রাইজিংবিডি স্পেশাল

হামের টিকাদান লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি, তবুও বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা

দেশজুড়ে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালিয়েও হামের সংক্রমণ ও শিশুমৃত্যুর হার কমছে না। টিকাদান কার্যক্রম ৯৬ শতাংশ শেষ হলেও হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে আক্রান্ত শিশুর চাপ, বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টিকা কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সময়মতো আইসোলেশন, পুষ্টি সহায়তা, দ্রুত চিকিৎসার ঘাটতির কারণে সংকট আরও জটিল হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া হাম প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত সারাদেশে মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার। এখন পর্যন্ত নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ৭ হাজারের বেশি। এসময়ে হাম এবং এর উপসর্গে ৩৫০ এর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) তথ্যমতে, ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এমআর (হাম-রুবেলা) টিকাদান কর্মসূচিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৭২ লাখ ৬৮ হাজার ৯০৮ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৯৬ শতাংশ। সংস্থাটি থেকে জানা যায়, হামে আক্রান্ত শিশুদের ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম, অর্থাৎ তাদের এখনও টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি। আবার নিশ্চিত আক্রান্তদের মধ্যে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ এক ডোজ এবং ১১ দশমিক ৭ শতাংশ দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও সংক্রমিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। তবে টিকা গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি অনেক কমিয়ে দেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ডা. চিরঞ্জিত দাস বলেন, ‘‘এমআর টিকা কার্যকর হতে সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। সেই সময় পার হয়ে গেলেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমার পরিবর্তে বাড়ছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘শুধু টিকাদান কার্যক্রম চালিয়ে গেলে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। টিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর পাশাপাশি রোগ শনাক্তের পর দ্রুত আইসোলেশন, আক্রান্ত এলাকায় বাড়তি নজরদারি, কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা এবং অপুষ্ট শিশুদের বিশেষ সাপোর্ট নিশ্চিত করতে হবে। না হলে সংক্রমণের চেইন ভাঙা সম্ভব হবে না।”

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক আহমেদ বলেন, “সারা বিশ্বেই হাম বেড়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের মতো এত শিশু মৃত্যু খুব কম দেশেই দেখা যাচ্ছে। চলমান পরিস্থিতি আরো এক-দুই মাস স্থায়ী হতে পারে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘শুধু টিকা দিলেই হবে না, একইসঙ্গে স্থানীয় হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে, দ্রুত রোগ শনাক্ত করতে হবে এবং আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা চিকিৎসা ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।”

‘‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সেকেন্ডারি কেয়ার হাসপাতালগুলো কার্যকরভাবে প্রস্তুত না থাকায় অধিকাংশ রোগী ঢাকামুখী হচ্ছে। এতে বড় হাসপাতালগুলোতে চাপ বাড়ছে। আবার পর্যাপ্ত আইসোলেশন না থাকায় অন্য রোগে আক্রান্ত শিশুরাও সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছে। জেলা পর্যায়ে কার্যকর চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকলে এত রোগী রাজধানীতে আসত না,” যোগ করেন তিনি।

আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়ার কারণ সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসনিম বলেন, “অনেক রোগী হাসপাতালে আসতে দেরি করছে। কেন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, সেটি নির্দিষ্টভাবে জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। ডেথ রিভিউ করলে প্রকৃত কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।’’