাবে দুর্বল বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন। তবে যে ‘Nationalism’ গ্রন্থটি নিয়ে পাশ্চাত্যে এতো বিরূপ সমালোচনা, বোর্হেস তার প্রশংসা করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথকে চাওয়া না চাওয়ার দ্বন্দ্বটি মূলত সাহিত্যিক, রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। বিশ্বমানবতায় বিশ্বাসী রবীন্দ্রনাথ সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদকে ঘৃণা করতেন। অনেকেই মনে করেন, তাঁর এই বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ঔপনিবেশিক ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের উগ্র জাতীয়তাবাদী ধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। যে কারণে একটি গোষ্ঠীর তিনি বিরাগভাজন ছিলেন। তাঁর অনেক লেখার মূল উপজীব্য আধ্যাত্মিক ও ভাববাদী দর্শন, যা বিশেষ কোনো ধর্মীয় কাঠামোয় পড়ে না। কিন্তু জবরদস্তিমূলক তাঁকে সাম্প্রদায়িক প্রমাণের অপচেষ্টা চলে আসছে। জীবনের শেষ দিকে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন ফ্যাসিবাদের উত্থান, বিশ্বযুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষ। এসব নিয়ে তিনি তাঁর মতো করে প্রতিবাদ করেছেন। প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে রচনা করেছেন গান ও কবিতা। তিনি যেমন প্রেম ও আধ্যাত্মিকতার কবি, তেমনই প্রতিবাদী ও মানবতাবাদী কণ্ঠস্বর। এই বহুমাত্রিকতার কারণেই তাঁকে চাওয়া ও না চাওয়ার দ্বন্দ্ব—দুটোই থেকে যায়।