আমার মা আমার সমস্ত শৈশব, সমস্ত নিরাপত্তা, আমার ছোট্ট পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরতার নাম। ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি, তোমার চাওয়াগুলো কী ভীষণ সাধারণ ছিল। নতুন শাড়ির আবদার নয়, দামি গয়নার লোভ নয়, কোথাও ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছে নয়, তুমি শুধু চাইতে সংসারটা ঠিকঠাক চলুক, সবাই দু’বেলা খেয়ে বাঁচুক, সন্তানগুলো মানুষ হোক।
নিজের জন্য আলাদা করে কিছু চাইতে তোমাকে কোনোদিন দেখিনি। মনে হতো, তুমি যেন নিজের জীবনটা নিঃশব্দে, কোনো অভিযোগ ছাড়াই, আমাদের সুখের কাছে বন্ধক রেখে দিয়েছ। তোমার স্বপ্নগুলোও বুঝি ধীরে ধীরে সংসারের হাঁড়িতে ভাতের গন্ধ হয়ে মিশে গিয়েছিল।
২০২৩ সালে ছিল তোমার প্রথম সমুদ্র দেখা। কথাটা মনে হলেই বুকের ভেতর কেমন এক অদ্ভুত ভার নেমে আসে। পৃথিবীর কত মানুষ কত জায়গায় যায়, কত ছবি তোলে, কত গল্প জমিয়ে রাখে। আর আমার মা জীবনের এতগুলো বছর পার করে, এত দায়িত্ব, এত ত্যাগ, এত নীরব ক্লান্তি বুকে নিয়ে, প্রথমবার সমুদ্রের সামনে দাঁড়াল।
সেদিন ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে তুমি কী ভাবছিলে, মা? জীবনের এত বছরের জমে থাকা না বলা কথাগুলো কি সমুদ্রের গর্জনে একটু হলেও হালকা হয়েছিল? নাকি সেই বিশাল নীল জলের সামনে দাঁড়িয়ে তুমি প্রথমবার নিজের জন্য একটু নিঃশ্বাস নিয়েছিলে?
তোমার কোল এখনো মনে আছে আমার। ছোটবেলায় ভয় পেলে, কষ্ট পেলে, সেই কোলে মুখ লুকালেই মনে হতো পৃথিবীর সব বিপদ থেমে গেছে। সময় বদলেছে, আমি বড় হয়েছি, কিন্তু সত্যি বলতে আজও মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে আবার সেই কোলে মাথা রাখতে। কারণ পৃথিবী যত বড়ই হোক, মায়ের কোলের চেয়ে নিরাপদ আশ্রয় আর কোথাও নেই।
একদিন তোমার সব না পাওয়াগুলো পূরণ করতে চাই। তোমার জীবনের ফেলে আসা ছোট ছোট ইচ্ছেগুলোর পাশে দাঁড়াতে চাই। আপাতত শুধু এটুকুই বলতে পারি, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি, মা। যতটা মুখে বলা যায়, তার চেয়েও অনেক বেশি।
লেখক: শিক্ষার্থী, মনোবিজ্ঞান বিভাগ ঢাকা কলেজ, ঢাকা