ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি শিগগিরই ঘোষণা করা হতে পারে। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে আলোচনা চললেও এবার তা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
দলীয় সূত্র জানায়, নেতৃত্বের বিভিন্ন স্তরে একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে যাচাই-বাছাই শেষ হয়েছে। যোগ্যতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা বিবেচনায় নিয়েই নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়েছে। এরই মধ্যে শীর্ষ পদ প্রত্যাশীদের এক ডজন নেতার তালিকা প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়াম্যান তারেক রহমানের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। একাধিক নেতার বিষয়ে খোঁজখবরও নিয়েছেন দলীয়প্রধান।
এরই মধ্যে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াতে আগামী ৯ মে ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের জেলা পর্যায়ের শীর্ষনেতা ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে মতবিনিময় সভা করবেন তারেক রহমান।
দলীয় সূত্র বলছে, সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল করতেই এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হবে।
জানা যায়, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় শীর্ষ ৫ নেতা, মহানগর ও সাংগঠনিক জেলার শীর্ষ ২ নেতাকে ইতোমধ্যে বার্তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ছাত্রদলের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের দুই জন করে প্রতিনিধি এই মতবিনিময় সভায় অংশ নিবেন। সহযোগী সংগঠনগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের আগে দলীয় নির্দেশনা জানাবেন বিএনপি চেয়ারম্যান। একইসঙ্গে সারা দেশে সংগঠনগুলোকে গতিশীল করতে তৃণমূলের মতামতও জানতে চাইবেন তারেক রহমান। সে লক্ষ্যে কাজ করছে বিএনপির দপ্তর। এই মতবিনিময় সভার পরই আসতে পারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি ও নাসির উদ্দীন নাসিরকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের ৭ সদস্যের নতুন আংশিক কমিটি অনুমোদন করে বিএনপি। পরে ১৫ জুন ২৬০ সদস্য বিশিষ্ট আংশিক পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করা হয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সরকার পতনের পর ২০২৬ সালের ১ মার্চ এ কমিটির মেয়াদ শেষ হয়। ডাকসু, জকসু, জাকসু, রাকসু, চাকসুসহ বিভিন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের ভরাডুবির পর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে থেকেই এ কমিটি ভেঙে যাচ্ছে এমন গুঞ্জন ওঠে রাজনৈতিক মহলে।এর মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় আলোচনার টেবিলেই থাকে ছাত্রদলের কমিটি গঠন প্রক্রিয়া।
প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ২৮ মার্চ নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় পরিদর্শনে আসেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সে সময় ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেকদলসহ বিএনপির অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের সংগঠন পুনর্গঠনের দিক নির্দেশনা দেন তিনি। এরপর রোজা, ঈদ ও বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখিত ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড ও খাল খনন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। অবশেষে সাংগঠনিক অবসর কাটিয়ে বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের দিকে নজর দিচ্ছে বিএনপি।
ছাত্রদলের নেতৃত্ব নতুনদের হাতে তুলে দিতে কাজ শুরু করেছে বর্তমান কমিটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাসির। এরই মধ্যে তাদের কমিটির মেয়াদে অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে তৎপরতা চালাচ্ছেন তারা। মেয়াদোত্তীর্ণ ছাত্রদলের সাংগঠনিক জেলা, মহানগর, বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি গঠন প্রক্রিয়াও শেষের পথে।
এদিকে, পদপ্রত্যাশী নেতারা লবিং, তদবিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন। অনেকেই ছাত্রদলের সাবেক নেতা, বিএনপি শীর্ষনেতাদের কাছে ধর্না দিচ্ছেন। অনেকেই ভিড় করছেন অঞ্চলভিত্তিক বিএনপির শীর্ষনেতাদের কাছে।
আলোচনায় যারা ছাত্রদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের দুই নম্বর সহ-সভাপতি এবিএম ইজাজুল কবির রুয়েল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক দুইবারের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল ও ফজলুল হক মুসলিম হল ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
এসএসসি পাস করেন ২০০৬ সালে এবং এইচএসসি ২০০৮ সালে। ২০০৮-০৯ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। অনার্সে সিজিপিএ ৩.৬২ এবং মাস্টার্সে ৩.৭৮ অর্জন করেন।
রাজনৈতিক জীবনে তার বিরুদ্ধে ৮টি মামলা হয় এবং ৩ বার গ্রেপ্তার হন।
সবশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল কারামুক্ত হওয়ার এক মাস পরও তাকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবেই উল্লেখ করে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়।
খোরশেদ আলম সোহেল চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার বাসিন্দা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী। তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি, সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।
দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় সোহেল বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়ে একাধিকবার হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ডাকসু নির্বাচন, ক্যাম্পাসভিত্তিক আন্দোলন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে তিনি আহত হন এবং কারাবরণ করেন।
আলোচনায় আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৮/৯ সেশনের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি মঞ্জরুল আলম রিয়াদ।
এছাড়া ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক, অমর একুশে হল ছাত্রদলের সাবেক সদস্য সচিব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে সক্রিয় এই ছাত্রনেতা শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সরাসরি নেতৃত্ব দিতে গিয়ে একাধিকবার হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন। আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকার কারণে কারাবরণও করতে হয়েছে তাকে।
আলোচনায় আছেন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৯/১০ সেশনের শিক্ষার্থী আমান উল্লাহ আমান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সদস্য সচিব ছিলেন। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখায় ছাত্রদলে বেশ পরিচিত মুখ তিনি।
২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান আলোচনা রয়েছেন। তিনি ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।
সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল নেতা কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত।
ছাত্রদলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকা বাসেত এর আগে সংগঠনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজপথের আন্দোলন, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কারণে তিনি সংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশের সমর্থন পাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
আরো আলোচনায় আছেন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের দুই নম্বর যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৯–১০ সেশনের শিক্ষার্থী ফারুক হোসেন ছাত্র রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছেন।
২০১২ সালে প্রথম রাজনৈতিক মিছিল থেকে তিনি গ্রেপ্তারের শিকার হন। এছাড়া সাম্প্রতিক জুলাই আন্দোলনে কারফিউ ভেঙে প্রথম দিকের মিছিলে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি সক্রিয় নেতৃত্বের পরিচয় দেন।
এর বাইরে আরো আলোচনায় আছেন এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী, বর্তমান কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, প্রচার সম্পাদক শরিফ প্রধান শুভ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, এক নম্বর সহ-সভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক, সিনিয়র সহ-সভাপতি মাসুম বিল্লাহ, নাছির উদ্দিন শাওন, তারেক হাসান মামুন, গাজী সাদ্দাম হোসেন, মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, রাজু আহমেদ ও ইব্রাহিম খলিলের নাম।