‘মা’ আমার জীবনের প্রথম আশ্রয়, প্রথম বিস্ময়, প্রথম উচ্চারিত শব্দ। পৃথিবীর আলো দেখার বহু আগেই তিনি তাঁর হৃদয়ের গভীরে আমার জন্য এক অনির্বচনীয় আবাস নির্মাণ করেছিলেন। আমি জন্ম নেওয়ার আগেই কেউ একজন আমার জন্য স্বপ্ন দেখেছিল, উৎকণ্ঠায় রাত জেগেছিল, ভবিষ্যতের সমস্ত অনিশ্চয়তাকে বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিল—সেই মানুষটিই আমার মা।
শৈশবে যখন কালবৈশাখীর ঝড়ে জানালার কাঁচ কেঁপে উঠত, বিদ্যুতের হিংস্র ঝলকানিতে চারপাশ থরথর করে কাঁপত, আমি আতঙ্কিত হয়ে ছুটে যেতাম মায়ের কাছে। তাঁর আঁচলে মুখ লুকিয়ে মুহূর্তেই মনে হতো, পৃথিবীর সমস্ত বিপর্যয় থেকে আমি নিরাপদ। আজ বুঝতে পারি, সেই আঁচল নিছক কাপড়ের কোনো সাধারণ প্রান্ত ছিল না; সেটি ছিল আমার অস্তিত্বের প্রথম দুর্গ, আমার ভাঙাচোরা ভয়গুলোর একমাত্র আশ্রয়স্থল। পৃথিবী যত নির্মম হয়েছে, মানুষ যত হিসেবি হয়েছে, মায়ের সেই আশ্রয় ততই নিঃশর্ত থেকেছে।
মা আমার কাছে অনেকটা ভোরের আলোর মতো। তিনি নিঃশব্দে জেগে ওঠেন, অথচ তাঁর জেগে ওঠার মধ্য দিয়েই পুরো সংসার আলোয় ভরে যায়। তাঁর ক্লান্তি থাকে, কিন্তু তিনি ক্লান্তির ভাষা উচ্চারণ করেন না। তাঁর অভাব থাকে, কিন্তু তিনি অভাবকে সন্তানের চোখে পড়তে দেন না। সংসারের অনন্ত দুশ্চিন্তা, অপূর্ণতা আর ত্যাগের নীরব ইতিহাস তিনি এমন দক্ষতায় নিজের অন্তর্গত অন্ধকারে গোপন রাখেন, যেন সন্তানের পৃথিবীটুকু অন্তত উজ্জ্বল থাকে।
মায়ের হাতের রান্নার গন্ধে আজও আমার সমগ্র শৈশব ঘুমিয়ে আছে। সেই গন্ধে মিশে থাকে দুপুরের অলস রোদ, ধোঁয়া ওঠা ভাতের উষ্ণতা আর এক অদৃশ্য অথচ গভীর মমত্ববোধ। পৃথিবীর সবচেয়ে বিলাসবহুল ভোজও হয়তো স্বাদের বাহুল্য দেখাতে পারে, কিন্তু মায়ের হাতের এক মুঠো ভাতের মধ্যে যে আত্মিক প্রশান্তি লুকিয়ে থাকে, তার তুলনা কোনো আড়ম্বরের সঙ্গে চলে না।
অনেক সময় মনে হয়, মা আসলে একটি প্রাচীন বটবৃক্ষের প্রতিরূপ। শত ঝড়ঝঞ্ঝা, প্রতিকূলতা আর সময়ের নির্মম ক্ষয় তাঁকে অবসন্ন করে তোলে, তবুও তিনি ভেঙে পড়েন না। বরং নিজের ছায়া বিস্তার করে আগলে রাখেন তাঁর প্রিয় মানুষগুলোকে। তাঁর চোখের নিচে জমে থাকা কালচে ক্লান্তির রেখাগুলো যেন নির্ঘুম রাতের দীর্ঘ উপাখ্যান। কত দুশ্চিন্তা, কত অশ্রু, কত অপূর্ণ ইচ্ছা সেখানে স্তব্ধ হয়ে জমে আছে—তার কোনো উচ্চারণ নেই। মায়েরা সম্ভবত কাঁদতেও শেখেন নীরবে; তাঁদের অশ্রুর শব্দও সন্তানের ঘুম ভাঙতে দেয় না।
জীবনের পথ যত দীর্ঘ হচ্ছে, তত উপলব্ধি করছি—মা নিছক একটি সম্পর্কের নাম নয়; তিনি এক অনন্ত অনুভূতির মহাকাব্য। পৃথিবী যখন মানুষকে স্বার্থপরতার গণিত শেখায়, মা তখনও নিঃস্বার্থতার ব্যাকরণ আঁকড়ে বেঁচে থাকেন। সন্তানের ব্যর্থতা তাঁর কাছে লজ্জার নয়, বরং আরও গভীর মমতায় জড়িয়ে রাখার কারণ। পৃথিবী যেখানে শর্ত আর প্রাপ্তির বিনিময়ে সম্পর্ক নির্ধারণ করে, মা সেখানে প্রতিদানের প্রত্যাশাহীন এক অপার ভালোবাসার নাম।
আমার মা তাই কখনো জোছনার মতো প্রশান্ত, কখনো নদীর মতো গভীর, কখনো উর্বর মৃত্তিকার মতো নির্ভরতার প্রতীক। জীবনের সমস্ত ক্লান্তি, অপমান, ব্যর্থতা আর অবসাদের শেষে আমি এখনও তাঁর কাছেই ফিরে যেতে চাই। কারণ পৃথিবীতে ‘মা’ নামের মানুষটিই একমাত্র, যার ভালোবাসায় কোনো কপটতা নেই, কোনো অভিনয় নেই, কোনো শর্ত নেই—আছে শুধু নিঃশেষে বিলিয়ে দেওয়ার এক অলৌকিক ক্ষমতা। তাঁর অস্তিত্বই আমার জীবনের সবচেয়ে পবিত্র আশীর্বাদ।
লেখক —শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড জিওগ্রাফি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম