‘মা’ শুধু একটি শব্দ নয়; নিরাপত্তা, ভালোবাসা আর নির্ভরতার অনন্য এক আশ্রয়। জীবনের কষ্ট, ব্যথা আর ক্লান্তির মাঝেও মায়ের মুখের এক টুকরো হাসি যেন, সব দুঃখ ভুলিয়ে দেয়। তার ভালোবাসায় কোনো স্বার্থ নেই, আছে নিখাদ মায়া, অশেষ দোয়া আর নিরন্তর ত্যাগ। পৃথিবীর অনেক সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে বদলে যায়, কিন্তু মায়ের ভালোবাসা থাকে চিরকাল একইরকম নির্মল ও অটুট।
আমার মা খুব সাধারণ একজন মানুষ, তিনি একজন গৃহিণী। তবে আমি তাকে শুধু ‘গৃহিণী’ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখতে পারি না। আমার কাছে তিনি পরিবারের মূল ভিত্তি, এক অনন্য শক্তির নাম। পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে, মা তখন একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক। আমাদের পছন্দের কোনো খাবার খেতে ইচ্ছে করলে, তিনি হয়ে ওঠেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রাঁধুনী। আবার জীবনের প্রথম অক্ষরজ্ঞান, প্রথম লেখা কিংবা প্রথম পড়ার হাতেখড়িও মায়ের কাছে। সেই অর্থে মা-ই আমার প্রথম শিক্ষক। অক্ষরজ্ঞান থেকে শুরু করে জীবনের মূল্যবোধ সবকিছুর সূচনা তার হাত ধরেই।
তবে মায়ের ভালোবাসার গভীরতা আমি সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করেছি জীবনের দুটি দিনে। প্রথম ঘটনাটি এক দুর্ঘটনার। হঠাৎ একদিন দুর্ঘটনায় আমার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে এবং চারটি সেলাই দিতে হয়। সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারি, সন্তানের সামান্য কষ্ট মায়ের মনে কতটা ঝড় তোলে। সারাদিন মা আমার পাশে বসে ছিলেন, নিজ হাতে খাইয়ে দিতেন, গল্প করে আমার মন ভালো রাখার চেষ্টা করতেন। তার চোখের দুশ্চিন্তা আর ভালোবাসা আমাকে বুঝিয়েছে, মা আসলে এক অনন্ত ভালোবাসার নাম। সে না থাকলে হয়তো সুস্থ হওয়াটাও এত সহজ হতো না।
দ্বিতীয় ঘটনাটি ঢাকায় আসার পরের। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে গিয়ে যখন ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল, তখন মাকে খুব বেশি মনে পড়ত। এর মধ্যেই একসময় আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। ঢাকা থেকে একবারে নামি নানাবাড়িতে। সেখানে শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হয়। মাকে ফোন করে শুধু বলেছিলাম, “মা, আমার খুব খারাপ লাগছে।” এই একটি বাক্যই যথেষ্ট ছিল, মা সব বুঝে গিয়েছিলেন। কাউকে কিছু না বলে তৎক্ষণাৎ ছুটে আসেন তিনি। এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। আমি তাকে যতই বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে, আমি ভালো আছি, তার মনের অস্থিরতা কমেনি। সেদিন গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলাম মায়ের ভালোবাসার চেয়ে নিঃস্বার্থ আর কিছু হতে পারে না।
নিজের অসুস্থতা বা ক্লান্তিকে উপেক্ষা করে সবসময় আমাদের ভালো রাখার চেষ্টা করেন মা। নিজের জন্য কিছু না রেখে, সবচেয়ে ভালোটা আমাদের জন্য তুলে রাখা, এ যেন তার স্বভাবজাত ভালোবাসার প্রকাশ। মায়ের কাজ কি শুধু সংসারের কাজেই সীমাবদ্ধ? একদমই না। তিনি আমাদের নৈতিকতা শেখান, সাহস জোগান, ভুল পথে গেলে সঠিক পথ দেখান। তার ত্যাগ, ধৈর্য আর ভালোবাসা আমাদের জীবনের প্রতিটি ধাপে পথপ্রদর্শক হয়ে থাকেন।
মা দিবস উপলক্ষে আমরা অনেকেই একদিন বিশেষভাবে মাকে ভালোবাসার কথা বলি। কিন্তু আমার কাছে মা প্রতিদিনই সমান গুরুত্বপূর্ণ, সমান প্রিয়। তিনি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি, সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। তার জন্যই পৃথিবীটা এত সুন্দর লাগে।
সবশেষে বলতে চাই—মা, তোমায় ভালোবাসি। তোমার মতো করে কেউ আগলে রাখতে পারে না, কেউ এতটা নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতেও পারে না। তুমি আছো বলেই আমার পৃথিবীটা এত আলোয় ভরা।
লেখক: শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা