রাইজিংবিডি স্পেশাল

রেখামারীর কান্নার শব্দ মিলায় পশুর নদীর ঢেউয়ে! 

সরু রেখার মতো গ্রামটি দাঁড়িয়ে আছে সুন্দরবনের গা ঘেঁষে। একপাশে পশুর নদীর প্রবহমান ধারা, অন্য ধারে ঢাংমারী খাল। খাল পেরোলেই ঘন সবুজ সুন্দরবন। বন্দরের জাহাজের শব্দ, লঞ্চের হুইসেল, নৌকা চালানোর কলকল ধ্বনি পরিচিত বনের ধারের এই মানুষদের কাছে। নদী আর বনের সংযোগ স্থলে রেখামারীর মানুষেরা টিকে আছে বহুমুখী সংকট মোকাবিলা করে। প্রাকৃতিক বিপদগুলো তাদের তাড়িয়ে ফেরে। শীত মৌসুম তাদের কাছে আশার আলো হয়ে এলেও বর্ষায় তাদের টিকে থাকার লড়াই আরো কঠিন হয়। পশুর নদীর গ্রাস জীবন ওলটপালট করে দেয়। তবুও এখানেই জীবন চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।  

মোংলা বন্দর থেকে পশুর নদী পার হয়ে রেখামারীর পথে বানিশান্তা বাজার থেকে কাঁচা-পাকা বেড়িবাঁধ ঢাংমারী ঘুরে গেছে। পাশে সুন্দরবনকে রেখে এঁকেবেঁকে চলে গেছে বাঁধ। ঢাংমারী বাঁধের বাঁকের কাছে রেখামারী গ্রামের প্রবেশমুখ। বেড়িবাঁধ থেকে নদীপাড়ের দিকে কাঁচা সরু রাস্তা চলে গেছে গ্রামের দিকে। দূর থেকেই রেখামারীর ভঙ্গুর ঝুলন্ত বসতিগুলো চোখে পড়ে। কোনোটি বাঁশের খুঁটির সাথে ঝুলে আছে, কোনোটি সামান্য মাটি পেয়েছে, আবার কোনোটি পশুর নদীর গ্রাসের মুখে স্থানান্তরের অপেক্ষায় দিন গুনছে। এই বিপন্নতার মধ্যেই মানুষের কোলাহল, জীবন-জীবিকা, হাসি-আনন্দ, কখনো উৎসবে মাতোয়ারা। 

রেখামারীর পুরনো নাম পূর্ব ঢাংমারী। এটি খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার বানিশান্তা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের একটি জলবায়ু বিপন্ন গ্রাম। ২০০ বাড়িতে এখানে ৬-৭শ’ মানুষের বসবাস। খাবার পানির সংকট, জীবিকা এবং বসবাসের সংকটকে এখানকার বাসিন্দারা প্রধান সমস্যা মনে করে।    

স্বপ্ন, আশা এবং লড়াই

গ্রামের প্রবেশ মুখেই দেখা ইব্রাহিম বেপারির সঙ্গে। ৩৩ বছরের জীবনে অনেক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেছেন। ছেলেমেয়েসহ পাঁচজনের সংসার। বাবার সংসার থেকে আলাদা হয়েছেন অনেক অগে। স্ত্রী ফাতেমা বেগমকে নিয়ে তিন সন্তানকে বড় করা আর জীবন-জীবিকার চাকা সচল রাখার লড়াই তাদের। ছেলেমেয়ে আয়শা, ইমাম এবং ওমরকে নিয়ে ইব্রাহিম বেপারির অনেক স্বপ্ন। কিন্তু প্রাকৃতিক বিপদগুলো সে স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়ন হতে দেবে, জানেন না ইব্রাহিম। সাইক্লোন সিডর, আইলাসহ আরো অনেক বিপদ মোকাবিলা করে জীবনের এই প্রান্তে এসেছেন ইব্রাহিম। সুন্দরবনের নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরা ইব্রাহিমের প্রধান পেশা। কিন্তু প্রাকৃতিক বিপদগুলো পেশা বা আয়-রোজগারে বারবার বিঘ্ন সৃষ্টি করে। 

সিডরের রাতের সেই ভয়াল দৃশ্যপট তুলে ধরে ইব্রাহিম বলেন, ‘‘সেদিন আমরা ঘরে ছিলাম। আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারি নাই। বাপ-মায়েরা গেছিল। আমাদের ঘরের উপরে একটি গাছ এসে পড়েছিল। আমাদের ঘরটি ছিল গোল ঘর। আমরা চাপা খাইয়া গেছিলাম। সেই সময় আমরা এই খাটের নিচে আশ্রয় নিছিলাম। ঝড় একটু কমার পর অন্য ঘরে আশ্রয় নিছিলাম।’’

সাইক্লোন আইলায় আমরা আরো ক্ষতির মুখে পড়ি। সিডর যা অবশিষ্ট রেখে গিয়েছিল, তা ভাসিয়ে নেয় আইলা। উল্লেখ করে ইব্রাহিম বলেন, ‘‘ঝড়ে সব হারাইছি। এখনো বড় বিপদ ঝড়। বড় ঝড় এলে আমাদের রক্ষা নাই।’’

রেখামারী গ্রামের মানুষদের পানির জন্য এভাবেই লড়াই করতে হয়

রেখামারী গ্রামের সরু রেখার মতো রাস্তাটির একটি শাখা মিলেছে পশুর নদীর কিনারে। এখানেই আনোয়ার হোসেনের দোকান। ইউপি মেম্বার ছিলেন বলে এখন ‘আনোয়ার মেম্বার’ নামেই পরিচিত। দোকানে বসা ইব্রাহিম বেপারির বাবা ৬৬ বছর বয়সী আবদুস সালাম বেপারী সংকটের আরো একটু বিস্তৃত ব্যাখ্যা দিলেন। এই বয়সে এসেও নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। খাবার পানি, আবাসন, উপার্জন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দুর্যোগ প্রস্তুতি, সব ক্ষেত্রেই সমস্যা রেখামারীতে, জানালেন আবদুস সালাম। পশুর নদীর তীরে তার বাড়িটি বেশ কয়েকবার স্থানান্তর করতে বাধ্য হয়েছেন। নদীর মাঝখানে তর্জনী তুলে নিজের পুরনো হারিয়ে যাওয়া বাড়ির সীমানা আঁকার চেষ্টা করছিলেন তিনি।

দুর্যোগে আশ্রয় নেব কই?

দুর্যোগের খবর পান? আশ্রয় নেওয়ার ব্যবস্থা আছে? প্রশ্নের জবাবে রেখামারীর বাসিন্দারা জানালেন, ‘‘হ্যাঁ পাই, আমরা সাইক্লোনের বার্তা পাই। কিন্তু কাছাকাছি আশ্রয় নেওয়ার ব্যবস্থা এ গ্রামে নাই। আমাদের একটা সাইক্লোন শেলটার আছে দূরে, খ্রিস্টান পাড়ায়। ওই পাড়ায় ব্যক্তিগতভাবে আশ্রয়কেন্দ্রটি করা হয়েছে। কিন্তু সিগন্যালের সময় ওই আশ্রয়কেন্দ্রে লোক ধরে না। ২/৩শ’ মানুষ গেলেই আর জায়গা থাকে না। আমরা যাওয়ার আগেই জায়গা বুকিং হয়ে যায়।’’

গ্রামের প্রবেশ মুখ থেকেই রাস্তার নাজুক অবস্থা। সাইক্লোন সিগন্যালের প্রয়োজন নেই, স্বাভাবিক জোয়ারেই বাড়িঘর ডুবে যায়। কোথাও কোথাও পশুর নদী এবং ঢাংমারী খালের মাঝখানে খুব নাজুক মাটির রাস্তা। জোয়ারের পানির ঢেউয়ে রাস্তার মাটি ক্রমেই ক্ষয়ে যায়। মানুষের জীবনযাত্রা আরো বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে। এই ঝুঁকির মধ্যেও সেই নাজুক রাস্তার পাশে আক্রাম আলী শেখের ঝুলন্ত বসতি। এভাবে তিনি বসবাস করছেন প্রায় ৫০ বছর ধরে। পশুর নদী তাকে তাড়িয়ে নিয়ে এসেছে অনেক দূর। চার মেয়ে এবং এক ছেলের মধ্যে চারজনই আক্রাম শেখের সাথে বসবাস করেন। সংসারে প্রতিদিনের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। আক্রাম বলেন, ‘‘এখানে ঝড় ও জোয়ারের সাথে লড়াই করে টিকে আছি। প্রতিটি দিন ভয়ে কাটে, কখন কী হয়! আয়-উপার্জন থাকে না। সংসার চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তা। অন্যদিকে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস-সাইক্লোনের ভয়। কাছাকাছি আশ্রয়ের কোন ব্যবস্থা নাই। তাই বিপদগুলো আমাদের ক্ষতি বাড়ায়।’’

রেখামারীর খোলা মাটির সড়ক ধরে দক্ষিণে হাঁটলে গোড়া ঢাংমারী গ্রাম। পৃথক নাম হলেও দুটো গ্রাম একই সুতোয় গাঁথা। জীবন জীবিকা, বসবাস, প্রাকৃতিক বিপদ, সবই একই। গোড়া ঢাংমারী গ্রামের একটি অংশ হিন্দু অধ্যুষিত। রাস উৎসব, বনবিবি মেলাসহ বিভিন্ন পার্বনে এরা মিলিত হয় একই মোহনায়। আঁকাবাঁকা সরু পথ ধরে গোড়া ঢাংমারী গ্রামের শেষ মাথায় গেলে পশুর নদী এবং ঢাংমারী খালের সংযোগস্থল, ওপারে সুন্দরবন। গোড়া ঢাংমারী গ্রামটির কিছু অংশ সবুজে ভরা। ধানসহ বিভিন্ন ফসল হয়। তবে তাও থাকে ঝুঁকির মুখে। দু’গ্রামের একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও গোড়া ঢাংমারীতে।

অমরেশ চন্দ্র মন্ডল বলেন, ‘‘প্রতি বছরই প্রায় একটা-দুইটা দুর্যোগের মধ্যে পড়েন রেখামারী ও ঢাংমারীর বাসিন্দারা। বড় দুর্যোগ না হলেও জোয়ারের পানি বাড়ে, সিগন্যাল হয়, মানুষদের প্রস্তুতি নিতে হয়। আমরা পানির মধ্যে আছি। অথচ আমাদের খাবার পানির অভাব তীব্র। বছরের অর্ধেক সময় বৃষ্টির পানি এবং বাকি অর্ধেক সময় নদীর পানি পরিশোধন করে পান করতে হয়।’’

সংকটে শিক্ষা-স্বাস্থ্য

হাজারো সংকটের মধ্যে রেখামারীর মানুষের মনে বেঁচে থাকে আশা। তিনবেলা খাবার যোগাড় করতে না পারা বাবাও তার ছেলেমেয়েকে স্কুলে পাঠিয়ে মানুষ করতে চান। জীবিকার জন্য শক্ত হাতে বৈঠা ধরা বৃদ্ধ মানুষটাও চান তার পরের প্রজন্ম আবার মাথা তুলে দাঁড়াক, ভালো থাকুক। শত সংকটের মাঝেও এ গ্রামের মানুষেরা বিভিন্ন পার্বনে উৎসবে মেতে ওঠে। মুসলিম-হিন্দু সকলে একসাথে বসবাস করে। সংকটগুলো চাপা রেখে ঈদ-পুজোয় মেতে ওঠে রেখামারীর বাসিন্দারা। উৎসবে নতুন কাপড়ের আবদার পূরণ, ভালো খাবারের প্রত্যাশা পূরণ এখানকার সংকটাপন্ন পরিবারগুলোতেও দেখা যায়। তারা আশায় বেঁচে থাকে; কিন্তু প্রশান্তির নাগাল পান না।

গ্রামের গৃহস্থালির অধিকাংশ কাজে ব্যবহৃত হয় পশুর নদীর পানি

ইব্রাহিম বেপারীর মেয়ে আয়শা পড়তে চায়। বাবাকে সে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। আগে লেখাপড়া, তারপর বিয়ে। রেখামারী গ্রামে আয়শার লেখাপড়ার সুযোগ নাই। সে দূরে বানিশান্তা স্কুলে পড়তে যায়। তার সাথে আরো অনেক মেয়েরা এ গ্রাম থেকে সেখানে যায়। আক্রাম শেখের মেয়ে ফাতেমা বেগমও সেই দলে। ফাতেমার সাথে দেখা হয়েছিল ওদের ঝুলন্ত ঘরের সামনে। খুব উচ্ছ্বসিত। ছবি তুলতে তার ভালো লাগে। কথায় কথায় জানালো, সে ডাক্তার হবে। মেয়ের স্বপ্নের কথা শুনে পাশে দাঁড়ানো বাবা আক্রাম শেখের বুকটা ভরে ওঠে। কিন্তু এই দেওয়াল ভেঙ্গে, এত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে বেশি দূর এগোতে পারে না ওরা। তবুও ফামেতারা স্বপ্ন দেখে আগায়। 

রেখামারী গ্রামের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। অসুখ হলে দূরের শহরে যাওয়া ছাড়া আর বিকল্প নাই। নেই কোনো চিকিৎসাকেন্দ্র। এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে নারী ও শিশুদের উপর। আক্রাম শেখের মেয়ে রেহেনা বেগমের প্রথম সন্তান মারা গিয়েছিল বিভিন্ন সমস্যার কারণে। অনেক আশায় বুক বেঁধেছিলেন রেহেনা-আলমগীর দম্পতি। অবশেষে সেবার একটি মৃত সন্তান প্রসব করেন রেহেনা। কিন্তু পরের বার, মাত্র মাস দু’য়েক আগে রেহেনা জন্ম দিয়েছে একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তান, নাম রেখেছে মারিয়া। লবণ পানির গ্রাস এখানকার স্বাস্থ্যচিত্র বদলে দেয়, সংকট বাড়িয়ে দেয়। শিশুদের পুষ্টিহীনতা, নারী-পুরুষদের নানান অসুখ প্রতিকারের জন্য নেই কোনো ব্যবস্থা।

সেই দিনগুলো নেই 

আনোয়ার হোসেনের দোকানে কথা বলার সময় ভিড় বাড়ে। সংকটের কথা, ভালো থাকা-মন্দ থাকার কথা। একজন সেই দিনগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘‘এটা ছিল একটা সবুজ গ্রাম। বন ছিল, কৃষি জমি ছিল, আমাদের মধ্যে অনেকে কৃষি জমি আবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করত।’’ শ্রুতি বেগম বলেন, ‘‘আগের দিনের সাথে এখন আর তুলনা চলে না। সবুজ গ্রামটি এখন মরা কংকালে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে আমরা কোথায় যাবো বলতে পারছি না।’’

আলাপের এক পর্যায়ে আনোয়ার হোসেন ক্ষোভ ঝাড়েন। বাইরের কোনো লোককে তিনি আর তথ্য দিতে চান না। কেননা, অনেক তথ্য দিলেও তাদের সংকটের সমাধান হয়নি। তিনি বলেন, ‘‘আমরা এদেশের ভোটার। আমরা এদেশের নাগরিক। আমাদের অধিকার আমরা ফিরে পেতে চাই। সরকার আমাদের সমস্যার সমাধান করুক। যাতে আমরা স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারি।’’   

শৈশবের স্মৃতি মনে করে ইব্রাহিম বেপারী বলেন, ‘‘এক সময় আমাদের পারিবারিকভাবে খুব অভাব কষ্ট ছিল। বাপ একা ছিলেন খাটনির মানুষ। তারপরও লেখাপড়া করতে চাইছিলাম। কিন্তু সংসারের দিকে মনোযোগ দিতে হয়েছে। শৈশবের কথা মনে পড়ে সবসময়। আগে খুব ভালো ছিল। অনেক দূর জায়গা ছিল, নদীও ছিল অনেক দূরে। আমরা ছোটবেলায় এ মাথা থেকে ও মাথায় দৌড় দিয়ে শেষ করতে পারতাম না। খেলার মাঠ ছিল। বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে আনন্দ ছিল অনেক। এখন আনন্দ নেই। অভাবের কারণে নিজে কাজের মধ্যে ডুবে লেখাপড়া করতে পারিনি। এখন ছেলেমেয়েদের নিয়ে আশা আছে। আমরা যা ভুল করেছি, ওই ভুলে যেন ছেলেমেয়েদের না ফেলি। একটু চেষ্টা করবো আর কী!’’

আপনার ছেলেরাও কী আপনার পেশায় যাবে? ইব্রাহিম বলেন, ‘‘আমি তো চাই না যে এ কাজ ওরা করুক। আমি তো সুন্দরবনে নিতে চাই না। ওরা লেখাপড়া করে যাতে নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াইতে পারে, সেই চেষ্টাটা করবো।’’ 

ভরসা সুন্দরবন

রেখামারী গ্রামের বাসিন্দা আক্রাম শেখ সুন্দরবনে কাজে গেছেন। অপেক্ষায় রয়েছেন তার স্ত্রী জোছনা বেগম এবং সন্তানেরা। সময় বাড়লে তাদের উৎকণ্ঠা বাড়ে। পরিবার থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকেন আক্রাম শেখ। তবুও এটাই তাদের জীবিকা। আক্রাম শেখ, ইব্রাহিম বেপারীসহ আরো অনেক মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে সুন্দরবন। জোছনা বেগম বলেন, ‘‘আমরা সংকটের মধ্যে থাকি। পরিবারের সবাইকে নিয়ে চলতে আমাদের যে অর্থ প্রয়োজন, তা উপার্জনের সুযোগ কম। পুরুষেরা সুন্দরবনে গিয়ে উপার্জন করে। ভয়-ভীতি আছে। তারপরও আমাদের তো উপায় নাই।’’ 

রেখামারী গ্রামের প্রায় সব পরিবার সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল। বছরের ছয় মাস তাদের বন-নির্ভর কাজ থাকে। বাকি ছয় মাস তারা অন্য কাজ করে। কেউ নৌকায়, কেউ শহরে শ্রমিকের কাজে যায়। সুন্দরবনে কাজের সংকটের কথা তুলে ধরে ইব্রাহিম বেপারী বলেন, ‘‘আমরা সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া মারি। আমাদের সংকট সবসময়ই লাইগা থাকে। আমাদের এক ট্রিপ ইনকাম হইলে পরের ট্রিপ হয় না। মানে খুব সমস্যার মধ্যেই আমাদের সবসময় পড়ে থাকতে হয়। আমরা অনেকবার বলছিলাম আমাদের একটু ভিতরে জায়গা করে দেন। আমাদের গুচ্ছগ্রাম বানাইয়া দেন। আমরা ওই জায়গায় যাইয়া থাকি। অনেক তো খাস জায়গা আছে। আপনারা তো অনেক সহযোগিতা পান। সেই থেকে আমাদের একটু সহযোগিতা করেন। আমাদের ভিতরে একটু ঘরবাড়ি বানানোর একটু চেষ্টা করে দেন। প্রতিশ্রুতি না দিয়ে আমাদের জন্য কিছু করেন।’’

ভবিষ্যৎ কী?

‘‘আমরা অন্য কাজে যেতে পারি না। অন্য কাজ জানি না। অভ্যাস হয়ে গেছে তো। সুন্দরবনের সাথে জড়িতই গেছি। রক্তে মাংসে মিশে গেছে। যে পেশা আর ছাড়তে পারছি না।’’ কথাগুলো যেন রেখামারী গ্রামের সব মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়।  

রেখামারী গ্রামের অধিকাংশ মানুষ দেনায় জর্জরিত। এনজিও অথবা মহাজনের কাছে ঋণের জালে বাধা। বাঁচতে হলে এদেরকে ধারদেনা করে চলতে হয়। ঋণ নিতে হয়। ঋণ নেওয়া মানে সপ্তাহে সপ্তাহে কিস্তি দেওয়ার ফাঁদ। তাই রেখামারী ও গোড়া ঢাংমারীর বাসিন্দারা জীবিকার অর্থ উপার্জনের পর কিস্তির জন্য বাড়তি উপার্জন করতে বাধ্য হয়। আলমগীর হোসেন বলেন, ‘‘কিস্তির টাকা যোগাড় করা আমাদের বড় চিন্তা। ওই টাকাটা গোছানো লাগবেই। কিস্তিটা দেওয়ার চেষ্টা করি। তারপরেও মাঝেমধ্যে খেলাপী হই। কথা শুনতে হয়। কথা শুনতে চাই না। তাই অধিক খাটুনি করি।’’ 

রেখামারী গ্রামের ঝুলন্ত বসতি

আবদুস সালাম বেপারী বলেন, ‘‘আমাদের ভবিষ্যৎ খুবই খারাপ। আমাদের যে পরিবেশ আছে, এই পরিবেশে থাকার মতো অবস্থা নেই। ক্রমে ক্রমে আমরা ডুবছি। আমাদেরকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে নিয়তি। যদি ভিতরে একটু জায়গা থাকতো, বা একটা সাইক্লোন থাকতো, আমরা বসবাসের নিশ্চয়তা পেতাম। আমাদের বসবাসের সুবিধার্থে সরকার দু’দিকে ব্লক ফেলে দিতে পারে। তাহলে আমরা বসবাসের সুযোগ পেতাম। আমাদের দুই দিক দুই নদী ভাঙছে। এলাকাটি ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। কতদিন এখানে থাকতে পারব জানি না।’’ 

রেখামারীর নারীরাও জীবন-জীবিকার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন। প্রতিদিন সকাল-বিকাল দুইবেলা ভিক্ষের থালা নিয়ে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে হাত পাততে হয় বৃদ্ধা রাবিয়া বেগমকে। বয়স তার ৮০ ছুঁয়েছে। থাকেন অন্যের বাড়িতে। এক সময় বাড়িঘর, জমি এবং স্বজন, সবকিছু ছিল তার। কিন্তু এখন একা। স্বামী চানমিয়া মারা গেছেন অনেক আগে। অসুখে মারা গেছে চার ছেলে এবং এক মেয়ে। রাবিয়া বেগমের অবশিষ্ট একটি মাত্র মেয়ে স্বামীর ঘরে। সুন্দরবনের গা ঘেঁষে, পশুর নদী এবং ঢাংমারী নদীর মধ্যখানে রেখার মত সরু গ্রামে টিকে থাকার জন্য লড়াই করেন রাবিয়া। প্রাকৃতিক বিপদগুলোর সাথে তাকে যুদ্ধ করতে হয়। বর্ষাকালের স্বাভাবিক জোয়ারও তার জীবন বিপন্ন করে। বর্ষাকাল তার দুশ্চিন্তা বাড়ায়। জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের উপকূলের বয়সী নারীদের জীবন এভাবে বিপর্যস্ত করে, ঠিক রাবিয়ার মতো।   

সূর্যটা পশ্চিমে হেলেছে। আনোয়ার হোসেনের দোকানে তখনও কয়েকজন ক্রেতা। পশুর নদীতে ইঞ্জিন নৌকাগুলো আসা-যাওয়া করছে। কয়েকজন নারী-পুরুষ দোকানের নিকটে নদীর ধারে ভাঙা নৌকার পাশে দাঁড়িয়ে। আবদুস সালাম বেপারী হাঁটতে হাঁটতে বলছিলেন তার জীবনের লড়াইয়ের গল্প। তার চোখ ভিজে উঠছিল বারবার। রেখামারী গ্রামের মানুষের এই কান্নার শব্দ নীতিনির্ধারণী মহলে পৌঁছায় না, পশুর নদীর ঢেউয়ে মিলিয়ে যায়।